অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে আগ্রহ কম অন্তর্বর্তী সরকারের। বিশেষ করে বড় ব্যয়ের মেগা প্রকল্প হিসেবে পরিচিত অবকাঠামো প্রকল্পেই বেশি অনাগ্রহ। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) যথেষ্ট বরাদ্দ রাখা হয়নি এসব প্রকল্পে। যতটুকু বরাদ্দ রাখা হয়েছে তার ওপরেও করা হচ্ছে মেগা বা বিশাল কাটছাঁট।
চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে ১০ মেগা প্রকল্পের ৮টিতেই বরাদ্দ কমছে। এর মধ্যে মেট্রোরেলের এমআরটি-১ প্রকল্পের বরাদ্দ কমানো হচ্ছে সবচেয়ে বেশি, ৯১ শতাংশ। এমআরটি-৫ (উত্তর) এর বরাদ্দ কমছে ৬০ শতাংশ। মেট্রোলাইনসহ অন্যান্য মেগা প্রকল্পে বরাদ্দ কমছে গড়ে ৩৬ শতাংশ। এডিপিতে এসব প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ৩৩ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা। সংশোধিত এডিপিতে সেটি ১২ হাজার ২৫৫ কোটি টাকা কমে হচ্ছে ২১ হাজার ৬৯৭ কোটি টাকা।
পরিকল্পনা কমিশনের তৈরি করা আরএডিপির খসড়া প্রতিবেদন এভাবেই চূড়ান্ত করা হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের চাহিদা, বাস্তবায়ন অগ্রগতি ও সরকারের উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে এই খসড়া তৈরি করা হয়েছে। আগামী সোমবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে চলতি অর্থবছরের আরএডিপির অনুমোদন দেওয়া হতে পারে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের বৈঠকে সভাপতিত্ব করার কথা।
আরএডিপির খসড়া অনুসারে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার ৩০ হাজার কোটি টাকা কমছে। এতে আরএডিপির আকার দাঁড়াচ্ছে দুই লাখ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছর মূল এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। ১ হাজার ১৭১টি প্রকল্পের বিপরীতে এই বরাদ্দ রয়েছে।
মেগা প্রকল্পের বরাদ্দ কমানোর কারণে কী প্রভাব পড়তে পারে– জানতে চাইলে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান সমকালকে বলেন, অবকাঠামো খাতের মেগা প্রকল্পগুলোর বরাদ্দ কমানো শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রেরই ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ প্রকল্পের বরাদ্দ কমানোর অর্থ হচ্ছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হবে।
তিনি বলেন, এতে দুইমুখী ক্ষতি। সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন না হলে কল্যাণমুখী সেবা সৃষ্টি হয় না। আবার পরে বাস্তবায়ন করতে গেলে ব্যয় বেড়ে যায়। অথচ মাথার ওপর ঋণের বোঝা। প্রকল্পের ব্যয় দেশি অথবা বিদেশি উৎসের ঋণ থেকে নির্বাহ করা হয়। অন্যদিকে দক্ষতার অভাবে বাস্তবায়ন ঠিকমতো না হলে বরাদ্দ কমানো ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকে না। এ অবস্থায় বাস্তবায়ন দক্ষতা বাড়াতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া দ্বিতীয় আর কোনো পথ খোলা নেই।
মেগা প্রকল্পে বরাদ্দ এভাবে কমানোর কারণ জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা বাস্তবায়নকারী সংস্থর পক্ষ থেকে যে বরাদ্দ চাওয়া হয় তার ভিত্তিতেই সংশোধিত এডিপি চূড়ান্ত করা হয়। নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এনইসি বৈঠকে উত্থাপন পর্যন্তই পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের কাজ।
প্রথম মেট্রোরেল এমআরটি-৬-এর প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল ওহাব সমকালকে বলেন, অর্থ বরাদ্দ কমানোর একটি বড় কারণ হচ্ছে সরকারের কাছে টাকা নেই। এ কারণে আগেই সিলিং অর্থাৎ সর্বোচ্চ ব্যয়সীমা বলে দেওয়া হয়েছে। তার ভিত্তিতেই নতুন বরাদ্দ প্রস্তাব করতে হয়েছে।
মেট্রোরেল প্রকল্পগুলোতে বড় কাটছাঁট
আরএডিপির খসড়া প্রস্তাবের মধ্যে সবচেয়ে বড় কাটছাঁট করা হচ্ছে মেট্রোরেলের প্রকল্পগুলোতে।
রাজধানীর জনপ্রিয় গণপরিবহন দেশের প্রথম মেট্রোরেল ‘এমআরটি (ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট) লাইন-৬’-এর বরাদ্দ কমানো হচ্ছে ২৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের বরাদ্দ থেকে ৩২৪ কোটি টাকা কমানোর কথা বলা হয়েছে আরএডিপির খসড়ায়। এ প্রস্তাব অনুমোদিত হলে চলতি অর্থবছরের বরাদ্দ দাঁড়াবে ১ হাজার ২৩ কোটি টাকা। এডিপিতে বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা।
