Image description

অর্থবছর বদল করে জুলাই-জুন থেকে এপ্রিল-মার্চ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এতে বদলে যাচ্ছে দেশের বাজেটের প্রচলিত ধরন। এ পরিবর্তনের অংশ হিসেবে ২০২৭-২৮ অর্থবছর হবে মাত্র ৯ মাসের। এতে শুধু বাজেটের মেয়াদই কমছে না, রাজস্ব আদায়, উন্নয়ন ব্যয় ও সরকারি হিসাবরক্ষণেও আনতে হচ্ছে বড় পরিবর্তন। অন্যদিকে অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির ধীরগতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব আদায়ের অনিশ্চয়তার মধ্যে এই রূপান্তর সরকারের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ফলে অর্থনৈতিক চাপ সামলে ট্রানজিশনাল বাজেট বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। অর্থ বিভাগ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, জুলাই-জুনের পরিবর্তে এপ্রিল-মার্চে অর্থবছর চালুর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ২০২৭-২৮ অর্থবছরকে অন্তর্বর্তী বা ট্রানজিশনাল অর্থবছর হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার। এ কারণে আগামী অর্থবছরের বাজেট হবে প্রচলিত ১২ মাসের পরিবর্তে মাত্র ৯ মাসের। জুলাই ২০২৭ থেকে মার্চ ২০২৮ পর্যন্ত সময়ের জন্য প্রণয়ন করা হবে এই বাজেট। এরপর ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে এপ্রিল-মার্চ মেয়াদের পূর্ণাঙ্গ অর্থবছর চালু হবে।

তবে এমন এক সময়ে বাজেটের ধরন বদলানো হচ্ছে যখন দেশের অর্থনীতিতে বহুমুখী চাপের মধ্যে। প্রবৃদ্ধির গতি কমছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিরতা আমদানি ব্যয় ও সরকারি ভর্তুকির চাপ বাড়াচ্ছে। এতে বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। এ অবস্থায় আগামী বাজেটে প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মধ্যে ভারসাম্য রাখা কঠিন হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক সংকটের কারণে সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো নানামুখী চাপের মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যেই বাজেট বাস্তবায়নে দক্ষতা বাড়াতে অর্থবছর পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আগামী অর্থবছর হবে ৯ মাসের। ফলে বাজেট প্রণয়ন থেকে শুরু করে বাস্তবায়নের কৌশলেও পরিবর্তন আনতে হচ্ছে।

সম্প্রতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো (এমটিএফ) সংক্রান্ত ওয়ার্কিং গ্রুপের সভা করেছে অর্থ বিভাগ। বৈঠকে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের জিডিপি প্রবৃদ্ধিসহ অন্যান্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো পর্যালোচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি আগামী অর্থবছরে ট্রানজিশনাল অর্থবছরের জন্য ৯ মাসের সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের হিসাব নিয়ে আলোচনা করা হয়।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতিতে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মুনাফা সংকুচিত হচ্ছে। ফলে নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যাচ্ছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।

আইনি ও রাজস্ব কাঠামো পর্যালোচনা

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অর্থবছরের সময়কাল পরিবর্তনসংক্রান্ত কমিটি ইতোমধ্যে প্রথম বৈঠক করেছে। পরে অর্থবছরের এই বড় পরিবর্তনের সঙ্গে সংগতি রেখে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান যেমন—বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণকেন্দ্র (বিপিএটিসি), জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমি (এনএপিডি), বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস প্রশাসন একাডেমি, সরকারি যানবাহন অধিদপ্তর এবং সরকারি কর্মচারী হাসপাতালসহ সংশ্লিষ্ট ৯টি দপ্তর ও সংস্থাকে তাদের নিজ নিজ দপ্তরের প্রয়োজনীয় তথ্য ও মতামত পাঠানোর নির্দেশনা দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। তাদের মতামতের ভিত্তিতে কর্মপন্থা নির্ধারণে আবারও বৈঠক করবে এ সংক্রান্ত কমিটি।

জানা গেছে, ইতোমধ্যে কমিটি আইনগত পরিবর্তনের বিষয়টি যাচাই করা, সংবিধানের ধারায় পরিবর্তন আনা, সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় নিজ নিজ অবস্থান থেকে আইনি বিষয় রয়েছে কি না তা যাচাই করা, রাজস্ব বা কর-সংক্রান্ত পরিবর্তনের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছে।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ আমার দেশকে বলেন, সরকার বাজেটের সময় পরিবর্তনের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা যথেষ্ট চিন্তাভাবনা করেই নিয়েছে বলে মনে করি। নতুন ধারার এই বাজেট বাস্তবায়নের জন্য উদ্যোগটি ইতিবাচক হবে। বছরের শুরুতেই অর্থবছরের কার্যক্রম শুরু হওয়ায় অবকাঠামো খাতের উন্নয়নকাজ আরো ত্বরান্বিত হবে। তবে বাজেটের প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে নতুন ব্যবস্থায় যাওয়ার ক্ষেত্রে সরকারকে অনেক বিষয়ে সতর্কতার সঙ্গে বিচার-বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ, এ পরিবর্তনের সঙ্গে রাজস্ব আদায়, উন্নয়ন ব্যয় ও প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন বিষয় জড়িত। ফলে সামগ্রিক প্রস্তুতি ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ছাড়া নতুন বাজেট কাঠামো কার্যকর করা কঠিন হবে।