Image description

চলতি আমন মৌসুমের শুরু থেকে ঝিনাইদহে সার নিয়ে বিপাকে পড়ে কৃষকরা। চাহিদা মতো সার না পেয়েছে জেলার একাধিক এলাকায় ডিলারদের বিতরণ কেন্দ্রে বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। জেলার ৬টি উপজেলার চাষিরা দীর্ঘদিন ধরে চাহিদা মতো সার না পাওয়ার অভিযোগ করে আসছিলেন।

কৃষকদের সেসব অভিযোগ আমলে নিয়ে এবার জেলায় ‘সার কার্ড’ চালু করতে যাচ্ছে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এরই মধ্যে বিএডিসি ও বিসিআইসি সার ডিলারদের আওতাধীন জেলার বিভিন্ন এলাকায় ‘সার কার্ড’ তৈরি শুরু করেছেন কৃষকরা। কৃষি বিভাগের এই উদ্যোগে সারের অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিকল্পিত ব্যবহার যেমন রোধ করা যাবে, তেমনই সার বিতরণ ও বিপণনেও জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যাবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, ফসলের আবাদ অনুযায়ী সারের সঠিক ও যথাযথ ব্যবহার অনেক কৃষক জানেন না। ফলে জমিতে প্রয়োজনের তুলনায় কৃষকরা দ্বিগুণ সার ব্যবহার করেন। এ ছাড়া কৃষকরা ধারণানির্ভর ও সনাতন আবাদ পদ্ধতিতে চাষাবাদ করায় জমিতে অতিরিক্ত সার প্রয়োগ করে থাকে। একে কৃষকদের গুনতে হয় অতিরিক্ত খরচ।

এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ফসলের উৎপাদন খরচ হ্রাস, সারের অপচয় রোধ ও মাটির উর্বরতা ও গুণাগুণ ধরে রাখতে উদ্যোগ নিয়েছে জেলা কৃষি বিভাগ। এরই অংশ হিসেবে, জেলার সব বিএডিসি ও বিসিআইসি সার ডিলারদের নির্দেশনা দিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। নির্দেশনায় ডিলারদের আওতাধীন এলাকার কৃষকদের নির্ধারিত ‘সার কার্ড’ প্রস্তুত করতে বলা হয়েছে। সার কার্ডে প্রত্যেক কৃষকের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, ছবি ও আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ উল্লেখ থাকবে। ওই কার্ড দেখিয়ে কৃষক ডিলার ও সাব-ডিলার বিক্রয় কেন্দ্র থেকে নির্ধারিত হারে সার কিনতে পারবেন।

কৃষি বিভাগ বলছে, কার্ডের মাধ্যমে সার বিতরণ করা হলে একজন কৃষক তার কতটুকু আবাদি জমিতে কী পরিমাণ সার প্রয়োগ করছেন, সেই ব্যাপারে কৃষি বিভাগ একটি ধারণা পাবে। পাশাপাশি প্রান্তিক কৃষকদের জমির পরিমাণ অনুযায়ী সার ব্যবহারের তথ্য সংরক্ষণ করা যাবে। এ ছাড়া কৃষকরা যেন অতিরিক্ত সার ক্রয় করে তামাক বা অননুমোদিত ফসলের আবাদে ব্যবহার করতে না পারে, সেদিকেও লক্ষ্য রাখা সম্ভব হবে। এরই মধ্যে জেলার সদর উপজেলায় এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে। যা পর্যায়ক্রমে জেলার সব এলাকায় বাস্তবায়ন করবে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। ইউনিয়ন ও ব্লক পর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের তদারকির মাধ্যমে এরই মধ্যে কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

এদিকে জেলা কৃষি অধিদপ্তরের সুপারিশে বলা হয়েছে, প্রতি বিঘা জমিতে ধান, গম, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন ফসল চাষে একজন কৃষক কী পরিমাণ ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার ব্যবহার করতে পারবেন, সে সম্পর্কে নির্দেশনা কার্ডে সংযোজন করা হয়েছে। ফলে সহজেই কৃষক প্রয়োজন মতো সার সংগ্রহ করতে পারবেন। এ ছাড়া প্রতিবার সার উত্তোলনের সময় কার্ডে সারের পরিমাণ, ফসলের নাম ও বিতরণের তারিখ লিখে রাখা হবে। ফলে একজন কৃষক নির্ধারিত মাত্রার বেশি সার নিতে পারবেন না।

 

সার কার্ডের নমুনা / ছবি: জাগো নিউজ
 
সার কার্ডের নমুনা / ছবি: জাগো নিউজ

 

সদর উপজেলার বাদপুকুরিয়া গ্রামের কৃষক আরিফ হোসেন বলেন, আমাদের এই অঞ্চলে ধান, কলা, ড্রাগন ফলসহ নানা রকম আবাদ হয়। এমনকি মাছ চাষের জন্য পুকুরের পানি প্রস্তুত করতেও সার লাগে। আবাদ অনুযায়ী সারের চাহিদাও ওঠানামা করে। কিন্তু কৃষক তো চাহিদামতো সার পাচ্ছে না। কেউ বস্তা বস্তা সার পাচ্ছে, আবার কেউ ৫/১০ কেজি সার পায়। এটা তো কৃষকের জন্য ভোগান্তির।

রাধাকান্তপুর গ্রামের কৃষক আমিরুল ইসলাম বলেন, সার বেশি দিলে জমির উর্বরতা ও পরিবেশ নষ্ট হয় ঠিক। তবে কৃষকরা প্রয়োজনের বেশি সার নেয় না। আশা করছি, সার কার্ড চালু হলে সবার ভোগান্তি কমবে। আমরা যারা কৃষক, আমরা প্রয়োজন অনুযায়ী সার পেলেই খুশি। সার কার্ড চালু হলে যদি সহজে সার পাওয়া যায়, তাহলে ভালো। তবে এ ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্টদের নজরদারি বাড়ানো উচিত।

জেলার শৈলকুপার উপজেলার ত্রিবেনী ইউনিয়নের সার ডিলার জাফর মোল্লা বলেন, সার কার্ড চালুর মাধ্যমে কৃষকদের জমির পরিমাণ ও সার প্রয়োগের হার সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যাবে। এই তথ্য সংরক্ষণ করে কৃষক পর্যায়ে সারের পরিমিত ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজও সহজ হবে। কার্ডের মাধ্যমে সার বিতরণ বা বিক্রি করা গেলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাও বাড়বে। সরকারি নির্দেশনা মেনে প্রকৃত কৃষকদের কাছে সঠিক পরিমাণে সার পৌঁছে দিচ্ছি। সার কার্ড করতে কৃষকরাও বেশ আগ্রহী।

জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. কামরুজ্জামান বলেন, সার বিতরণে আমরা নানা সময় নানান রকম অভিযোগ পেয়ে থাকি। ওইসব অভিযোগ আমলে নিয়েই মূলত সার বিতরণ ও বিপণন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ‘সার কার্ড’ চালু করতে যাচ্ছি। এরই মধ্যে প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। ইউনিয়ন ও ব্লক পর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা এ নিয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, ফসলভিত্তিক সুষম সার প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমবে। সেই সঙ্গে জমির প্রকৃতিও রক্ষা পাবে। কৃষকরা অনেক সময় না বুঝে ফসলে অতিরিক্ত সার ব্যবহার করেন। এতে ফসলের মান ও জমির উর্বরতা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির মুখে পড়ে।