সাঁড়াশি অভিযানেও থামছে না টার্গেট কিলিং। প্রকাশ্যে দিন-দুপুরে, ব্যস্ততম সড়কে শত শত মানুষের সামনে ঘটছে একের পর এক হত্যাকাণ্ড। আঁততায়ীর প্রাণঘাতী বুলেটের শিকার হচ্ছেন জুলাইযোদ্ধা, রাজনৈতিক দলের নেতা থেকে ব্যবসায়ীরা। বেশির ভাগ ঘটনায় ধরা পড়ছে না ঘাতকরাও। এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে দেশ জুড়ে। উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও বলছে- নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এমন টার্গেট কিলিং আরও বাড়তে পারে। বিশিষ্টজনদের মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এমন চলতে থাকলে তার প্রভাব পড়তে পারে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনেও।
সম্প্রতি রাজধানীর কাওরান বাজারে ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মুসাব্বিরকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। বুধবার রাত ৮টা ২০ মিনিটের দিকে স্টার কাবাবের পাশের গলি হয়ে যাওয়ার সময় তাকে গুলি চালায় আগে থেকে ওত পেতে থাকা দুর্বৃত্তরা। ওই সময় কাওরান বাজার ভ্যান সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান মাসুদও গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে তেজগাঁও থানায় মামলা করেছেন মুসাব্বিরের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম। তবে হত্যার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার দু’দিনেও ধরা পড়েনি শুটাররা। এদিকে গত ৩রা জানুয়ারি রাতে যশোর শহরের শংকরপুর এলাকায় চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে আলমগীর নামে এক বিএনপি নেতাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর দু’দিন পর ৫ই জানুয়ারি যশোরের মণিরামপুরে সাংবাদিক ও বরফকল ব্যবসায়ী রানা প্রতাপ বৈরাগীকে ডেকে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। একই দিন চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায় জানে আলম সিকদার (৩৪) নামের যুবদলের এক সাবেক নেতাকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ওই দিন রাত ৯টার দিকে পূর্ব গুজরা ইউনিয়নের নিজ বাসার সামনে এ ঘটনা ঘটে। মোটরসাইকেলে করে আসা তিন যুবক তাকে লক্ষ্য করে গুলি করলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
এর আগে গত ১৮ই ডিসেম্বর খুলনা মহানগরীতে ইমদাদুল হক মিলন (৪৫) নামে এক সাংবাদিককে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ সময় দেবাশীষ বিশ্বাস (৩৫) নামে এক হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। নিহত মিলন ওই এলাকার মো. বজলুর রহমানের ছেলে। তিনি ‘বর্তমান সময়’ নামের একটি নিউজ পোর্টাল চালাতেন এবং ডুমুরিয়ার শলুয়া প্রেস ক্লাবের সভাপতি ছিলেন। এর কিছুদিন আগেই গত ১২ই ডিসেম্বর জুমার নামাজের কিছু পর রাজধানীর পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোডে রিকশায় থাকা ওসমান হাদিকে গুলি করে দুই দুর্বৃত্ত। ব্লাঙ্ক রেঞ্জে (খুব কাছ থেকে) তার মাথায় গুলি করা হয়। পরে ওসমান হাদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেয়া হয়। সেখানে ১৮ই ডিসেম্বর মারা যান তিনি। ওই ঘটনায় তদন্ত শেষে মোট ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দিয়েছে তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তবে মূল অভিযুক্ত ‘শুটার’ ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ এবং তার সহযোগী মোটরসাইকেলচালক মো. আলমগীর শেখ এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরে। হাদি হত্যার পর ইনকিলাব মঞ্চ একের পর এক কর্মসূচি পালন করলেও শুটারকে ধরতে পারেনি পুলিশ। গত ১৭ই নভেম্বর রাজধানীর মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের সি ব্লকের একটি দোকানে ঢুকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় পল্লবী থানা যুবদলের সদস্যসচিব গোলাম কিবরিয়া (৪৭)কে। গত ১২ই নভেম্বর রাজধানীর মধ্য বাড্ডার কমিশনারের গলির ভাই ভাই বোর্ডিংয়ের দুইতলা টিনশেড বাড়ির নিচতলার বাসায় ঢুকে মাদক ব্যবসায়ী ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের নেতা মামুন শিকদার (৩৯)কে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর দু’দিন আগে ১০ই নভেম্বর রাজধানীর সূত্রাপুরে কোট- কাচারির সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে হাসপাতালের গেটের সামনে ফেলে ফিল্মি স্টাইলে গুলি করে হত্যা করা হয় শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুন (৫৫)কে। ওই ঘটনাতেও কুমিল্লা সীমান্ত এলাকা থেকে দুই শুটার রুবেল ও ইব্রাহিমকে অস্ত্রসহ আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরে জানা যায়, তারা দুজনই টাকার বিনিময়ে ভাড়াটে খুনি হিসেবে কাজ করে। এমন একের পর এক হত্যার ঘটনা ঘটেই চলেছে।
৪৮ ঘণ্টায়ও ধরা পড়েনি মুসাব্বিরের খুনিরা, মোটিভ খুঁজছে পুলিশ
এদিকে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মুসাব্বির নিহত হওয়ার ঘটনায় এখনো পর্যন্ত কোনো ক্লু পাওয়া যায়নি। ঘটনার ৪৮ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও ধরা পড়েনি শুটার। মাত্র পনেরো সেকেন্ডের একটি কিলিং মিশন ছিল। ঘাতকরা আগে থেকেই ছিল ওত পেতে। আগে থেকে রেকি করে দুষ্কৃতকারীরা এবং টার্গেট করেই মুসাব্বিরকে হত্যা করা হয়েছে। মুসাব্বিরের স্বজন ও সতীর্থরা বলছেন, নির্বাচন বানচালের জন্য এমন ঘটনা ঘটানো হয়েছে। মুসাব্বির হত্যার ঘটনার পেছনে কাওরান বাজারে ব্যবসায়ীদের ওপর হামলার ঘটনার যোগসূত্র খুঁজছে পুলিশ। এ ছাড়া নিহত হওয়ার ঘটনায় আধিপত্য বিস্তার, কাওরান বাজারের নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক বিরোধকে গুরুত্ব দিচ্ছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
পুলিশ সূত্র বলছে, এই হত্যাকাণ্ডের মোটিভ খোঁজা হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে শুটারের ছবি শনাক্ত করেছি এবং আরও যারা সিগন্যাল দিয়েছে, কাছে ছিল বা সহায়তা করেছে তাদের যেকোনো একজনকে পেলেই মোটিভ উদ্ধার করতে পারবো। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৬ জনকে ডিবি হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেয়া হয়েছে।
ডিএমপি’র তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান বলেন, শুটারকে শনাক্ত করতে পারলেই হত্যার তদন্তে অনেকটা অগ্রগতি হবে। সিসিটিভি ফুটেজে সরাসরি জড়িত দু’জনকে দেখা গেছে। তাদের একজনের চেহারা স্পষ্ট। তার পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
এদিকে একাধিক গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, ঘটনার পর ওই রাত থেকে এখন পর্যন্ত ডিবি হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৬ জনকে নেয়া হয়েছে। এরমধ্যে তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এ ঘটনায় ৪-৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা করা হয়।
তেজগাঁও জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) ফজলুল করিম মানবজমিনকে বলেন, আমরা এখনো পর্যন্ত হত্যার কোনো মোটিভ পাইনি। বিভিন্ন ফুটেজ থেকে কিছু ছবি শনাক্ত করেছি। পুলিশ, ডিবি সমন্বয় হয়ে যৌথভাবে এই বিষয় কাজ করছে। শনাক্তকারী বা সংশ্লিষ্ট কাউকে পেলে আমরা মোটিভটা বুঝতে পারবো। এটি মাল্টি ডাইমেনশনালতো এ কারণে এখনো স্পেসেপিক কিছু বলা যাচ্ছে না। ফুটেজ দেখে ছবি শনাক্ত করেছি এবং আরও যারা সিগন্যাল দিয়েছে, কাছে ছিল বা সহায়তা করেছে তাদের যেকোনো একজনকে পেলেই মোটিভ উদ্ধার করতে পারবো। তিনি বলেন, আশা করছি পাওয়া যাবে। সিসিটিভি ফুটেজ থেকে যে ছবি পেয়েছি সেই ব্যক্তিদের শনাক্তে চেষ্টা চলছে। অনেকে ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে, অনেকেরই চেহারার সঙ্গে মেলে, কাছাকাছি আসছে কিন্তু এখনো স্পেসিফিক কিছু বলা যাচ্ছে।
পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, গত এক বছরে সারা দেশে ৩ হাজার ৭৬৭টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। ঢাকায় মাসে গড়ে ২০টি খুনের ঘটনা ঘটছে। ২০২৪ সালের চেয়ে ২০২৫ সালে খুন বেড়েছে ৩২৭টি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ২৭৬, নভেম্বরে ২৭৯, অক্টোবরে ৩১৯, সেপ্টেম্বরে ২৯৭, আগস্টে ৩২১, জুলাইয়ে ৩৬২, জুনে ৩৪৪, মে মাসে ৩৪১, এপ্রিলে ৩৩৬, মার্চে ৩১৬, ফেব্রুয়ারিতে ৩০০ এবং জানুয়ারিতে ২৯৪টি হত্যা মামলা রেকর্ড হয়েছে দেশের বিভিন্ন থানায়। আর গত ডিসেম্বরে সবচেয়ে বেশি খুনের ঘটনা ঘটেছে ঢাকা রেঞ্জে। ৬৭টি। ডিসেম্বরে ডিএমপিতে ২০টি, ময়মনসিংহ রেঞ্জে ১২টি, চট্টগ্রাম রেঞ্জে ৪৪টি, সিলেট রেঞ্জে ১৯টি, খুলনা রেঞ্জে ২৩টি, বরিশাল রেঞ্জে ১১টি, রাজশাহী রেঞ্জে ২৩টি, রংপুর রেঞ্জে ২৬টি, সিএমপিতে ২টি, কেএমপিতে ৪টি, জিএমপিতে ৪টি, আরএমপিতে ৪টি, বিএমপিতে ২টি, এসএমপিতে ২টি এবং রেলওয়ে রেঞ্জে ৩টি হত্যা মামলা রেকর্ড হয়েছে। গত ১ বছরের ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অপরাধ চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকায় গত জানুয়ারিতে ২০টি, ফেব্রুয়ারিতে ২২টি, মার্চে ১৮টি, এপ্রিলে ২২টি, মে মাসে ২৩টি, জুনে ১৮টি, জুলাইয়ে ১৬টি, আগস্টে ২২টি, সেপ্টেম্বরে ১৯টি, অক্টোবর ১৮টি ও নভেম্বরে ১৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
বিষয়টি নিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি কমিশনার শেখ সাজ্জাত আলী বলেছেন, পারিবারিক কলহ, পূর্বশত্রুতার জের, আধিপত্য বিস্তারসহ বিভিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে মাসে গড়ে ১৯-২০টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এরমধ্যে রাজনৈতিক কারণও রয়েছে। আমরা এসব ঘটনার প্রায় শতভাগই রহস্য উদ্ঘাটনসহ জড়িতদের আইনের আওতায় নিয়ে এসেছি। সমপ্রতি সময়ে যেসব টার্গেট কিলিং হয়েছে সেগুলোরও কারণ অনুসন্ধান করতে সম্ভব হয়েছি। তবে এসব হত্যাকাণ্ডের প্রত্যেকটিরই আলাদা আলাদা মোটিভ থাকে। আবার ফ্যাসিবাদী শক্তি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে অপতৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। আমরা সব বিষয়েই নজর রাখছি। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ বদ্ধপরিকর। তবে পুলিশের একার পক্ষে সমাজের সকল অপরাধ দূর করা সম্ভব নয়। তাই নগরবাসীকেও পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহায়তার অনুরোধ করেন তিনি।
বিষয়টি নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র ও সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, যারা টার্গেট কিলিংয়ে জড়িত আমরা তাদের তালিকা করেছি। গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছে অনেকে। আবার কিছু মানুষকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। এ বিষয়টি আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) ড. মনিরুল ইসলাম আখন্দ বলেন, ‘আমি খুবই হতাশ রিসেন্ট কিছু ঘটনা দেখে। ওসমান হাদির মৃত্যু ছাড়াও আরও দুই-একটি টার্গেট কিলিং হয়েছে। এটি কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত নয়। ভোটারদের মনে ভীতি সৃষ্টি করবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, একটি হত্যাকাণ্ডের পর নির্বাচন কমিশন বা রাজনৈতিক দলের নেতারা বলছেন- বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এ ধরনের বক্তব্যের কারণে অপরাধীরা মনে করে, তারা কাউকে টার্গেট করে হত্যা করলে এ নিয়ে কোনো না কোনো রাজনীতি হবে। তারা পার পেয়ে যাবে। টার্গেট কিলিং যখন শুরু হয়েছে, তখন যে অভিযান জোরালো দরকার ছিল, সেই ধরনের অভিযান আমরা দেখছি না। বিশেষ করে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পৃথক অভিযানের কথা আমরা বলেছি যে অস্ত্র উদ্ধারে পৃথক অভিযান শুরু করা হবে। কিন্তু ডেভিল হান্ট অভিযানে ফেজ ১ ও ২-এ গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধারের যে সফলতা, সেটি দৃশ্যমান নয়। ফলে ঝুঁকি থেকেই গেছে। আর এই ঝুঁকির কারণে টার্গেট কিলিং বাড়ছে, যা নির্বচনী পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।