চট্টগ্রামের চান্দগাঁওয়ে ইট-বালুর ব্যবসায়ী আফতাব উদ্দিন তাহসিন (২৭) হত্যার ঘটনায় আটজন সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছে পুলিশ। তাদের একজন শীর্ষ সন্ত্রাসী মো. সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ। বাকি তিনজনের বিরুদ্ধে হত্যার পরিকল্পনা আগে থেকে জানা, আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ এবং হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়েছে।
পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, ব্যবসায়িক আধিপত্য ও পূর্ববিরোধের জেরে তাহসিনকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। একটি কালো নোহা গাড়িতে করে অস্ত্রধারীরা ঘটনাস্থলে যান। চায়ের দোকানে বসে থাকা তাহসিনকে লক্ষ্য করে তাঁরা গুলি চালান। হত্যার পর ফাঁকা গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে তাঁরা পালিয়ে যান।
২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর বিকেলে চান্দগাঁও থানার অদূরপাড়া এলাকায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। প্রায় দুই বছর পর গত ২৯ সেপ্টেম্বর চান্দগাঁও থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শরিফুল ইসলাম আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। তবে বিষয়টি জানাজানি হয় বৃহস্পতিবার । এতে আটজনকে সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারী এবং তিনজনকে সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তদন্তে সাক্ষীদের জবানবন্দি, ঘটনাস্থলের আলামত, গাড়ির ভিডিও ফুটেজ, ময়নাতদন্ত ও ব্যালিস্টিক পরীক্ষার প্রতিবেদনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, সরাসরি অংশ নেওয়া আটজন হলেন মো. সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ, মো. হাসান, মোহাম্মদ, মো. খোরশেদ আলম চৌধুরী, মো. হেলাল, মো. ইলিয়াছ হোসেন অপু, মো. বোরহান এবং মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন। পুলিশের ভাষ্য, তারা সবাই শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের অনুসারী। ছোট সাজ্জাদ ও ডেভিড ইমন বর্তমানে কারাগারে আছেন। তবে বড় সাজ্জাদ দাবি করেছেন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাঁ কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী আসামিরা কালো নোহা গাড়িতে করে অদূরপাড়ায় যান। গাড়ি থেকে নেমে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে তারা তাহসিনের চায়ের দোকানের দিকে এগিয়ে যান। এরপর তাকে লক্ষ্য করে শটগানের গুলি ছোড়া হয়। পুলিশের অভিযোগ, সাজ্জাদ ও তার সহযোগীরা অভিন্ন উদ্দেশ্যে এতে অংশ নেন। তাদের কয়েকজন সরাসরি গুলি চালান, অন্যরা অস্ত্র হাতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখেন।
চান্দগাঁও থানার ওসি জসিম উদ্দিন বৃহস্পতিবার বলেন, তদন্তে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে, তাদের নামেই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।
সরাসরি অংশ নেওয়া আটজনের বাইরে আরো তিনজনকে সহযোগী হিসেবে অভিযুক্ত করেছে পুলিশ। তারা হলেন মো. এমরান, মো. সাইফুল ইসলাম ও শিহাব উদ্দিন সিদ্দিকী ওরফে রিহান শিহাব। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, হত্যার পরিকল্পনার কথা আগে থেকেই জানতেন এই তিনজন। তারা মূল আসামিদের আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ করেন। এ ছাড়া হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নে প্ররোচনা, ইন্ধন ও অন্যান্যভাবে সহযোগিতা করেন।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক অপর্ণা দাশ ও মাহরিন ইসলাম তাহসিনের ময়নাতদন্ত করেন।
তদন্তে ঘটনাস্থল থেকে চারটি ফায়ার করা কার্তুজ, ১০টি ধাতব পিলেট ও ইনার ওয়াড উদ্ধার করা হয়। সিআইডি চট্টগ্রাম অঞ্চলের ফরেনসিক ব্যালিস্টিক ল্যাবে এসব আলামত পরীক্ষা করা হয়। ব্যালিস্টিক বিশেষজ্ঞ মুহম্মদ শাকেরুল আলম তার মতামতে বলেছেন, উদ্ধার করা চারটি কার্তুজ ১২ বোরের শটগান বা একই ধরনের স্মুথ বোর আগ্নেয়াস্ত্র থেকে ছোড়া হয়েছে। পিলেট ও ইনার ওয়াডও শটগানজাতীয় অস্ত্রের প্রজেক্টাইল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
এ ছাড়া তদন্তে আরও কয়েকটি আলামত জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বলে অভিযোগ করা কালো নোহা গাড়ি, তাহসিনের রক্তমাখা পোশাক, স্যান্ডেল, চশমা, ঘটনাস্থলের রক্তের নমুনা এবং হামলাকারীদের গাড়ি থেকে নামা-ওঠার ভিডিও ফুটেজসংবলিত একটি পেনড্রাইভ।