Image description

রাজপথ দখল না করা পর্যন্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারির যোদ্ধা ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে না বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আলোচিত শিক্ষিকা শেহরীন আমিন মোনামী। আজ শুক্রবার (২ জানুয়ারি) বিকেলে শাহবাগে ইনকিলাব মঞ্চের অবরোধ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় এমন মন্তব্য করেন তিনি।

ঢাবির লোকপ্রশাসন বিভাগের এই শিক্ষিকা বলেন, ‘এখানে আমরা যারা একত্রিত হয়েছি, আমরা একটা দাবিতেই এসেছি। আমরা আমাদের শহীদ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই। আমি মনে করি এখানে আরও মানুষ আসা দরকার। আরও বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণি-পেশার মানুষের আসা দরকার। শুধুমাত্র আমরা যারা আসছি, তারাই বারবার আসছি, এটা যেন না হয়। আমি চাই যে জুলাইয়ে আমরা যেমন একটা বিশাল জনসমুদ্র শাহবাগে অবস্থান করেছিলাম, এরকম আসা দরকার।’

তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় না আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত না রাস্তায় নামব, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা রাজপথ দখল করব, ততক্ষণ পর্যন্ত আমার ভাইয়ের হত্যার বিচার হবে না। কারণ অনেক দেরি হয়ে গেছে, ধৈর্য্যের অনেক পরীক্ষা দিচ্ছি আমরা। আই ডোন্ট থিক দ্যাট স্টেট শুড টেস্ট আস (আমি মনে করি না রাষ্ট্রের আমাদের এই পরীক্ষা নেওয়া উচিত)। আর সোশ্যাল মিডিয়াতে আমরা দেখি যে অনেকেই দুঃখ প্রকাশ করে। যারা বাসায় বসে দুঃখ প্রকাশ করছেন, প্লিজ আপনারা ইনকিলাব মঞ্চের সাথে আসেন। আমাদের সাথে আসেন, আমরা সবাই মিলে বিচারের দাবি করি।’

শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে আজ শুক্রবার জুমার পর বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শাহবাগে অবস্থান নেয় ইনকিলাব মঞ্চ, যা এক পর্যায়ে অবরোধে রূপ নেয়। বিকেলে এই কর্মসূচি সমাপ্ত ঘোষণা করেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের। এর আগে বক্তব্য দেওয়ার সময় আব্দুল্লাহ আল জাবের আগামী ৭ জানুয়ারি খুনের সঙ্গে জড়িত সকলের নামে চার্জশিট দাখিল না হলে সরকার পতনের আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন।

আব্দুল্লাহ আল জাবের বলেন, ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে সরকারের বিভ্রান্তিকর বক্তব্য আমরা বিশ্বাস করি না। হাদিকে হত্যা করা হয়েছে, কারণ তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভারতীয় সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছিলেন। ঘটনার ২১ দিন পেরিয়ে গেলেও সরকার এখনো প্রকৃত খুনিদের শনাক্ত ও গ্রেফতার করতে ব্যর্থ হয়েছে, যা সরকারের সদিচ্ছার অভাবের প্রমাণ। সরকার আগামী ৭ জানুয়ারি চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দেওয়ার কথা বললেও, শুধুমাত্র ফয়সাল করিম মাসুদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে যাদের হাত রয়েছে, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় এনে চার্জশিট দিতে হবে। তা না হলে ৭ জানুয়ারির পর সরকার পতনের আন্দোলন শুরু করা হবে।

তিনি বলেন, খুনের সাথে সম্পৃক্ত এমন একজনকেও তারা গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়নি, এমনকি তাদের এই গ্রেপ্তারের ব্যাপারে কোন সদিচ্ছা আছে বলেও আমাদের কাছে মনে হয় না। ডিএমপি কমিশনার এখানে সংবাদ সম্মেলন করে বলে যে ওসমান হাদির খুনের সাথে জড়িত দুজনকে মেঘালয় পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে আর মেঘালয় পুলিশ বলছে এটা স্রেফ বানোয়াট কথা, এখানে কাউকে আমরা গ্রেপ্তার করিনি। তার মানে তারা চায় যে ওসমান হাদিকে যারা খুন করেছে, এই ঘটনাটাকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে যাতে জনগণকে বিভ্রান্ত করা যায়। এখন একটাই তাদের মতি, জনগণকে কোন পদ্ধতিতে বিভ্রান্ত করা যায়।

