ফাতেমা বেগম। যিনি ছিলেন সদ্য প্রয়াত বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার একজন বিশ্বস্ত গৃহপরিচারিকা। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ, গৃহবন্দিত্বের দীর্ঘ দিন, হাসপাতালের নিঃসঙ্গ রাত কিংবা বিদেশ সফরের নীরব করিডর, সবখানেই নিঃশব্দে উপস্থিত ছিলেন ফাতেমা। তিনি কোনো রাজনৈতিক কর্মী নন, কোনো দলীয় পদও নেই। তবু ইতিহাসের কঠিন মুহূর্তগুলোয় তার উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
অভিভাবকতুল্য খালেদা জিয়াকে চিরতরে হারিয়ে অনেকের মতো শোকাহত ৩৫ বছর বয়সী এ নারী। নিজের পরিবার ছেড়ে বিএনপির চেয়ারপারসনের সার্বক্ষণিক ছায়াসঙ্গী ছিলেন ফাতেমা। এভারকেয়ার হাসপাতালে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত খালেদা জিয়ার পাশে ছিলেন। ফাতেমা বেগম প্রমাণ করেছেন, সব সম্পর্ক ক্ষমতার নয়। রাজনীতির কোলাহলের ভিড়ে তিনি এক নীরব নাম। কিন্তু সেই নীরবতাই আজ তাঁকে আলাদা করে চিহ্নিত করেছে।
বেগম খালেদা জিয়ার বাসায় কাজ করার আগে এবং গত ১৬ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কেমন কেটেছে ফাতেমা বেগমের পরিবার ও তার দুই সন্তানের জীবন, তা বর্ণানা করেছেন ফাতেমা বেগমের সেজ বোন মমতাজ বেগম (৩০)। ভোলা সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের শাহ-মাদার গ্রামের ফাতেমা বেগমের বাড়িতে তার সাথে ১ জানুয়ারি সকালে কথা হয়। শ্বশুরবাড়ি ময়মনসিংহ থেকে গত প্রায় সপ্তাহ খানেক আগে বাবার বাড়িতে আসেন মমতাজ বেগম।
মমতাজ বেগম আজকের পত্রিকাকে বলেন, আমরা ৪ বোন ও ১ ভাইর মধ্যে ফাতেমা বেগম সবার বড়। বাকি দুই বোন জোহরা বেগম ও নুরজাহান বেগমেরও বিয়ে হয়েছে। একমাত্র ভাই রুবেল ভোলা সদর উপজেলার স্থানীয় পরান গঞ্জ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ছে। ফাতেমা বেগমের মেয়ে জাকিয়া আক্তার (রিয়া) এইচএসসি পাস করে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার জন্য এখন ঢাকায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ছেলে রিফাত (১৭) স্থানীয় টবগী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এ বছর নবম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণীতে উঠেছে। তাদের মা ফাতেমা বেগম-ই দুই সন্তানের পড়ালেখার খরচসহ বাড়ির যাবতীয় সকল খরচ বহন করছেন বলেও জানান ফাতেমার সেজ বোন মমতাজ।
তিনি আরও বলেন, এক সময় আমরা খুব অভাবে ছিলাম। আমাদের বাবা রফিজল ইসলাম (৭৫) যখন ঢাকায় ঘুইয়া পাড়া রেল গেটে একটি ক্ষুদ্র মুদির দোকানের ব্যবসা করতেন, তখন অনেকটা কষ্টে আমাদের জীবন চলছিল। ভোলার কাচিয়া ইউনিয়নে মেঘনা নদীর তীরের বাসিন্দা দরিদ্র মাছ ব্যবসায়ী মো. হারুন লাহাড়ির সঙ্গে বিয়ের পর সংসার বাঁধেন বড় বোন ফাতেমা। ভগ্নিপতি হারুন কখনো মাছ বিক্রি করে, আবার কখনো চরে কৃষিকাজ করে জীবন চালাতেন কোন রকমে। প্রায় ১৭-১৮ বছর আগে মেঘনায় বিলীন হয়ে যায় তাঁদের বসতবাড়ি। ওই সময়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যান ফাতেমার স্বামী হারুন লাহাড়ি। মুহূর্তে বদলে যায় জীবন। যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। সংসারে দেখা দেয় অভাব-অনটন।
মমতাজ বেগম বলেন, তখন জীবনের তাগিদে কাজের সন্ধানে রাজধানী ঢাকায় যান ফাতেমা। সেখানে এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের মাধ্যমে কাজের সুযোগ পান বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বাসভবনে। সেই থেকেই এখন পর্যন্ত খালেদা জিয়ার বাসায়-ই থাকছেন। দেড় দশকের বেশি সময় ধরে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিলেন ফাতেমা। বাসভবন থেকে শুরু করে কার্যালয়, রাজপথ, হাসপাতাল, বিদেশ এমনকি কারাগার—সবখানে খালেদা জিয়ার সঙ্গে থেকেছেন তিনি।
বিএনপির চেয়ারপারসন প্রয়াত হওয়ার পর এবার সেই ফাতেমাকে দেখা গেল জাইমা রহমানের সঙ্গে। দৈনন্দিন নানা প্রয়োজনে ফাতেমা যেভাবে খালেদা জিয়াকে সঙ্গ দিতেন, একইভাবে জাইমা রহমানকেও এখন তিনি সঙ্গ দিচ্ছেন।
২০১০ সাল থেকে খালেদা জিয়ার সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিলেন ফাতেমা বেগম। গৃহকর্মী থেকে হয়ে ওঠেন বিএনপির চেয়ারপারসনের ব্যক্তিগত জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফাতেমা বেগমের বাবা রফিজল ইসলাম ও মা মালেকা বেগম বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন।
ফাতেমা বেগমের ভাসুরের ছেলে আবুল খায়ের বলেন, গত ১৬ বছর বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মানসিকভাবে কিছুটা অস্বস্তিতে ছিলেন ফাতেমার বাবা-মা ও তাঁর দুই সন্তান। আবুল খায়ের বলেন, প্রায় ১০ বছর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ফাতেমা বেগমের বাড়ির সামনের রাস্তাটি পাকাকরণের কথা ছিল। কিন্তু ওই সময়ে সেই রাস্তাটি ফাতেমার বাড়ির সামনে না করে পাশে করা হয়েছে। ফাতেমার বাড়ির সামনের রাস্তাটি এখনো সংস্কার করা হয়নি। এ ছাড়া ১৫ বছর আগে ঢাকায় বর্তমান নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা ফাতেমা বেগমের বাবার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। এরপরই ফাতেমার বাবা রফিজল ইসলাম ভোলায় চলে আসেন। সেই থেকে তিনি বেকার।
ফাতেমা বেগমের মেয়ে জাকিয়া আক্তার (রিয়া) আজ শনিবার সকালে মোবাইল ফোনে আজকের পত্রিকাকে বলেন, আমি এখন ঢাকায় আছি। ভোলায় নিজ এলাকার স্কুল থেকে এইচএসসি পাস করে এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় দুটোতেই ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছি। মা ফাতেমা বেগমের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে এবং বেগম খালেদা জিয়ার বাসায়ও মাঝে মধ্যে যান বলেও জানান রিয়া।