Image description
জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল । দুপুরের পর ভর্তি না নেওয়ায় রাত্রিযাপন * নির্মাণ করা হচ্ছে না অস্থায়ী আবাসন ।

জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকলেও দুপুর ১২টার পর কোনো রোগী ভর্তি নেওয়া হয় না। জরুরিভিত্তিতে ভর্তি প্রয়োজন হলেও নির্ধারিত সময়ের পর আসা কোনো রোগীকে ভর্তি করা হয় না। ফলে অপেক্ষমান রোগীরা চরম দুর্ভোগের শিকার হন। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা বেশিরভাগ রোগীকে হাসপাতাল আঙ্গিনায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে হয়। হাসপাতালের ‘বি’ ও ‘সি’ ব্লকের মাঝে খোলা জায়গায় তারা অবস্থান করেন। পৌষের তীব্র শীতের রাতেও ক্যানসার রোগী ও স্বজনদের খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়। মহাখালীতে অবস্থিত পাঁচশ’ শয্যাবিশিষ্ট জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এক সপ্তাহ সরেজমিন ঘুরে এমন দৃশ্য দেখা গেছে।

দীর্ঘদিন ধরে কলোরেক্টাল ক্যানসারে ভুগছেন ৩০ বছর বয়সী যুবক আমির হোসেন। এক সপ্তাহ ধরে পায়খানা না হওয়ায় স্বজনরা কুমিল্লা থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে এই হাসপাতালে নিয়ে আসেন। কিন্তু জরুরিভিত্তিতে ভর্তির সুযোগ না পেয়ে আমির ঢাকা মেডিকেলে যেতে বাধ্য হন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ক্যানসার হাসপাতাল আঙ্গিনায় আগের সরকার অপেক্ষমানদের জন্য অস্থায়ী আবাসন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে তারা কাজই শুরু করতে পারেননি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম হাসপাতাল পরিদর্শনে আবারও একই আশ্বাস দিয়েছেন। এরপর কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও অস্থায়ী আবাসন নির্মাণের ছিটেফোঁটাও বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে গ্রীষ্ম বা বর্ষা নয়, চলমান শীতের মধ্যে অসহায় রোগী ও তাদের স্বজনদের বড় একটি অংশ অনেকটা খোলা আকাশের নিচে রাত্রীযাপনে বাধ্য হচ্ছেন। বুধবার রাতে হাসপাতালের ‘বি’ ব্লকের সামনে বিছানা পেতে শুয়েছিলেন জরায়ুমুখের ক্যানসারে আক্রান্ত টাঙ্গাইলের হাজেরা বেগম (৬০)। মায়ের শয্যাপাশে চুপচাপ বসেছিলেন ছেলে স্বপন মিয়া। যুগান্তরকে স্বপন বলেন, গত বছরের জুলাইয়ে মায়ের ক্যানসার ধরা পড়ে। প্রথমে টাঙ্গাইল মেডিকেলে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে দুই মাস ভর্তির রাখার পর জরায়ুমুখে অস্ত্রোপচার করেন। সেখানে তিনি কিছুদিন সুস্থ ছিলেন। আবার অসুস্থ হলে তাকে ক্যানসার হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়। গত বছর সেপ্টেম্বরে এখানে আসলে চিকিৎসকরা চারটি কেমোথেরাপি নেওয়ার পরামর্শ দেন। ২০ দিন অন্তর একেকটা থেরাপি দেওয়া হয়। হাসপাতালের ‘ডে কেয়ার সেন্টারে’ থেরাপি দেওয়ায় ভর্তি নেওয়া হয় না। আর্থিক অবস্থা নাজুক হওয়ায় ঢাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে তাদের থাকা সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিবার থেরাপি নিতে ৩ থেকে ৪ রাত এখানেই ঘুমাতাম। এখন আবার চিকিৎসকরা রেডিওথেরাপি দিতে বলছেন। সিরিয়ালের জন্য এখানে চারদিন-চাররাত ধরে থাকছি।