তিনি বলেন, কিন্তু যে জনগণ এখানে বসে রয়েছে জুমার নামাজ পড়ে, এই জনগণকে আপনি বিভ্রান্ত করে ফেলবেন? এই জনগণ কি বিভ্রান্ত হওয়ার জন্য এখানে বসে আছে? আমাদের কথা খুব পরিষ্কার, আমাদের কোন লুকোচুরি নাই। নির্বাচন পর্যন্ত রাজপথে থেকেই রাষ্ট্র পাহারা দেবে ইনকিলাব মঞ্চ। হাদি হত্যার বিচার সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়াই সংগঠনের সুস্পষ্ট অবস্থান বলে ঘোষণা দেন তিনি।


ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব রাজনৈতিক দলগুলোকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনাদের সঙ্গে যদি কেউ বৈঠক করতে আসে, আপনারা অবশ্যই বৈঠক করবেন। কিন্তু সেই বৈঠক হবে ওপেন, কোনো সিক্রেট বৈঠক নেই। দিল্লির সঙ্গে আমাদের কোনো গোপন বৈঠক চলবে না।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের তিন পাশ থেকে ভারতীয় আধিপত্যবাদ, যার কারণে আমরা ভারতীয় আধিপত্যের বিপক্ষে কথা বলি। আমরা কারও কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব দিয়ে দেবো না। আমাদের এই লড়াইটা কেবলমাত্র শুরু। ওসমান হাদি হচ্ছে আমাদের এই লড়াইয়ের পথটা দেখিয়ে গেছেন। এখন আমাদের সেই অনুযায়ী সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

গত ১২ ডিসেম্বর জুমা নামাজের পর পল্টনে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় গুলিবিদ্ধ হন শরিফ ওসমান হাদি। তিনি ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থিতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। ওই দিন তিনি রিকশায় চলন্ত অবস্থায় মোটরসাইকেলে দুজন এসে তাকে গুলি করে পালিয়ে যায়। মাথার কাছে গুলিবিদ্ধ হলে দ্রুত তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও পরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। এক সপ্তাহ পর সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন তিনি। পরদিন তার লাশ ঢাকায় নিয়ে এসে ২০ ডিসেম্বর লাখো জনতার উপস্থিতিতে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। একই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধিসৌধে তাকে সমাহিত করা হয়।

এ ঘটনায় ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে হত্যাচেষ্টার মামলা করেন, যা পরে হত্যা মামলায় রূপ নেয়। এ মামলায় এখন পর্যন্ত ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে মূল সন্দেহভাজন ফয়সাল করিম ওরফে দাউদ খান ও আলমগীর হোসেনকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তারা দেশে আছে কিনা এ নিয়েও কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য দেননি কেউ।

হাদি হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার ১১ জনের মধ্যে ছয়জন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এ ছাড়া চারজন সাক্ষীও আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। গ্রেপ্তার হওয়া আসামিরা হলেন প্রধান অভিযুক্ত ফয়সালের বাবা মো. হুমায়ুন কবির, মা মোসা. হাসি বেগম, ফয়সালের স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া, ফয়সালের বান্ধবী মারিয়া আক্তার, তার শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ, রেন্ট-এ-কার ব্যবসায়ী মো. নুরুজ্জামান নোমানী, মোটরসাইকেলের মালিক মো. কবির, আমিনুল, মো. ফয়সাল, হালুয়াঘাট সীমান্তে মানব পাচারকারী হিসেবে পরিচিত সিমিরন দিও ও সঞ্জয় চিসিম। আগামী ৭ জানুয়ারি এ ঘটনার চার্জশিট দাখিল করবে পুলিশ।