ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মুসাব্বিরকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় দুই কিলারের মুখ প্রকাশ্যে এসেছে। ঘটনাস্থলের সিসি টিভি ক্যামেরায় ধরা পড়া দৃশ্যে অন্তত দুইজনের চেহারা চিহ্নিত হয়েছে। এই কিলারদের ধরতে তৎপরতা চালাচ্ছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও রাজনৈতিক কারণকে সামনে রেখে তদন্ত শুরুর কথা জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। কাওরান বাজার এলাকায় চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক অস্থিরতার সঙ্গে এই ঘটনার যোগসূত্র আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বুধবার রাতে স্টার কাবাব হোটেলের দ্বিতীয়তলা থেকে আলোচনা শেষ করে সিটি হোন্ডা সার্ভিস পয়েন্টের সামনে দিয়ে গলির দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন মুসাব্বির ও মাসুদ। তাদের পেছন পেছন আরও দুই ব্যক্তি যাচ্ছে। সামনের রাস্তায় বসে আছে আরও কয়েকজন যুবক। মুসাব্বির ও মাসুদ ওই রাস্তা দিয়ে সামনে এগুতেই দুই যুবক গলির মধ্যে থেকে হঠাৎ এসে মুসাব্বিরকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। একটি গুলি লাগে মুসাব্বিরের ডান হাতের কনুইয়ের নিচে, আরেকটি তার পেটের ডান পাশে। গুলি লাগার সঙ্গে সঙ্গে লুটিয়ে পড়েন তিনি। ওই সময় মাসুদ তাকে রক্ষা করতে গেলে তাকেও লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে দুর্বৃত্তরা। এলোপাতারি গুলির শব্দ শুনে ওই সময় রাস্তাটি দিয়ে চলাচলকারীর এদিক-ওদিকে দৌড়াদৌড়ি শুরু করেন। ওই দুই শুটার কোমরে পিস্তল গুঁজতে গুঁজতে হেঁটে মেইন রাস্তা দিয়ে পালিয়ে যায়।
ঘটনার একজন প্রতক্ষ্যদর্শী বলেন, আমি প্রাইভেট পড়ে ফিরছিলাম। একটু রাত হয়ে যাওয়ায় আমি একা একা আহ্ছানউল্লাহর গলি দিয়ে বাসার দিকে হেঁটে যাচ্ছিলাম। আমাকে পাশ কাটিয়ে দেখি দুটো লোক সামনের দিকে সজোরে হেঁটে চলে যাচ্ছেন। তাদের একজনের গায়ে হলুদ রঙের গেঞ্জির ওপর অফহোয়াইট রঙের সোয়েটার ও গলায় মাফলার ছিল। আরেকজন লুঙ্গি পরা, গায়ে নীল রঙের জ্যাকেট ও মাথায় লাল রঙের টুপি ছিল। তারা সামনে এগুতেই একের পর এক গুলির আওয়াজ। পরে দেখি মুসাব্বির ভাইকে ধরাধরি করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মাসুদ আলম নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, আমরা ঠিক হোন্ডা শেরুমের সামনে ছিলাম। ঘটনার কিছু সময় আগে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কাওরান বাজারের ব্যবসায়ীদের একটা মিছিল যায় স্টার হোটেলের সামনে দিয়ে। মুসাব্বির স্টার কাবাব থেকে বের হয়ে গলির মধ্যে ঢুকার পরই গুলির শব্দ। প্রথমে আমরা মনে করেছি কোনো গাড়ির চাকা ব্লাস্ট হয়েছে, কিন্তু যখন এক এক করে ৫ বার শব্দ হলো তখন বুঝলাম গুলি। দৌড়ে গিয়ে দেখি কারা যেন গুলি করে চলে যাচ্ছে। অস্ত্রের ভয়ে আমরা কেউ প্রথমে এগুতে সাহস পাইনি। তবে তারা শুধু দু’জনই ছিল না। তাদের সঙ্গে আরও লোক ছিল। কেউ কেউ পেছনের গলি দিয়ে চলে গেছে, আর দু’জন এই মেইন রাস্তার দিকে এসেছে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, নিহত মুসাব্বির ছিলেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি’র সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরবের অনুসারী। তিনি আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এই এলাকা থেকে কাউন্সিলর নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন। আলোচনায়ও ছিলেন। এটাই কাল হয়েছে তার।
এদিকে গতকাল দুপুরে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে মুসাব্বিরের লাশের ময়নাতদন্ত শেষে তার পরিবারের কাছে হস্থান্তর করা হয়। ময়নাতদন্তকারী ঢামেক মর্গের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রভাষক ডা. আয়শা পারভীন উল্লেখ করেছেন, পেটের ডান পাশে আধাইঞ্চি পরিমাণ ছিদ্র। ডান হাতের কনুইয়ের পেছনে একটা ছিদ্র। বাম পায়ের হাঁটুতে জখম ছিল।
স্বামীর লাশ বুঝে নিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে আসা নিহত মুসাব্বিরের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম জানানÑ তারা বসুন্ধরা সিটির পেছনে ১৬/সি, গার্ডেন ভিউ ভবনে থাকেন। তাদের ২ মেয়ে ও ১ ছেলে রয়েছে। সুরাইয়া বেগম বলেন, প্রতিদিন মুসাব্বির বিকালে বাসা থেকে বের হতেন, আবার রাতে ফিরতেন। বুধবারও সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হওয়ার আগে বলেছিলেন, ‘তুমি একটা কফি বানিয়ে দাও, আমি নামাজ পড়ে বের হবো।’ এটাই ছিল তার সঙ্গে আমার শেষ কথা। প্রায় ২০ বছর ধরে তিনি পানির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পর অন্যদের দিয়েই ওই ব্যবসা পরিচালনা করতেন।
তিনি বলেন, কয়েকদিন আগেই আমাকে বলেছিল, আমার বহিষ্কার আদেশ খুব শিগগিরই উঠে যাবে। সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। তবে কিছু শত্রুও তৈরি হয়ছে বলে জানিয়েছিলেন। তাই সব সময় কাউকে না কাউকে সঙ্গে নিয়ে চলতেন। কিন্তু সেই হামলা হলোই। আর প্রথম হামলাতেই সব শেষ। তিনি হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচার দাবি করেন। ময়নাতদন্ত শেষে নয়া পল্টনে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে এবং কাওরান বাজার আম্বরশাহ্ জামে মসজিদের সামনে জানাজা শেষে আজিমপুর কবরস্থানে মুসাব্বিরের লাশ দাফন করা হয়।
স্বেচ্ছাসেবক দলের তেজগাঁও থানার সভাপতি প্রার্থী রিয়াজুল ইসলাম বলেন, স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন মুসাব্বির। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর তার পদ স্থগিত ছিল। এ ছাড়া, মহানগর উত্তরের দুইবারের সাবেক সেক্রেটারি ছিলেন তিনি। ২৬ নং ওয়ার্ডে ২০২০ সালে তিনি কাউন্সিলর নির্বাচনও করেছিলেন। রিয়াজুল বলেন, মুসাব্বির রাজনীতিতে শোডাউন একদম পছন্দ করতেন না। বেশির ভাগ সময় দুই-একজনকে সঙ্গে নিয়ে চলতেন। নেতাকর্মীরা দেখা করতে এলে খুব কম কথায় সবাইকে বিদায় দিতেন। মুসাব্বির গুলিবিদ্ধ হওয়ার জায়গাতেই বেশির ভাগ সময় আড্ডা দিতেন বলেও জানান রিয়াজুল।
বিষয়টি নিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি’র তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান বলেন, মুসাব্বিরের শরীরে দুইটি গুলি লাগে। তার সঙ্গে থাকা আবু সুফিয়ান মাসুদের শরীরে লাগে একটি গুলি। ঘটনাস্থল থেকে আলামত হিসেবে ৭.৬৫ বুলেটের তিনটি খোসা উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনার পর আশপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ এখন পর্যন্ত দুজন দুর্বৃত্তকে দৌড়ে পালাতে দেখেছে। আরও সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ওই দুজনকে শনাক্তে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। আশা করছি, দ্রুত সময়ের মধ্যেই তাদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে পারবো।
একাধিক গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, বুধবার রাতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ফারুক ও আবদুল মজিদ মিলন নামে দুই ব্যক্তিকে ডিবি হেফাজতে নেয়া হয়। এই কিলিং মিশনে ৫ থেকে ৬ জন অংশ নিয়েছিল। এদিকে তদন্তকারী সংস্থাগুলো রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও চাঁদাবাজিসহ কয়েকটি বিষয় সামনে রেখে তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। পুলিশ ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দুই জনের বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে। সেখানে একজনের চেহারা কিছুটা বোঝা যাচ্ছে। ডিসি ইবনে মিজান বলেন, তাকে শনাক্ত করতে পারলেই হত্যার তদন্তে অনেকটা অগ্রগতি হবে। ওই ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে থানা পুলিশ ছাড়াও গোয়েন্দা পুলিশ, র্যাব সমন্বয় করে কাজ করছে।
অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে মামলা: এ ঘটনায় ৪ থেকে ৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে তেজগাঁও থানায় মামলাটি করেছেন মুসাব্বিরের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম। মামলার এজাহারে তিনি বলেন, কাওরান বাজারের সুপারস্টার হোটেলের দ্বিতীয় তলায় প্রতিদিনের মতো বুধবার রাতে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয় মুসাব্বির। এরপর সেখান থেকে ৮টা ১০ মিনিটে সুফিয়ান বেপারী মাসুদকে সঙ্গে নিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। তারা ৮টা ২০ মিনিটে তেজতুরী বাজারে আহসানউল্লাহ ইনস্টিটিউটের সামনে পৌঁছালে অজ্ঞাতনামা ৪-৫ জন তাদের গতিরোধ করে পিস্তল দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি করতে থাকে। এতে মুসাব্বিরের ডান হাতের কনুই, পেটের ডান পাশে গুলি লাগে। এরপর সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তাকে বাঁচাতে মাসুদ এগিয়ে গেলে তাকেও পেটের বাঁ পাশে গুলি করে হামলাকারীরা। মাসুদও রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়লে হামলাকারীরা তাদের মৃত ভেবে গুলি করতে করতে পালিয়ে যায়। মুসাব্বিরকে বিআরবি হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে তার লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।
বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মুসাব্বিরের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। জানাজায় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। জানাজা-পূর্ব বক্তব্যে দলীয় নেতারা মুসাব্বির হত্যায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।