ক্যানসারে আক্রান্ত মেয়ে রওশন আরাকে নিয়ে পাশেই বিছানা পেতে শুয়েছিলেন নাটোরের বনপাড়ার বাসিন্দা রাজিয়া বেগম। তিনি জানান, পাঁচ মাস আগে মেয়ের জরায়ু ক্যানসার ধরা পড়ে। বগুড়ার বেসরকারি টিএমএসএস হাসপাতালে ৩ লাখ টাকা খরচ করে ২৮টা রেডিওথেরাপি ও ৪টা কেমোথেরাপি দিয়েছি। চিকিৎসকরা এখন ৩টা ব্র্যাকি থেরাপি দিতে বলছে। এজন্য ৪৫ হাজার টাকা লাগবে। খরচ জোগাতে না পেরে এখানে এসেছি। ব্র্যাকি থেরাপির সিরিয়াল পেতে ১২ দিন ধরে অপেক্ষা করছি। অর্থ সংকটে খোলা জায়গাতেই থাকতে হচ্ছে। তিনি জানান, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত হাসপাতালের ‘সি’ ব্লকের ফ্লোরে থাকি। দুপুরে বহির্বিভাগ বন্ধ হলে আনসার সদস্যরা সেখান থেকে বের করে দেয়। সন্ধ্যায় এখানে বিছানা পেতেছি।

রোগীর স্বজন তানিয়া আক্তার অভিযোগ করে বলেন, এখানে রোগী ও স্বজনসহ দৈনিক ৫০ থেকে ৬০ জন মানবেতরভাবে থাকছেন। এতো সংখ্যক নারী ও পুরুষের জন্য হাসপাতালের বহির্বিভাগের নিচতলায় একটি টয়লেট খুলে দেওয়া হয়েছে। গোসলখানার কক্ষের দরজা নেই। সারাদিন ভিড় লেগে থাকে। ১২ দিনে মাত্র একদিন গোসল করতে পেরেছি। অজুখানা ও নামাজের জায়গা নেই। ক্যান্টিন নেই। পাইপের সাপ্লাই পানি পানে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন।

হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক-নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারী যুগান্তরকে জানান, মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্ত ও শয্যা খালি থাকলে প্রতিদিন বেলা ১১টার মধ্যে হাতে গোনা কয়েকজন রোগী ভর্তির সুযোগ পান। দুপুরের পর আসা রোগীদের ভর্তি নেওয়া হয় না। রোগীদের জন্য জরুরি বিভাগে ১২টি অবজারভেশন বেড রয়েছে। তবে সেখানেও তাদের থাকতে দেওয়া হয় না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেডিওলজি বিভাগের একজন চিকিৎসক জানান, হাসপাতালটিতে দৈনিক গড়ে দুই হাজার রোগী চিকিৎসা নেন। রোগী অনুপাতে রেডিওথেরাপির জন্য ১০টি মেশিন দরকার। ছয়টি মেশিন থাকলেও বর্তমানে দুটি সচল। এমআরআই মেশিনও ২০২২ সাল থেকে অকেজো হয়ে আছে। আগে দৈনিক গড়ে ২০ থেকে ২৫ জনের এক্সরে এবং ১০ জনের মতো সিটি স্ক্যান হলেও ফ্লিম সংকটে এখন তিন থেকে পাঁচজনে নেমে এসেছে। চিকিৎসা নিতে আসা অপেক্ষমান রোগীদের সারি দীর্ঘ হচ্ছে।

এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. জাহাঙ্গীর কবিরকে পাওয়া যায়নি। তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। হাসপাতালের উপপরিচালক (প্রশাসন) ডা. আহমেদ হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, ভর্তি থাকা বেশিরভাগ রোগীই অস্ত্রোপচারের। এর বাইরে রেডিওথেরাপি নিতে আসা রোগী রয়েছে। রেডিওথেরাপি মেশিন সংকটে দুই শিফটে দুটি মেশিনে প্রায় রাত ৮টা পর্যন্ত সেবা দেওয়া হয়। ভর্তির বাইরে ‘ডে কেয়ার সেন্টারে’ দৈনিক গড়ে ৪৫০ জনকে কেমোথেরাপি দেওয়া হয়। বহির্বিভাগের হাজারখানেক রোগী আসেন। ‘সি’ ও ‘বি’ ব্লকের মাঝের শেডে যারা থাকছেন, তারা কেউই ভর্তি রোগী না। কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি বা ভর্তি বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তারা অপেক্ষা করেন। তিনি আরও বলেন, অস্থায়ী আবাসন নির্মাণের বিষয়ে তার জানা নেই। পিডব্লিউডি ভালো বলতে পারবে।