মতিঝিল থেকে কমলাপুর রেলস্টেশন পর্যন্ত মেট্রোরেলের নির্মাণকাজ চলছে এখন। ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর প্রকল্পের উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত অংশ উদ্বোধন করা হয়। ২০২৩ সালের ৪ নভেম্বর আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত অংশেও চলাচল শুরু হয়। সম্প্রতি অপ্রয়োজনীয় বিবেচনায় ৭৫৫ কোটি টাকা কমানো হয় প্রকল্পের মোট ব্যয় থেকে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রকল্পের মোট ব্যয় এখন দাঁড়াচ্ছে ৩২ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা।
বরাদ্দ কমানোর কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন আরও ধীর হয়ে পড়বে কিনা– জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল ওহাব সমকালকে বলেন, সংশোধিত এডিপিতে কম বরাদ্দ প্রস্তাব করা হলেও মেট্রোরেল প্রকল্পের মতিঝিল থেকে কমলাপুর অংশের নির্মাণকাজে যে বরাদ্দ ছিল, সেখানে কোনো রকম হাত দেওয়া হয়নি। ফলে বাকি কাজ যথাসময়ে শেষ করতে কোনো সমস্যা হবে না। এ ছাড়া ভূমি অধিগ্রহণ থেকে বেঁচে যাওয়া অর্থও হাতে রয়েছে। এ কারণে আরএডিপিতে বরাদ্দে কাটছাঁটের কোনো প্রভাব প্রকল্প বাস্তবায়নে পড়বে না।
প্রসঙ্গত, গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত রুটে মেট্রোরেল-৫ (দক্ষিণ) প্রকল্পেও পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আবদুল ওহাব। তবে প্রকল্পটি আপাতত বাদ রাখা হয়েছে।
মেট্রোরেল প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হারে বরাদ্দ কাটছাঁট করা হয়েছে মেট্রো রেললাইন-১ প্রকল্পে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর রেলস্টেশন পর্যন্ত লাইনের প্রকল্পে এডিপি বরাদ্দের ৯১ শতাংশই ছেঁটে ফেলা হচ্ছে। মোট ৮ হাজার ৬৩১ কোটি টাকার মধ্যে ৭ হাজার ৮৩০ কোটি টাকাই কমিয়ে ফেলা হচ্ছে। এতে চলতি অর্থবছরে এ প্রকল্পে বরাদ্দ দাঁড়াচ্ছে মাত্র ৮০১ কোটি টাকা।
একইভাবে হেমায়েতপুর থেকে রাজধানীর ভাটারা পর্যন্ত লাইনের মেট্রোরেল লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পের বরাদ্দ ৬০ শতাংশ কমানো হচ্ছে। এডিপিতে বরাদ্দ ১ হাজার ৪৯০ কোটি টাকার মধ্যে ৮৯৮ কোটি টাকাই ছেঁটে ফেলা হচ্ছে। খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী বরাদ্দ দাঁড়াচ্ছে ৫৯২ কোটি টাকা।
তালিকায় আরও যেসব প্রকল্প
অন্য মেগা প্রকল্পের মধ্যে মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ কমানো হচ্ছে ৭৩ শতাংশ। এডিপিতে এ প্রকল্পে বরাদ্দ থাকা ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকার মধ্যে ২ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকাই কমিয়ে ফেলা হচ্ছে। এতে বরাদ্দ দাঁড়াচ্ছে ১ হাজার ৮৫ কোটি টাকায়।
বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের বরাদ্দ কমানো হচ্ছে ৬০ শতাংশ। ২৫৬ কোটি টাকা কমে সংশোধিত এডিপিতে প্রকল্পের বরাদ্দ দাঁড়াচ্ছে ১৬৯ কোটি টাকার মতো। এডিপিতে প্রকল্পের বরাদ্দ ছিল ৪২৫ কোটি টাকা।
সংশোধিত এডিপিতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পে বরাদ্দ কমছে ৭১ শতাংশ। এক হাজার ৩৯ কোটি টাকার বরাদ্দ ৩০৬ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হচ্ছে। হাটিকুমরুল-রংপুর মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পে বরাদ্দ এক হাজার ৮৭২ কোটি থেকে কমিয়ে এক হাজার ৫৬২ কোটি টাকা করা হচ্ছে।
ঢাকা-সিলেট চার লেন সড়ক প্রকল্পেও বরাদ্দ কমানো হচ্ছে। মূল এডিপি থেকে কমছে ৫৫ কোটি টাকা। আরএডিপিতে বরাদ্দ দাঁড়াচ্ছে ১ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। এডিপিতে প্রকল্পে ১ হাজার ৭২৩ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল।
ব্যতিক্রম দুই প্রকল্প
মেগা প্রকল্পের মধ্যে সংশোধিত এডিপি বরাদ্দ প্রস্তাবের দিক থেকে ব্যতিক্রম শুধু রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প। এর মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে এডিপি বরাদ্দে কোনো রকম পরিবর্তন আনা হচ্ছে না। ১০ হাজার ১১ কোটি টাকার বরাদ্দই বহাল থাকছে। অন্যদিকে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের বরাদ্দ ১ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। এতে আরএডিপিতে প্রকল্পের বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৪ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা।