Image description

রান্নার জন্য পাইপলাইনে গ্যাসের অভাব। কারণ সরকারি গ্যাসের পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। এই সংকট পূরণ হতো যে এলপিজির মাধ্যমে, তার  দামও এখন আকাশ ছোঁয়া। ফলে গ্রাহকরা পড়েছেন চরম বেকায়দায়। সরকার এবং এলপিজি সরবরাহকারীরা বৈঠকের পর বৈঠক করে চলেছেন। তাতেও  বাজার নিয়ন্ত্রণে আসছে না। গত দুই দিনের তুলনায় রবিবার (৩ জানুয়ারি) এলপিজির দাম আরও বেড়েছে। বাজারে সাড়ে ১২শ টাকার ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম উঠেছে ২৮০০ টাকায়। শনিবার (২ ডিসেম্বর) যা বিক্রি হয়েছে ২২০০ টাকা।

এলপিজির দাম নিয়ন্ত্রণে শনিবার সন্ধ্যায় জ্বালানি উপদেষ্টার সঙ্গে জরুরি বৈঠক করে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। রবিবার জ্বালানি মন্ত্রণালয় এলপিজি সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করে। এসব বৈঠকের পর সরকারের তরফে বলা হচ্ছে— বাজারের এই সংকট তৈরি হওয়ার কোনও কথা না। নিজেরা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় এখন ব্যবসায়ীদের বাজার নিয়ন্ত্রণ করার অনুরোধ করেছে সরকার।

সরকারি গ্যাসের কী অবস্থা

বর্তমানে পেট্রোবাংলা প্রতিদিন ২ হাজার ৬৩৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করছে। এরমধ্যে ৯৩১ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে। বাকি গ্যাস আসছে দেশের বিভিন্ন কূপ থেকে থেকে। দেশীয় খনি থেকে ক্রমান্বয়ে প্রতিদিনই কিছু না কিছু গ্যাসের সরবরাহ কমতে শুরু করেছে। গত বছরও যেখানে প্রতিদিন দেশীয় খনি থেকে ২০০০ থেকে ২২০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ হয়েছে। সেখানে বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে সর্বোচ্চ ১৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এতে করে দেশীয় খনি থেকে সরবরাহ কমেছে ৩০০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অপরদিকে সরকারের কাছে যে দুটি এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে— সেখান থেকে প্রতিদিন সর্বোচ্চ এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহের সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে ৯৩১ মিলিয়ন সরবরাহ করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশীয় খনি থেকে সরবরাহ কমে যাওয়া এবং এলএনজি সরবরাহ বাড়ানোর আর কোনও উপায় না থাকায় সংকটে পড়তে হয়েছে। শীত মৌসুমের কারণে এই সংকট সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এলপিজির বাজার

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এলপিজির বাজারে এক ধরনের অস্থিতিশীলতা দেখা গেছে। এলপিজির বাজারের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করতো বেক্সিমকো। আওয়ামী লীগের পতনের পর প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার জেলে আছেন। ফলে তাদের ব্যবসায় অচলাবস্থা বিরাজ করছে। সরকারের তরফেও এ বিষয়টি স্বীকার করা হয়েছে। রবিবার জ্বালানি বিভাগ থেকে এক বৈঠকের পর বলা হয়েছে— ৫ আগস্টের পর অনেক ব্যবসায়ী এলপিজির আমদানি কমিয়ে দিয়েছে।

বছরের বিভিন্ন সময়ে এলপিজির যে মাসভিত্তিক চাহিদা রয়েছে, তাতে দেখা যায়—  দেশে গড়ে মাসে এক লাখ ২০ হাজার টন এলপিজি প্রয়োজন হয়। এই হিসাব আমলে নিয়ে অপারেটররা আমদানি করে থাকেন। তবে বিশেষ বিশেষ সময়ে মাসিক চাহিদা বেড়ে ১ লাখ ৪০ হাজার টনও হয়। আবার কোনও কোনও মাসে চাহিদা এক লাখ টনেও নেমে আসে।

লোয়াবের (এলপিজি অপারেটর্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) ভাইস প্রেসিডেন্ট ও এনার্জিপ্যাকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন রশিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘নভেম্বরে কোনও ঘাটতি ছিল না। ডিসেম্বরে লোয়াবের হিসেবে এলপিজি আমদানি হয়েছে ৯৬ হাজার মেট্রিক টন। তবে এনবিআর বলছে— ডিসেম্বরে আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২৭ হাজার টন। এই হিসাবে বাজারে কোনও সংকট থাকার কথা না।’’

তিনি বলেন, ‘‘নিয়মিত এলপিজি পরিবহনের ২৯টি জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়েছে। পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে। তারপরও চাইলেই জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা বিকল্প জাহাজের চেষ্টা করছি।’’

এদিকে সাধারণত শীতের সময় তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় রান্নার পানি গরম হতে অতিরিক্ত গ্যাসের প্রয়োজন হয়। আবার নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে এলপিজির চাহিদা বেশি থাকে। সঙ্গত কারণে সরকার এবং অপারেটরদের তরফ থেকে ঘাটতি না থাকার যে কথা বলা হচ্ছে, তা আদৌ সঠিক নয় বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

মন্ত্রণালয় যা জানালো

সচিবালয়ে এলপিজি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকের পর যুগ্ম সচিব মোহম্মদ মুনীর চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, এলপিজির বাজারে বাড়তি দাম নিয়ে ব্যবসায়ী সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে। তাদের কথা থেকে বোঝা গেছে, বাজারে কোনও সংকট নাই। আমদানি যা করা হয়েছে সে হিসাবে কোনও সংকট নাই। তিনি বলেন, ‘‘আমরা অপারেটর নিয়োগ দেই। পরের ধাপগুলো দেখে অপারেটররা।’’

মুনীর চৌধুরী আরও বলেন, ‘‘বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)  যেহেতু আমাদের এলপিজিটা দেখে। আমরা তাদের কাছে একটা রিপোর্ট চেয়েছি। তিন মাসের ফোরকাস্ট করে দেবেন তারা। এতে আমরা বাজারের অবস্থা বুঝতে পারবো।’’ তিনি জানান, ৫ আগস্টের পর কিছু কিছু অপারেটর তাদের এলপিজি আমদানির পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে। কারণটা আলোচনার প্রেক্ষিতে বোঝা যাবে। যারা নিয়মিত আমদানি করছেন। তাদের আমদানির পরিমাণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে।’’

তবে লোয়াবের নেতারা জানিয়েছেন, এলসি খোলা, আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট নিয়ে তারা কিছু সমস্যায় পড়ছেন। সেটা সমাধানে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন তারা।

বিইআরসির বক্তব্য

রবিবার (৩ জানুয়ারি) জানুয়ারি মাসের এলপিজির দাম নির্ধারণ ও ঘোষণার সময় বিইআরসি’র চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান, সরকারের নির্ধারিত দামেই যে গ্রাহকরা এলপিজি কিনতে পারবেন, সেটার নিশ্চয়তা তারা দিতে পারছে না। তিনি মধ্যপ্রচ্যের জাহাজ সংকটের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘‘আমরা এজন্য সিঙ্গাপুরভিত্তিক কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে এলপিজি আমদানির কথা বলছি ‘’

তিনি আরও বলেন, ‘‘যে কোম্পানিগুলো এলপিজি আমদানি করে থাকে, তাদের যাবতীয় খরচ হিসাব করেই আমরা দামটা নির্ধারণ করে দিই। অ্যাসোসিয়েশন আমাদের বলেছে, নির্ধারিত দামেই তারা পণ্যটা সরবরাহ করছে। এছাড়া আমরা ভোক্তা অধিকারেও কথা বলেছি, যাতে তারা উচ্চমূল্য প্রতিরোধে অভিযান চালায়। আর উচ্চমূল্যের বিষয়ে যদি কোনও কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যায়, তাহলে আমরা ব্যবস্থা নেবো।’’