টানা আন্দোলন, অনশন আর মৃত্যুর পর অবশেষে বেসরকারি নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য এলো স্বস্তির খবর। নতুন করে ১৫০০ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত (মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার) করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ফলে সারা দেশে প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ শিক্ষক-কর্মচারী সরকারি বেতন ও ভাতার আওতায় আসবেন। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই এ কার্যক্রম সম্পন্ন করতে চায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। চলতি বছরের বাজেটে এমপিওভুক্তির জন্য বরাদ্দ ৩০০ কোটি টাকা থেকে নতুন এসব প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করা হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, গত ৭ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেশের বেসরকারি স্কুল ও কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো এবং এমপিও নীতিমালা-২০২৫’ প্রকাশ করেছে। এ নীতিমালার আওতায় নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হবে। নতুন নীতিমালায় এমপিওভুক্ত প্রক্রিয়াকে তদবির ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে বেশকিছু সংশোধনী আনা হয়েছে।
জানা গেছে, ১৪ থেকে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত অনলাইনে এমপিওভুক্তির আবেদন নেওয়া হবে। আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘Online MPO Application’ ওয়েবসাইটের মাধ্যমে আবেদন করতে হবে। এবারের এমপিওভুক্তির পুরো প্রক্রিয়াটি হবে ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে। আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের জন্য একটি বিশেষ সফটওয়্যার তৈরি করা হয়েছে। এ সফটওয়্যার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী সংখ্যা, শিক্ষক সংখ্যা, পরীক্ষার পাসের হার ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা—এসব সূচকের ভিত্তিতে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে স্কোর দেবে। সেই স্কোর অনুযায়ী প্রাথমিকভাবে প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হবে।
এজন্য বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস), বুয়েটসহ একাধিক আইটি বিশেষজ্ঞকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হবে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে আরেকটি চূড়ান্ত কমিটি অনুমোদন দেবে। পরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি নিয়ে বিষয়টি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে পাঠানো হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মিজানুর রহমান কালবেলাকে বলেন, যোগ্য বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়মিত এমপিওভুক্ত করার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাজেটে যে বরাদ্দ আছে, তা দিয়ে যতগুলো প্রতিষ্ঠান সম্ভব, এমপিওভুক্ত করা হবে। আমরা দ্রুততম সময়ের মধ্যেই প্রক্রিয়া শেষ করতে চাই।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছর এমপিও খাতে বরাদ্দ ৩০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৫০ কোটি টাকা স্কুল ও কলেজের জন্য, ৫০ কোটি টাকা মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য। কিন্তু সারা দেশে প্রায় ৩ হাজার স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির যোগ্য। তবে চলতি অর্থবছরের বরাদ্দ দিয়ে প্রথম ধাপে ১ হাজার ৫০০ প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হবে। বাকি যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে অপেক্ষমাণ তালিকায় রাখা হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়া হবে। অর্থের প্রাপ্যতা অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এমপিওভুক্ত করা হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ ২০২১ সালে ২ হাজার ৭০০-এর বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়। এরপর নীতিমালার বাইরে রাজনৈতিক বিবেচনায় আরও ৭১টি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হলে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এরপর আর নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়নি।
এর আগে, প্রায় ১০ বছর বন্ধ থাকার পর ২০১৯ সালের অক্টোবরে তৎকালীন সরকার ২ হাজার ৭৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির ঘোষণা দেয়। চূড়ান্ত যাচাই শেষে ২ হাজার ৬১৫টি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির অনুমোদন পায়। সে সময় অযোগ্য, নীতিমালাবহির্ভূত এবং স্পর্শকাতর মামলায় জড়িতদের নামে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো বাদ দেওয়া হয়।
তখন প্রতি বছর যোগ্য প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে তা বাস্তবায়িত হয়নি।
নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের সভাপতি সেলিম মিয়া কালবেলাকে বলেন, আমাদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফলেই সরকার নতুন করে এমপিওভুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এজন্য শিক্ষা উপদেষ্টাসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ। আমরা চাই, যত যোগ্য প্রতিষ্ঠান আছে সবাইকে এমপিওভুক্ত করা হোক। অন্তত নির্বাচনের আগেই এমপিও কোড দিয়ে দিলে বেতন কিছুদিন দেরি হলেও আমাদের আপত্তি নেই।
জানা গেছে, গত বছর শুধু নন-এমপিও শিক্ষকরা এমপিওভুক্তির দাবিতে মোট ৮৭ দিন আন্দোলন করেছেন। এর মধ্যে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে টানা ৩৭ দিন এবং এর আগে ২০ দিন একটানা অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হয়। এমপিওভুক্তির আশায় অনাহার ও অসুস্থতায় ১৯ জন শিক্ষক মৃত্যুবরণ করেছেন।