-
সমাজবিজ্ঞানীরা ‘মাদারহুড পেনাল্টি’ শব্দটি ব্যবহার করে থাকেন গর্ভবতী নারীদের প্রতি কর্মক্ষেত্রে বিদ্যমান বেতন বৈষম্য ও পক্ষপাতমূলক আচরণ বোঝাতে। তবে এই ধারণা কেবল কর্মক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষাঙ্গনেও এর প্রতিফলন স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রায় সব কর্মক্ষেত্রে কর্মজীবী নারীরা মাতৃত্বকালীন ছুটি পেলেও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত বিবাহিত নারী শিক্ষার্থীরা সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত রয়েছেন।
প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য শিক্ষার্থীদের একটি নির্দিষ্ট উপস্থিতির হার নিশ্চিত করতে হয়। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া অন্তঃসত্ত্বা নারী শিক্ষার্থীদের গর্ভাবস্থার সময়েও নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকতে বাধ্য হতে হচ্ছে। ক্লাসে উপস্থিতি, পরীক্ষা, ভাইভা, প্রেজেন্টেশন ও অ্যাসাইনমেন্ট—সব ধরনের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমে অংশ নিতে হচ্ছে তাদের। তবে গর্ভকালীন জটিলতার কারণে অনেক শিক্ষার্থী এসব কার্যক্রমে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতে পারেন না। এতে করে তাদের ইয়ার ড্রপ দিতে হচ্ছে। এসব বাস্তবতার কারণে গর্ভাবস্থায় মাতৃত্বকালীন ছুটির দাবি জানাচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত নারী শিক্ষার্থীরা।
বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস। তারা জানিয়েছেন, গর্ভকালীন পূর্ণ বিশ্রামে থাকার কথা থাকলেও মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা না থাকায় ইয়ার ড্রপের ভয়ে তারা সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করতে পারেননি। এতে তারা ভেঙে পড়েছেন। আবার কেউ কেউ জানিয়েছেন, গর্ভকালীন নানা জটিলতা ও প্রসব পরবর্তীতে বাচ্চাকে দেখভাল করতে গিয়ে তারা অ্যাকাডেমিক কাজে নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত হতে পারেননি। ফলে তাদেরকে ইয়ার ড্রপ দিতে হয়েছে। এতে তারা চাকরির আবেদন করতেও পিছিয়ে যাচ্ছেন। তাদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ে মাতৃত্বকালীন ছুটির পাশাপাশি চাকরিতে নারীদের আবেদনের বয়স বাড়ানো।
শুধু নারী প্রার্থীদের বয়সের বিষয়টিই নয়, চিকিৎসকদের বয়সও বৃদ্ধির দাবি ছিল। তবে বয়স বৃদ্ধির বিষয়টি পিএসসির হাতে নেই। এটি সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। প্রার্থীরা যদি আমাদের কাছে বয়স বৃদ্ধির দাবি জানায়, তাহলে আমরা সেটি সরকারকে অবহিত করব। এরপর সরকার যে সিদ্ধান্ত দেবে, আমরা তা বাস্তবায়ন করব।—অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম, চেয়ারম্যান, পিএসসি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৭-১৮ সেশনের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃত বিভাগের শিক্ষার্থী আসমা মালিহা(ছদ্মনাম) বলেন, পঞ্চম সেমিস্টারের শুরুতে আমি অন্তঃসত্ত্বা হই। গর্ভধারণের প্রথম থেকেই আমার শারীরিক জটিলতা থাকায় ঠিকমতো ক্লাসে উপস্থিত হতে পারিনি। উপস্থিতি ৪০% এর নিচে থাকায় ফাইনাল পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অনুমতি পাইনি। এরপর ফের ভর্তির আবেদন করে বাড়িতে চলে যাই। সেখানেই আমার মেয়ের জন্ম হয়। এরপর পরের ব্যাচের সঙ্গে ফের ক্লাস শুরু করি। আমার মেয়ের দেখাশোনার জন্য বাধ্য হয়ে মাকে ঢাকায় আনতে হয়। অনেক সময় বাবুকে নিয়েই ক্লাসে যেতে হয়েছে। ক্লাস পরীক্ষার বাইরে সাংসারিক ও অন্য কাজ মিলিয়ে শারীরিক এবং মানসিকভাবে একেবারে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। আমার মতো অবস্থা যাতে অন্য কারও না হয়, সেজন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি।
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৬-১৭ সেশনের দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী নওরীন ইসলাম তন্বী বলেন, করোনার সময়টাতে আমি প্রেগনেন্ট হই। আমি যখন ৫ মাসের প্রেগনেন্ট তখন আমাকে ইউনিভার্সিটি যেতে হয় অনার্স ফাইনাল পরীক্ষার জন্য ৷ তখন বিবাহিত মেয়েদের ঢাবির আবাসিক হলে অবস্থান করা নিষেধ ছিল, সেক্ষেত্রে সবাইকে লুকিয়ে আমি দুই মাস হলে অবস্থান করি এবং ফাইনাল পরীক্ষা শেষে বাড়িতে ফেরত চলে আসি৷ করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে বেশিরভাগ ক্লাস তখন অনলাইনে হওয়ায় বাড়িতে বসেই মাস্টার্স শুরু করি। কিন্তু আমার সন্তান জন্মের তিনদিন পরেই অফলাইনে মিডটার্ম পরীক্ষা শুরু হয় ৷ এ অবস্থায় আমি সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হই একটা বছর গ্যাপ দেওয়ার। পরবর্তীতে আমাকে অনেক যুদ্ধ করে দশমাস বয়সের সন্তানকে কোলে নিয়ে পরিবার ব্যতীত একা ঢাকায় এসে উঠতে হয় মাস্টার্স এর জন্য।
তিনি আরও বলেন, মাস্টার্স শেষ হওয়ার পরে চাকরির প্রস্তুতির ক্ষেত্রে আমি অনেক বেশি পিছিয়ে পড়ি। যেহেতু আমার সন্তানটি এখনো ছোট, দিনের বেশিরভাগ সময় তার পেছনে আমাকে ব্যয় করতে হয়৷ ধীরে ধীরে সে বড় হওয়ার সাথে সাথে তার পেছনে ব্যয় করা সময় থেকে আমি পড়তে বসার সময় অল্প অল্প করে বের করতে পারছি৷ কিন্তু সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা সীমিত হবার কারণে আমার হাতে একেবারেই ন্যূনতম সময় আছে নিজেকে প্রস্তুত করার৷ এত অপ্রতুল সময়ের মধ্যে চাকরির প্রতিযোগীতায় নিজের অবস্থান করে নেয়া প্রায় অসম্ভব। এক্ষেত্রে মাতৃত্বকে বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় এনে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমায় কিছুটা শিথিলতা এলে আমার মতো অনেকে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারে, এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজের যোগ্যতার পরিচয় দিতে পারে।
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় যেমন কেমব্রিজ, অক্সফোর্ড, ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে গর্ভবতী শিক্ষার্থী বা সদ্য মা হওয়া শিক্ষার্থীরা কোনো অ্যাকাডেমিক ক্ষতি ছাড়াই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গর্ভধারণ বা সন্তান জন্মের জন্য মাতৃত্বকালীন/পিতৃত্বকালীন ছুটি ও অ্যাকাডেমিক স্থগিতকরণ (suspension of status)-এর সুযোগ থাকে। একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পড়াশোনা থেকে বিরতি নেওয়া যায় এবং পরে একই অবস্থায় ফিরে পড়াশোনা চালানো সম্ভব।
এই দাবিটির যৌক্তিকতা আছে, এটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। রাষ্ট্র তার নাগরিককে সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা দিতেও বাধ্য। তবে চাকরিতে নারীদের প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর জন্য এটিই একমাত্র কারণ হতে পারে না। এটি করতে হলে রাষ্ট্রকে কয়েকটি দিক ভাবতে হবে।— আবু কিশোয়ার হোসেন জয়, চেয়ারম্যান, পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ
ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী, গর্ভাবস্থা বা সন্তান লালন–পালনের প্রয়োজনে শিক্ষার্থীরা ছুটি নিতে পারেন। এই ছুটি প্রতি টার্মের ভিত্তিতে অনুমোদিত হয়। সর্বোচ্চ ৫২ সপ্তাহ পর্যন্ত এ ছুটি নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে চিকিৎসা সনদসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে দাখিল করতে হয়।
এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও নারী শিক্ষার্থীরা মাতৃত্বকালীন ছুটি পেয়ে থাকেন। মহাত্মা গান্ধী বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মান (অনার্স) ও পোস্ট গ্র্যাজুয়েট বিভাগের ১৮ বছর এবং তার অধিক বয়সী নারী শিক্ষার্থীদের জন্য গর্ভকালীন পরিস্থিতিতে তিন মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি কাটানোর নিয়ম চালু হয়েছে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে। এক্ষেত্রে ছুটির কারণে শিক্ষার্থী যদি কোনো সেমিস্টার পরীক্ষা মিস করেন, পরবর্তী সেমিস্টারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সেই বিভাগের প্রধান বা চেয়ারম্যানের তত্ত্বাবধানে তা সমন্বয় করা হবে।
অন্যদিকে ২০২৩ সালে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য সর্বোচ্চ ছয় মাস পর্যন্ত মাতৃত্বকালীন ছুটি দেওয়ার ঘোষণা দেয় দেশটির কেরালা বিশ্ববিদ্যালয়। নীতিমালা অনুযায়ী, শিক্ষার্থীরা পুনরায় ভর্তি না হয়ে ছয় মাস পরে আবার ক্লাস শুরু করতে পারেন। কোর্স চলাকালীন শুধু একবার মাতৃত্বকালীন ছুটির সুবিধা রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয়টি।
এদিকে গত বছরের ২২ জুন মাতৃত্বকালীন ছুটি চেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খানকে স্মারকলিপি দিয়েছেন নারী শিক্ষার্থীরা।
এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, শিক্ষার্থীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি শিক্ষার্থীদের আবেদন যাচাই করে মতামত দিয়েছে, যা ডিনস কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল বা অন্য নীতিনির্ধারণী ফোরামে বিষয়টি যাবে। পদ্ধতিগত দিক থেকে এই প্রক্রিয়াটি চলমান আছে। তবে শিক্ষার্থীদের আবেদনের ভিত্তিতে যে মতামতগুলো এসেছে, সেগুলোর মধ্যে কিছু ফ্লেক্সিবিলিটি দেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের শারীরিক অবস্থাকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
তিনি বলেন, মাতৃত্বকালীন ‘ছুটি’ শব্দটি সাধারণত চাকরির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। শিক্ষার্থীদের জন্য উপস্থিতির পারসেন্টেজে ফ্লেক্সিবিলিটি বা অ্যাকাডেমিক অ্যাডজাস্টমেন্টের বিষয়টি বেশি প্রযোজ্য। অসুস্থতা, দুর্ঘটনা ( হাত বা পা ভেঙে গেলে) বা বিশেষ পরিস্থিতিতে বিভাগীয় পর্যায়ে এমন ফ্লেক্সিবিলিটি আগে থেকেই কিছুটা দেওয়া হয় এবং শিক্ষকরা মানবিকভাবেই বিষয়গুলো বিবেচনা করেন। এক্ষেত্রেও উপস্থিতির পারসেন্টেজ সংক্রান্ত কিছু সুপারিশ আসতে পারে, যা কার্যত ছুটির সঙ্গে মিল আছে। সেশন গ্যাপের বিষয়েও শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থাকে বিবেচনায় এনে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমাধান খোঁজার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই উদ্দেশ্যেই কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তাদের সুপারিশের ভিত্তিতেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
মাতৃত্বকালীন ছুটির বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ড. ফাতেমা রিজিনা ইকবাল দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, সব নারী শিক্ষার্থীর জন্যই এই বিষয়টি ভাবা উচিত। একজন নারী যখন সন্তান জন্ম দেয়, সমাজের জন্য তার অবদান বিশাল। জনসংখ্যা বাড়ছে, ম্যানপাওয়ার তৈরি হচ্ছে, অর্থনীতির প্রতিটি সেক্টরে তারা কাজ করছে। সেই মায়ের অবদানকে সম্মান জানিয়ে তাকে ছুটি দেওয়া তার অধিকার। এটা সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কার্যকর হওয়া উচিত।
পড়াশোনার মাঝে বিয়ে হয়ে যাওয়ার কারণে অনেক নারীর পড়ালেখায় বিরতি পড়ে। বিয়ের পর সন্তান জন্ম ও তার দেখভাল করতে গিয়ে অনেক সময় চাকরির পরীক্ষা দিতে পারে না, ফ্যামিলি অবলিগেশন্স থাকে। এ ছাড়া আমাদের নারী কর্মকর্তার সংখ্যা তুলনামূলক কম। এসব বিবেচনায় মেয়েদের বয়স দুই বছর বেশি রাখাকে কমিটি যৌক্তিক মনে করেছে।—আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী, প্রধান কমিশন, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিটি
তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য অন্তত প্র্যাকটিক্যাল বা যৌক্তিক একটি ছুটির ব্যবস্থা থাকা উচিত। শুধু মাতৃত্বকালীন নয়, পিতৃত্বকালীন ছুটির বিষয়টিও ভবিষ্যতে ভাবা যেতে পারে। তবে আগে মাতৃত্বকালীন ছুটির বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। মনে রাখতে হবে, সন্তান ধারণ কোনো অসুস্থতা নয়। এটা জীবনের স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। আমরা যদি চিন্তা করি যে একজন ছাত্রী সন্তান ধারণ করেছে এবং সে চলাফেরা করতে পারছে না, ক্লাস বা পরীক্ষায় উপস্থিত হতে পারছে না—তাহলে তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে। বর্তমানে বিশেষ পরীক্ষার ক্ষেত্রে জরিমানার একটি অর্থ দিতে হয়, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় চাইলে সেটাও মওকুফ করতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট কেয়ারিং। এটি না হওয়ার কোনো কারণ দেখছি না।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মাতৃত্বকালীন ছুটির বিধান চালু করা যুক্তিযুক্ত নয় বলে মনে করেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মুহাম্মদ মুজিবুর রহমান। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটি অর্থ ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, পরীক্ষা সবকিছু থেকে পুরোপুরি দূরে থাকা। এটা তো চাকরি নয় যে বেতন দেব, ছুটি দিয়ে দিলাম। বিশ্ববিদ্যালয় শেখার জায়গা। এখানে পড়াতে হবে, শেখাতে হবে। না পড়িয়ে তো কাউকে পরীক্ষায় বসার অনুমতি দেওয়া যুক্তিযুক্ত না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী, ৪ বছরের অনার্স সর্বোচ্চ ছয় বছরের মধ্যে সম্পন্ন করা যায়। এক্ষেত্রে মাতৃত্বের বিষয়টি কনসিডার করে সেটি নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ৭ বছর করা যায়। বাচ্চার দেখভালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ডে-কেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থা করা যায়।
তিনি বলেন, মাতৃত্বকালীন ছুটি দিতে হলেও আগে বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে একটি নীতিমালা তৈরি করতে হবে। যেমন ছুটিটা কখন দেওয়া হবে, কতবার দেওয়া হবে। গ্যাপের পর শিক্ষার্থী তার নিজের ইয়ারের সাথে থাকবে নাকি পরের ইয়ারের সাথে থাকবে। বিষয়টি কীভাবে সমন্বয় করা হবে। অ্যাকাডেমিক বিষয়গুলো কীভাবে ম্যানেজ করা হবে। আবার মাতৃত্বকালীন ছুটি দিলে ছাত্ররাও পিতৃত্বকালীন ছুটি দাবি করতে পারে। সেক্ষেত্রে শুধু নারী শিক্ষার্থীদের সুযোগ দিলে লিঙ্গ বৈষম্য তৈরি হয় কিনা সেটিও মাথায় রাখতে হবে।
পরীক্ষায় অ্যাটেন্ড করার বিষয়ে তিনি বলেন, এখানে কিছুটা ফ্লেক্সিবিলিটি আনা যায়। জেলখানা বা হাসপাতালে থাকলে যেমন স্পেশাল পারমিশনে পরীক্ষার সুযোগ দেওয়া হয়, তেমনি গর্ভবতী নারী শিক্ষার্থীদের জন্যও স্পেশাল অ্যারেঞ্জমেন্ট করা যেতে পারে।
মাতৃত্বকালীন ছুটির মূল লক্ষ্য হলো গর্ভবতী নারী ও নবজাতকের স্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ৪৫ থেকে ৫০ ধারা মাতৃত্বকালীন ছুটি সংক্রান্ত নীতিমালার ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। এই আইনে নিয়োগকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, গর্ভবতী নারীকে চার মাসের বেতনসহ ছুটি দিতে হবে; যার মধ্যে প্রসবের আগে আট সপ্তাহ এবং প্রসবের পরে আট সপ্তাহ। সংশোধিত বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা, ২০২২-এর ৩৮(ক) বিধিতে মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষ হওয়ার পর সন্তান জন্মের ক্ষেত্রে বিশেষ ছুটির ব্যবস্থা এবং ৩৮ক বিধিতে গর্ভপাতজনিত ছুটির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সার্ভিস রুলসের প্রথম অংশের ১৯৭(১) বিধি অনুযায়ী, স্থায়ী সরকারি কর্মচারীরা ছয় মাসের বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি পেয়ে থাকেন। তবে কর্মক্ষেত্রে নারীরা মাতৃত্বকালীন ছুটি পেয়ে থাকলেও, গর্ভধারণ ও প্রসব পরবর্তী সময়ে বাচ্চার দেখভাল করতে গিয়ে অনেক নারীর পড়ালেখা ও চাকরির প্রস্তুতিতে গ্যাপ পড়ে। এক্ষেত্রে তারা অন্যদের চেয়ে পিছিয়ে পড়লেও চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে নারী পুরুষের বয়সসীমা সমান। তবে ২০২৪ সালে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান সাবেক সচিব আবদুল মুয়ীদ চৌধুরীকে প্রধান করে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা পর্যালোচনায় একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি সরকারি চাকরিতে প্রবেশে ছেলেদের ৩৫ ও মেয়েদের বয়স ৩৭ বছর করার সুপারিশ করে।
এ প্রসঙ্গে কমিটির প্রধান আব্দুল মুয়ীদ বলেন, পড়াশোনার মাঝে বিয়ে হয়ে যাওয়ার কারণে অনেক নারীর পড়ালেখায় বিরতি পড়ে। বিয়ের পর সন্তান জন্ম ও তার দেখভাল করতে গিয়ে অনেক সময় চাকরির পরীক্ষা দিতে পারে না, ফ্যামিলি অবলিগেশন্স থাকে। এ ছাড়া আমাদের নারী কর্মকর্তার সংখ্যা তুলনামূলক কম। এসব বিবেচনায় মেয়েদের বয়স দুই বছর বেশি রাখাকে কমিটি যৌক্তিক মনে করেছে।
তবে পরবর্তীতে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ বছর থেকে বাড়িয়ে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য ৩২ বছর নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
চাকরিতে প্রবেশে নারীদের বয়স বাড়ানো যৌক্তিক কিনা
এ বিষয়ে অধ্যাপক মুহাম্মদ মুজিবুর রহমান বলেন, চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে যে নিয়ম আছে তাতে সংশোধনী আনা প্রয়োজন। কোনো নারী যদি বিয়ে ও বাচ্চা জন্ম দেওয়ার জন্য একটা লম্বা সময় বিরতির পর চাকরিতে প্রবেশ করতে চায়, তবে তাকে সেই সুযোগ দেওয়া উচিত। অবসরের সময় যে পর্যন্ত আছে সে ওই পর্যন্ত চাকরি করবে। সে চাকরিতে পরে প্রবেশ করলেও অসুবিধার তো কিছু নেই। আমরা ডোর কেন ক্লোজ করে ফেলব? ছেলে-মেয়ে সবার জন্যই এই সুযোগ রাখা উচিত।
এ বিষয়ে পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের চেয়ারম্যান আবু কিশোয়ার হোসেন জয় দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এই দাবিটির যৌক্তিকতা আছে, এটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। রাষ্ট্র তার নাগরিককে সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা দিতেও বাধ্য। তবে চাকরিতে নারীদের প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর জন্য এটিই একমাত্র কারণ হতে পারে না। এটি করতে হলে রাষ্ট্রকে কয়েকটি দিক ভাবতে হবে।
প্রথমত, কত শতাংশ নারী গর্ভধারণ ও বাচ্চার দেখাশোনা করতে গিয়ে সঠিক সময়ে চাকরিতে প্রবেশ করতে পারছে না। এই সংখ্যাটা কিন্তু উল্লেখ নেই কোথাও। এটির জন্য আগে গবেষণার প্রয়োজন। তারপর দেখতে হবে বয়স বাড়ালেই কি চাকরিতে নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে কিনা। কারণ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীর চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে আরও বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। তাছাড়া চাকরিতে নারীর বয়সসীমা বাড়াতে গেলে পুরুষদের বয়সসীমা বাড়ানোর প্রসঙ্গটিও চলে আসবে।
দেশে পুরুষদের তুলনায় নারী বিসিএস কর্মকর্তাদের সংখ্যাও কম। এক্ষেত্রে চাকরিতে প্রবেশে নারীদের বয়সসীমা বাড়ানো যায় কিনা জানতে চাইলে পিএসসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, শুধু নারী প্রার্থীদের বয়সের বিষয়টিই নয়, চিকিৎসকদের বয়সও বৃদ্ধির দাবি ছিল। তবে বয়স বৃদ্ধির বিষয়টি পিএসসির হাতে নেই। এটি সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। প্রার্থীরা যদি আমাদের কাছে বয়স বৃদ্ধির দাবি জানায়, তাহলে আমরা সেটি সরকারকে অবহিত করব। এরপর সরকার যে সিদ্ধান্ত দেবে, আমরা তা বাস্তবায়ন করব।