Image description

‘আমি সাংবাদিককেও ভয় পাই না, পুলিশকেও ভয় পাই না, গুন্ডা-মাস্তানকেও ভয় পাই না। ভয় পাই আমাকে ভালোবাসি বলা মানুষদের।’-সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এমন এক স্ট্যাটাসে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন মেঘনা আলম। তবে শুধু এই বক্তব্যই নয়, নিজের আইনি লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের ভূমিকারও প্রশংসা করেছেন তিনি আজকের (৬ নভেম্বর) আরেকটি স্ট্যাটাসে। একই সঙ্গে অভিনেত্রী পরীমনির প্রতি ভালোবাসা ও সহমর্মিতা প্রকাশ করে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন।

আজ নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া সেই দীর্ঘ পোস্টে এসব কথা লিখেছেন মেঘনা আলম। সেখানে তিনি জানিয়েছেন, নিজের আইনি লড়াইয়ের সময় দিনের পর দিন আদালতে সাংবাদিকদের উপস্থিতি তাকে সাহস ও নিরাপত্তার অনুভূতি দিয়েছে। একজন নারী হিসেবে সাংবাদিকদের মাঝেই নিজেকে সবচেয়ে নিরাপদ মনে করেছেন তিনি। সাংবাদিকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে নিজের জীবনের কঠিন সময়ের নানা অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেছেন এই সাবেক সুন্দরী।

 

মেঘনা আলম লিখেছেন, তিনি কোনো নায়িকা বা মডেল নন। ২০২০ সালে মিস বাংলাদেশ হলেও খুব বেশি আলোচনায় আসেননি। অথচ তার আইনি লড়াইয়ের সময় শত শত সাংবাদিক দিনের পর দিন বিনা পারিশ্রমিকে ও বিনা আমন্ত্রণে সংবাদ সংগ্রহ করেছেন। আদালত প্রাঙ্গণে কখনো দেহরক্ষী, অভিভাবক কিংবা কোনো পুরুষ সঙ্গী ছাড়াই একা গিয়েছেন তিনি। সে সময় সাংবাদিকরাই তাকে পরিবারের সদস্য ও বন্ধুর মতো আগলে রেখেছেন।

সাংবাদিকদের ধারণ করা ভিডিওর ভিন্ন ভিন্ন অ্যাঙ্গেলের কারণে অনেক সময় মানুষ তাকে ভুল বুঝেছেন বলেও উল্লেখ করেন মেঘনা। বারবার নিজের পরিচয় ব্যাখ্যা করতে হয়েছে তাকে। তবে এসবের পরও একজন নারী হিসেবে সাংবাদিকদের মাঝে ঘেরা অবস্থায় তিনি নিজের আইনি লড়াইয়ে সবচেয়ে নিরাপদ বোধ করেছেন।

২০২৫ সালের একটি রাতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথাও পোস্টে তুলে ধরেছেন মেঘনা আলম। তার ভাষ্য, সেদিন কাউকে কিছু না জানিয়ে প্রথমবারের মতো তাকে আদালতে নেওয়া হয়। এমনকি সাংবাদিকদেরও বিষয়টি জানানো হয়নি। তার বাবাকে বলা হয়েছিল, তাকে বাসায় পৌঁছে দেওয়া হবে। কিন্তু পাল্টা মামলা করার আশঙ্কায় তাকে কারাগারে পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।

প্রিজন ভ্যানে তোলার সময় ভয়ে চিৎকার করে পুলিশকে বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করতে অনুরোধ করেছিলেন বলেও জানান মেঘনা। তার দাবি, তখন পুলিশ তাকে বলেছিল, তিনি চিৎকার করলে সাংবাদিকেরা চলে আসবেন। বিনা বিচারে, তদন্ত, প্রমাণ ও সাক্ষী ছাড়াই তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি। একই সঙ্গে গণমাধ্যমে ভুল তথ্য ছড়িয়ে তাকে সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও দাবি তার।

মেঘনা আলমের দাবি, ৩০ দিনও তাকে কারাগারে আটকে রাখা সম্ভব হয়নি। এর পেছনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকদের ভূমিকা ছিল বলে মনে করেন তিনি। শ্রীলঙ্কা থেকে ইতালি, ইউরোপ, আরব বিশ্ব ও যুক্তরাষ্ট্রের সাংবাদিকেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তার পক্ষে কথা বলেছেন।

 

মেঘনা আলম। ছবি: সংগৃহীত
 
মেঘনা আলম। ছবি: সংগৃহীত

 

পরবর্তী সময়ে আরেক দিন তাকে আদালতে নেওয়া হলেও আইনজীবী দেওয়া হয়নি এবং পরিবারকেও জানানো হয়নি বলে অভিযোগ করেন মেঘনা। আদালতে যাওয়ার আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা না বলার জন্যও তাকে বোঝানো হয়েছিল। তবে কারাগারে থাকার সময় নিয়মিত একটি দোয়া পড়তেন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতেন বলে জানান তিনি।

সেদিন আদালতে সাংবাদিকদের দেখতে পেয়ে তিনি চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘আল্লাহর চেয়ে শক্তিশালী কেউ নেই। There is no one more powerful than God।’ এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি বলেও উল্লেখ করেন মেঘনা।

জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সময়ও সাংবাদিকদের সহযোগিতার কথা স্মরণ করেছেন তিনি। তার দাবি, কোনো ব্যানার তৈরি না করে কিংবা নিজের পকেট থেকে অর্থ খরচ না করেও সাংবাদিকদের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পেয়েছেন। নিজের বক্তব্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকর্মীদের ভূমিকার জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।

এদিকে অভিনেত্রী পরীমনির প্রতিও ভালোবাসা ও সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন মেঘনা আলম। নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরীমনির ঘটনার তুলনা করতে চান না জানিয়ে তিনি লিখেছেন, পরীমনির প্রতি তার অনেক ভালোবাসা রয়েছে। নারীদের জন্য পরীমনির লড়াই এবং নানা বাধা পেরিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা তাকে অনুপ্রাণিত করে।

আদালত প্রাঙ্গণে পরীমনির সঙ্গে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন মেঘনা। তার মতে, নারীর শরীরে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করার ঘটনায় প্রকৃত ব্যক্তিকে তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা অনেক সময় কঠিন। এ ঘটনায় সাংবাদিকদের কেউ জড়িত, নাকি অন্য কেউ এমন কাজ করে দ্রুত সরে গিয়ে অন্য কাউকে ফাঁসানোর চেষ্টা করেছে, সেটিও তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। কাউকে আগেভাগে দোষী সাব্যস্ত না করে প্রকৃত দায়ী ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানান তিনি।

সাংবাদিকদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানিয়ে মেঘনা বলেন, যেভাবে তাকে আগলে রেখেছেন, সেভাবেই আদালত প্রাঙ্গণে আসা প্রতিটি নারীকে নিরাপদ রাখার বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। আদালত এমন একটি জায়গা, যেখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও অপরাধের বিচার হওয়ার কথা। সেখানে কোনো নারী যেন অসম্মান, হয়রানি কিংবা অনিরাপত্তার শিকার না হন, সে বিষয়ে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

 

নিজের অতীত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে মেঘনা আরও লিখেছেন, গোপনে আদালতে নিয়ে গিয়ে কারাগারে পাঠানোর ঘটনার পর বিচারব্যবস্থা ও মানুষের মনুষ্যত্বের ওপর থেকে তার বিশ্বাস হারিয়ে গিয়েছিল। নিজেকে অসহায় ও একা মনে হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আদালতে যতবার সাংবাদিকদের পাশে পেয়েছেন, ততবার নতুন করে সাহস ও আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছেন।