Image description
সর্বাত্মক প্রস্তুতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সেভাবেই চলছে পুলিশি কার্যক্রম। নির্বাচনের আগে ও পরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ব্যাপক তৎপরতা শুরু হয়েছে। এর মধ্যে ভোটার ও প্রার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের তরফ থেকে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসাবে সপ্তাহে অন্তত এক বা দুদিন প্রার্থীদের নিয়ে বসতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সব মেট্রোপলিটন কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি এবং জেলার এসপিদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রার্থীদের নিরাপত্তা এবং সুষ্ঠু নির্বাচনসংক্রান্ত সব ধরনের বিষয় নিয়ে ওই বৈঠকে আলোচনা করতে বলা হয়েছে। নির্দেশনায় আরও বলা হয়, নিজস্ব নিরাপত্তার জন্য কোনো প্রার্থী চাইলে টাকার বিনিময়ে আনসার সদস্য নিতে পারবেন। এছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে গানম্যানসহ সম্ভাব্য সব ধরনের সুবিধা দেওয়া হবে। কেউ লাইসেন্স করা অস্ত্র সুবিধা চাইলে সেটাও দেওয়া হবে। খবর সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রের।

আগামী নির্বাচন নির্বিঘ্ন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আগের চেয়ে বেশ তৎপর বলে জানা গেছে। একটি পরিসংখ্যানের দিকে নজর দিলেই তা স্পষ্ট। এতে দেখা যায়, ১৩ ডিসেম্বর থেকে ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে ৬৪ হাজার ৮৭টি চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। এসব চেকপোস্টের আওতায় আট লাখ ৫১ হাজার ৯০২টি গাড়ি এবং ৭৪ লাখ আট হাজার ৭৭৯টি মোটরসাইকেলে তল্লাশি করা হয়। আট হাজার ৯৮৪টি মোটরসাইকেল আটক করা হয়। আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয় ১০ হাজার ২৮৪টি মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে। উদ্ধার করা হয় ২৪২টি আগ্নেয়াস্ত্র, এক হাজার ৬৮৪ রাউন্ড গুলি ও বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্রসহ অন্যান্য সরঞ্জামাদি। গত ২৭ দিনের অভিযানে গ্রেফতার করা হয়েছে ৩৯ হাজার ৫৩০ জনকে। এর মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের ১৬ হাজার ৩৮২ জন সদস্যও রয়েছেন। অপর দিকে বিভিন্ন মামলায় ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি হিসাবে গ্রেফতার করা হয়েছে ২৩ হাজার ১৪৮ জনকে।

নির্বাচনি প্রস্তুতির বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ইতোমধ্যে পুলিশের দেড় লাখ সদস্যের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা সব পুলিশ সদস্যকে বডিওর্ন ক্যামেরা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। ভোটকেন্দ্রে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার উদ্ভব হলে সঙ্গে সঙ্গেই যথাযথ নির্দেশনা দেবেন পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

সূত্র জানায়, নির্বাচনি নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ হিসাবে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে প্রতি থানা এলাকায় সর্বাধিক মোবাইল টিম মোতায়েনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সব উপজেলায় দুজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োজিত করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে পুলিশ সদস্যরা কাজ করবেন। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের অভিযান চলাকালে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ফোর্স মোতায়েন থাকবে।

এদিকে, ব্যালট পেপার ছাড়াও পোস্টাল ব্যালট (ডাকযোগে ভোটগ্রহণ সংক্রান্ত) এবং নির্বাচনি সরঞ্জামাদি পরিবহণে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

পরাজিত একটি মহল নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বারবার উঠে আসছে। মহলবিশেষ নির্বাচনের আগে এবং নির্বাচন চলাকালে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, ধর্মীয় উপাসনালয়, কেপিআই (কী পয়েন্ট ইনস্টলেশন), নির্বাচন অফিস ও ভোটকেন্দ্র ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগ করতে পারে। এই উদ্বেগের বিষয় সামনে রেখে ওইসব এলাকায় প্যাট্রোল ডিউটি জোরদার করা হয়েছে।

প্রতিবেশী দেশে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতারা সীমান্তবর্তী আসনগুলোতে ঢুকে পড়ার যে আশঙ্কা রয়েছে সেদিকে সরকারের সর্বোচ্চ নজর রয়েছে। ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ কেউ বাধাগ্রস্ত করতে চাইলে কঠোরহস্তে দমন করা হবে বলে সূত্র জানায়।

এদিকে, কোনো মহল সংখ্যালঘুদের উসকানি ও মদদ দিয়ে যাতে বসতবাড়ি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা এবং ভাঙচুর চালিয়ে ভোটের পরিবেশ নষ্ট করতে না পারে সে বিষয়ে মাঠ পুলিশকে তৎপর থাকতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি কেউ যেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে মাজার ও ধর্মীয় স্থাপনার দিকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে বলা হয়েছে।

৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়ি থেকে পাঁচ হাজার ৭৬৩টি বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র লুট হয়। এসব অস্ত্রের বড় একটি অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন ধরনের ১০ হাজার ৫০৬টি অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়। এগুলোর মধ্যে ৬৫৭টি অস্ত্র এখনো জমা পড়েনি। জমা না পড়া অস্ত্রগুলো এরই মধ্যে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। লুণ্ঠিত ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। গত ২৭ দিনে তিনটি রাইফেল, ২১টি রিভলবার, ৩১টি বিদেশি পিস্তল, ৩৬টি পিস্তল, ২৪টি শুটারগান, ২৭টি পাইপগান, ২৮টি এলজি, ২৩টি বন্দুক, চারটি শটগান, একটি করে স্টেনগান ও এমএ (মিয়ারমার আর্মস) ও ৪৩টি এয়ারগান উদ্ধার করা হয়েছে।

পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য পুলিশের কী দায়িত্ব তা এরই মধ্যে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রতিনিয়ত পুলিশ সদর দপ্তর মাঠপর্যায়ে বার্তা দেওয়া হচ্ছে।