বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এ বছরের শুরুতে ভারতের একজন কূটনীতিকের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার নিজের বাসভবনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জামায়াতের আমির এই বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বৈঠকটি তার বাইপাস সার্জারির পর অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
জামায়াতের আমির রয়টার্সকে বলেন, অন্যান্য দেশের কূটনীতিকরা যেমন প্রকাশ্যে তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন, ভারতীয় কূটনীতিক তা করেননি। ওই ভারতীয় কর্মকর্তা বৈঠকটি গোপন রাখতে বলেছিলেন।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘কেন? অনেক কূটনীতিক আমার কাছে এসেছিলেন এবং তা প্রকাশ করা হয়েছিল। সমস্যা কোথায়?’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সবার কাছে এবং একে অপরের কাছে উন্মুক্ত হতে হবে। আমাদের সম্পর্কোন্নয়ন ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।’
জামায়াত আমিরের এই বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চেয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তাৎক্ষণিক কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে ভারতের সরকারের একটি সূত্র বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রয়টার্স জিজ্ঞেস করেছিল জামায়াতের পাকিস্তানের সঙ্গে ঐতিহাসিক ঘনিষ্ঠতা নিয়ে। শফিকুর রহমান জবাবে বলেন, ‘আমরা সবার সঙ্গে একটি ভারসাম্যপূর্ণ উপায়ে সম্পর্ক বজায় রাখি। আমরা কখনো কোনো একটি দেশের দিকে ঝুঁকে পড়ার বিষয়ে আগ্রহী নই।’
জামায়াতের আমির আরও জানান, ঢাকা থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর শেখ হাসিনার ভারতে ধারাবাহিক অবস্থান একটি উদ্বেগের বিষয়, যেখানে তার পতনের পর থেকে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারত হাসিনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে।
ঐক্যের সরকার
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একসময় নিষিদ্ধ জামায়াতে ইসলামী আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নিজেদের সবচেয়ে বেশি শক্তিমত্তা দেখাতে যাচ্ছে। দলটি একটি ঐক্যের সরকারে যোগ দেওয়ার বিষয়ে উন্মুক্ত এবং এ বিষয়ে বেশ কয়েকটি দলের সঙ্গে আলোচনা করেছে বলে দলটির প্রধান জানিয়েছেন।
জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, প্রায় ১৭ বছর পর প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যাওয়া জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) পর দ্বিতীয় অবস্থানে থাকবে। ব্যবধান কম থাকবে। জামায়াত সর্বশেষ ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপির জোটসঙ্গী হিসেবে ক্ষমতার অংশীদার ছিল।
জেন-জিদের দল (এনসিপি) সঙ্গে নির্বাচনী জোট করার কয়েক দিন পর দেওয়া সাক্ষাৎকারে জামায়াত আমির বলেন, ‘আমরা অন্তত পাঁচ বছর দেশকে স্থিতিশীল দেখতে চাই। দলগুলো যদি এক জায়গায় আসে, তাহলে আমরা একসঙ্গে সরকার পরিচালনা করব।’
দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জামায়াতের আমির বলেন, কোনো ঐক্যের সরকারের জন্য দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান অবশ্যই একটি অভিন্ন এজেন্ডা হবে। তিনি আরও বলেন, যে দল সবচেয়ে বেশি আসন পাবে, সেই দল থেকে প্রধানমন্ত্রী হবেন। যদি জামায়াত সবচেয়ে বেশি আসন পায়, প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেবে দল।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জামায়াতে ইসলামীর এই উত্থান ঘটেছে গত বছরের আগস্টে তরুণদের নেতৃত্বে অভ্যুত্থানের পর, যখন দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পতিত হন। হাসিনার দল এবার নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।
হাসিনা জামায়াতের কঠোর সমালোচক ছিলেন। তার আমলে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে থাকার কারণে জামায়াতের কয়েকজন নেতার মৃত্যুদণ্ড হয়। আদালতের এক রায়ের পর ২০১৩ সাল থেকে জামায়াতে ইসলামের নিবন্ধন স্থগিত থাকায় নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল না। নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার ২০২৪ সালের আগস্টে দলটির ওপর থেকে বিধিনিষেধ তুলে নেয়।
সাক্ষাৎকারে জামায়াতের আমির বলেন, জামায়াতকে নিয়ে কোনো সরকার গঠিত হলে সেই সরকার রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে নিয়ে ‘স্বস্তি বোধ’ করবে না।
২০২৩ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থনে কোনো বিরোধিতা ছাড়াই নির্বাচিত হন তিনি। চলতি মাসের শুরুতে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন জানিয়েছিলেন, মেয়াদের মধ্যভাগে পদত্যাগ করতে চান।
তবে বুধবার রয়টার্সের সঙ্গে টেলিফোনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জামায়াত আমিরের অবস্থান নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তিনি বলেন, ‘এ বিষয়টিকে আর জটিল করতে চাই না’।