একদল বিদেশি নাগরিক রাস্তাঘাটে ঘুরছেন। প্রত্যেকের হাতে দুটি করে ফোন। একটি ফোনে লাইভ ভিডিও চলছে। অন্য ফোনে কিছু একটা লেখা রয়েছে। হঠাৎ দেখে মনে হতে পারে তাঁরা সাংবাদিক কিংবা গুগল স্ট্রিট ভিউ ম্যাপের কাজ করছেন। কিন্তু না, তাঁরা মাসের পর মাস এভাবে লাইভ ভিডিও করে চলেছেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলে তাঁদের লাইভ ভিডিও। কখনো কখনো মানুষের বাড়িঘরের মধ্যে ঢুকেও ভিডিও করেন। এতে বিভ্রান্তিতে পড়েন স্থানীয় মানুষ।
ঢাকার উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টর ও টেকপাড়া এলাকায় গেলে চীনা নাগরিকদের এমন কর্মকাণ্ড দেখা যাবে। এলাকাটিতে কতজন চীনা নাগরিক এমন ভিডিও ধারণ করেন, তার সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি।
তবে স্থানী মানুষেরা বলছেন, দেড় শতাধিক চীনা নাগরিক এভাবে অলিগলিতে ভিডিও ধারণ করছেন। তবে এই ভিডিও কোথায় প্রকাশিত হয়, ভিডিওতে কী বলা হচ্ছে, সেসব কোনো কিছুই জানেন না স্থানীয় লোকজন। এমনকি তাঁদের কার্যক্রম সম্পর্কে নজরদারিও করে না থানা-পুলিশ। এভাবে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত লাইভ ভিডিও করার বিষয়টি শুরুর দিকে কৌতূহল কাজ করলেও এখন বিরক্তি বাড়ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে।
উত্তরার টেকপাড়া এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা আকরাম হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘দু–এক দিনের ব্যাপার হলে হয়, কিন্তু এরা (চীনা নাগরিক) মাসের পর মাস এমন ভিডিও করে। আমরা ঘুম থেকে ওঠার আগে তারা ভিডিও করা শুরু করে। ঘুমাতে যাওয়ার সময়ও দেখি তারা ভিডিও করে। কিন্তু ভিডিওগুলো কী করে, আমরা জানি না।’
স্থানীয় লোকজন বলছেন, চীনা নাগরিকেরা উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় এমন লাইভ ভিডিও করেন। তবে সবচেয়ে বেশি করেন উত্তরার টেকপাড়া এলাকায়। উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের পাশেই একটি খাল রয়েছে। ওই খালের পাড়ে টেকপাড়ার অবস্থান।
ভিডিও যায় কোথায়

উত্তরায় চীনা নাগরিকদের এমন কর্মকাণ্ডে স্থানীয় মানুষের যেমন আগ্রহ রয়েছে, তেমনি এলাকাটিতে যাঁরা নতুন যান, তাঁরাও খানিকটা অবাক হন। জানতে চান, তাঁরা কেন ভিডিও করেন। তাঁদের মনে প্রশ্ন জাগে, এলাকাটিতে দেখার মতো আকর্ষণীয় কিছু না থাকলেও মানুষের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড কেন এভাবে ভিডিও করা হয়।
স্থানীয় লোকজন বলছেন, চীনা নাগরিকেরা উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় এমন লাইভ ভিডিও করেন। তবে সবচেয়ে বেশি করেন উত্তরার টেকপাড়া এলাকায়। উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের পাশেই একটি খাল রয়েছে। ওই খালের পাড়ে টেকপাড়ার অবস্থান। উত্তরার অন্যান্য এলাকার তুলনায় অনুন্নত ও নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাস এখানে। বসতি বেশি হওয়ায় এলাকাটি নোংরা। আর চীনা নাগরিকেরা ঠিক ওই এলাকাই বেছে নিয়েছেন ভিডিওর জন্য।
গত ২৭ অক্টোবর ও ৩ নভেম্বর উত্তরার এসব এলাকায় গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও ১৭ জন চীনা নাগরিকের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছে প্রথম আলো। উদ্দেশ্য ছিল তাঁরা কোথায় ভিডিও করেন, কেন করেন। তবে বেশির ভাগ চীনা নাগরিক কথা বলার আগ্রহ দেখাননি। আর যাঁরা সামান্য আগ্রহ দেখিয়েছেন, তাঁরা নাম আর দেশের নাম বলে চলে যান। কয়েকজন ইংরেজি জানেন না বলে এড়িয়ে গেছেন। গুগল ট্রান্সলেটরের সাহায্য নিয়ে কথা বলতে চাইলেও রাজি হননি।
চীনা নাগরিকেরা লাইভ ভিডিও ধারণ করার সময় কথা বলেন। চায়নিজ ভাষা ব্যবহার করেন বলে বুঝতে পারেন না স্থানীয় লোকজন। তবে দেখলে সহজেই বোঝা যায়, তারা যে বিষয়ে লাইভ ভিডিও করছেন, তার বর্ণনা করছেন।
গত ২৭ অক্টোবর বিকেলে উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টর এলাকায় ভিডিও ধারণকারীদের একজনের সঙ্গে কথা বলতে গেলে দেখা যায় রিতু আক্তার নামের এক বাংলাদেশি নারীকে। তিনি চীনা নাগরিকদের গাইড হিসেবে কাজ করেন বলে জানান। রিতু তাঁদের সঙ্গে কয়েক মাস ধরে কাজ করছেন। রিতুর মতো আরও কয়েকজন বাংলাদেশি নারী চীনা নাগরিকদের সহায়তা করেন বলে জানান তিনি।
চীনা নাগরিকেরা আসলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিডিও ধারণ করে কোথায় প্রকাশ করেন, জানতে চাইলে রিতু আক্তার চীনা নাগরিক ফ্যাংইয়োকে ডেকে আনেন। রিতু আক্তার তাঁর সঙ্গে চায়নিজ ভাষায় কথা বলে তাঁকে বোঝাতে সক্ষম হন যে এই প্রতিবেদক কথা বলতে চান। তখন ফ্যাংইয়োর মুঠোফোনে গুগল ট্রান্সলেটরের মাধ্যমে কথা হয়। ফ্যাংইয়ো প্রথম আলোকে জানান, পণ্যের প্রচারণার অংশ হিসেবে তারা উইচ্যাট নামের একটি চায়নিজ প্ল্যাটফর্মে এসব লাইভ ভিডিও করেন। তবে কেন উত্তরার এই এলাকা বেছে নিয়েছেন এবং কেন লাগাতার ভিডিও করেন—এসব জানতে চাইলে তিনি আর কথা বলতে রাজি হননি। একপর্যায়ে রিতুকেও ধমক দিয়ে ডেকে নিয়ে তিনি ঘটনাস্থল থেকে চলে যান।
রিতু আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, তিনি মূলত চীনা নাগরিকদের গাইড হিসেবে কাজ করেন, বিনিময়ে দিনে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা করে পান। চীনা নাগরিকেরা এই ভিডিও চীনভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম উইচ্যাট, ডুয়িনসহ (টিকটক) বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে পোস্ট করে আয় করেন। বাংলাদেশের নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাস করে—এমন এলাকা নিয়ে চীনা নাগরিকদের আগ্রহ বেশি, তাই তাঁরা এলাকাটি বেছে নিয়েছেন বলে জানান তিনি।

কীভাবে উপস্থাপন করা হয়
চীনা নাগরিকেরা লাইভ ভিডিও ধারণ করার সময় কথা বলেন। চায়নিজ ভাষা ব্যবহার করেন বলে বুঝতে পারেন না স্থানীয় লোকজন। তবে দেখলে সহজেই বোঝা যায়, তারা যে বিষয়ে লাইভ ভিডিও করছেন, তার বর্ণনা করছেন।
লাইভ ভিডিও করার সময় তাঁদের কয়েকজনের বর্ণনা গুগল ট্রান্সলেটর দিয়ে অনুবাদ করে চীনা ভাষা জানেন—এমন চারজনের বাংলাদেশির কাছে থেকে যাচাই করা হয়। বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, উত্তরায় থেকে ভিডিও করলেও লাইভে চীনা নাগরিকেরা বলছেন, ভারতের নয়াদিল্লি থেকে যুক্ত হয়েছেন। কেউ কেউ আবার বাংলাদেশের নাগরিকেরা দরিদ্র, নোংরা ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে বসবাস করেন, এমনটি বলছেন। অনেকে আবার বাংলাদেশি পুরুষেরা হাতে কিছু টাকা এলে অপব্যবহার করেন বলে উল্লেখ করেন। এ ছাড়া যেসব নারী চীনা নাগরিক লাইভ করেন, তাঁদের বলতে শোনা গেছে, তাঁদের ভারতে বিয়ে হওয়ার কারণে এখানে স্বামী-সংসার নিয়ে থাকেন।

১ নভেম্বর উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরে খালপাড়ে দাঁড়িয়ে টেকপাড়ার ভিডিও দেখাচ্ছিলেন মিয়ানমিয়ান নামের এক চীনা নারী। তিনি চীনের সিচুয়ান প্রদেশের মেয়ে বলে নিজেকে পরিচয় দেন। লাইভ ভিডিওতে তিনি বলছেন, এটা হলো নয়াদিল্লি। এদের ঘর খুবই নোংরা। টিনের ঘরের মধ্যে একটি ফ্যান পর্যন্ত নেই। জায়গাটি বেশ অনগ্রসর, নোংরা-অপরিচ্ছন্ন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ। এখানে তিনি ভারতীরা কীভাবে শৌচাগার ব্যবহার করেন, সেটি বর্ণনা করতে থাকেন।
টেকপাড়ায় ছোট্ট একটি সেতুর দুপাশে চায়ের দোকান রয়েছে। ওয়াং ওয়েই নামের আরেকজন চীনা নাগরিক এসব চায়ের দোকানে ভিডিও করছিলেন। লাইভ ভিডিওতে তাঁকে বলতে শোনা গেল, ‘এই যে তাঁরা চা পান করছেন, জানেন কি এটা কিসের চা? এটা হলো গোমূত্রের চা। তাঁরা গোমূত্রের চা খান। আরেকটি দোকানের সামনে গিয়ে লাইভে তিনি বলছেন, তাঁরা যে চা খাচ্ছেন, সেটি নদীর নোংরা পানি দিয়ে বানানো। এদের জীবনযাপন খুবই নোংরা।
অবশ্য কাউকে কাউকে বাংলাদেশ সম্পর্কে ইতিবাচক কথাও বলতে শোনা গেছে। লি ইয়াং নামের একজন উত্তরার বিভিন্ন ভবনের এসি দেখিয়ে বলছেন, ‘এরা এসিও ব্যবহার করে। বেশির ভাগ এসি চায়না। এখানে চায়না পণ্যের দাম সস্তা মনে করে সবাই চায়না পণ্য ব্যবহার করে। বলুন তো এটা কোন ব্র্যান্ডের এসি। যে বলতে পারবে, তাকে পুরস্কার দেওয়া হবে।’
গোপনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন

উত্তরার প্রতিটি অলিগলিতে মাসের পর মাস এভাবে ভিডিও করছেন চীনা নাগরিকেরা। একই দিনে একই এলাকায় কয়েকবার ভিডিও করেন। রাস্তাঘাট, দোকানপাটে শুধু নয়; আবাসিক এলাকায় ঢুকে ভিডিও করেন। স্থানীয় মানুষের অভিযোগ, এসব চীনা নাগরিক ভিডিও করতে করতে মাঝেমধ্যে মানুষের ঘরের মধ্যে ঢুকে যান।
স্থানীয় বাসিন্দা রোজিনা খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা মাঝেমধ্যে ঘরের মধ্যে ঢুকে ভিডিও শুরু করেন। বাসার মধ্যে সব সময় তো জামাকাপড় ঠিকঠাক থাকে না। হঠাৎ করে বাসায় ঢুকে ভিডিও করা শুরু করলে কেমন লাগে বলেন। আরেক বাসিন্দা পাপিয়া বেগম বলেন, ‘ভিডিও করতে করতে বাথরুমেও ঢুকে পড়ে অনেকে। তাদের কিছু বললেও বোঝে না। হাসে আর স্যরি বলে চলে যায়। সারা দিনই তাদের এমন টালবাহানা চলতে থাকে। কেউ কোনো ব্যবস্থাও নেয় না। তাদের কিছু বললে চলে যায় আবার আসে।’
তারা কেন ভিডিও করে, সেটা আসলে আমি জানি না। ভিডিওগুলো কোথায় পাবলিশ করে, সেটাও জানি না। তবে তারা যে ভিডিও করে, সেটা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানিয়েছি। এটা নিয়ে কাজ চলছে।মোহাম্মদ খালিদ মনসুর, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), উত্তরা পশ্চিম থানা
নজরদারি নেই
চীনা নাগরিকদের এমন কর্মকাণ্ডে স্থানীয় লোকজন আপত্তি জানালেও তাঁদের কাজ সম্পর্কে কোনো নজরদারি নেই পুলিশের। থানা-পুলিশের ভাষ্য, তারা উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় চীনা নাগরিকদের এমন ভিডিও করতে দেখে। তবে তাঁরা ভিডিও কেন করেন, জানে না। জানার চেষ্টা করলেও ভাষার জটিলতা এবং চীনা নাগরিকেরা বিরক্ত হন, তাই তারা বিষয়টি এড়িয়ে যায়।
উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ খালিদ মনসুর প্রথম আলোকে বলেন, ‘তারা কেন ভিডিও করে, সেটা আসলে আমি জানি না। ভিডিওগুলো কোথায় পাবলিশ করে, সেটাও জানি না। তবে তারা যে ভিডিও করে, সেটা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানিয়েছি। এটা নিয়ে কাজ চলছে।’