সাবেক ২ অতি. আইজিপি ও আ.লীগ নেতার চক্রান্ত
১৬ গ্রুপে পরিকল্পনার তথ্য আদান-প্রদান
রাজধানীর মিরপুরে পোশাক শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে পুরো পোশাক খাতকে অস্থিতিশীল করার এক ভয়ংকর চক্রান্তের তথ্য বেরিয়ে এসেছে। গত ৩ নভেম্বর কালশী-পুরবী মোড়ে ‘শিহা ডিজাইন বাংলাদেশ লিমিটেড’ কারখানার সামনে ডিএমপি কনস্টেবল সালমানের ওপর নৃশংস হামলা ও সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার ১৯ আসামির তথ্যের ভিত্তিতে এই ষড়যন্ত্রের রূপরেখা বেরিয়ে আসে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) দাবি, এই তাণ্ডব কোনো সাধারণ শ্রমিক অসন্তোষ ছিল না; এর নেপথ্যে বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি ও আওয়ামী লীগ নেতা এস এম মান্নান কচি, সাবেক এমপি ইলিয়াস মোল্লা এবং সাবেক দুই অতিরিক্ত আইজিপিসহ একটি প্রভাবশালী চক্রের প্রত্যক্ষ ইন্ধন, অর্থায়ন ও অভ্যন্তরীণ আঁতাত ছিল। সিসিটিভি ফুটেজ এবং আসামিদের ব্যবহৃত ১৬টি অ্যানক্রিপ্টেড হোয়াটসঅ্যাপ-মেসেঞ্জার গ্রুপের অডিও বার্তা ফরেনসিক বিশ্লেষণ করে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ক্যাডার ভাড়া এনে এবং গুজবের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আক্রমণ ও নাশকতা চালিয়ে গার্মেন্ট শিল্পকে ধ্বংসের পাঁয়তারা করেছিল।
ডিবির তদন্তে দেখা যায়, কালশীর ‘শিহা ডিজাইন বাংলাদেশ লিমিটেড’ কারখানাটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম মান্নান কচির মালিকানায় ছিল। পরে তিনি কাগজে-কলমে সরে দাঁড়ালেও কারখানাটির নিয়ন্ত্রণ চলে যায় পাঁচ সদস্যের একটি সিন্ডিকেটের হাতে। এই সিন্ডিকেটে রয়েছেন সাবেক দুই অতিরিক্ত আইজিপি আতিকুল ইসলাম ও আবু হাসান মুহম্মদ তারিক। এছাড়া রয়েছেন আতিকুল ইসলামের শ্যালক নুরুল ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ও মুশতাক আহমেদ।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার ও ডিবির প্রধান শফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগ নেতা কচি, সাবেক এমপি ইলিয়াস মোল্লা, তার ভাগিনা আলিফ মোল্লা, সাবেক দুই অতিরিক্ত আইজিপি, মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের প্রচার সম্পাদক আক্তার রনি এবং ১০ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলরসহ বেশ কয়েকজন এই আন্দোলনে অর্থায়ন এবং নেপথ্যে ইন্ধন জুগিয়েছেন। শ্রমিকদের ঢাল বানিয়ে পুরো তৈরি পোশাক খাতকে অস্থিতিশীল করার সুপরিকল্পিত ছক ছিল এটি। ডিবির এই কর্মকর্তা জানান, গ্রেফতারদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই সহিংসতার নেপথ্যে থাকা শীর্ষ পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতাদের আইনের আওতায় আনতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আসামিদের মোবাইল ফোন জব্দ করে অন্তত ১৬টি গোপন হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জার গ্রুপের সন্ধান পেয়েছে। ‘চেতনা মুক্তিযুদ্ধ’, ‘শেখ হাসিনা রিজার্ভ ফোর্স’, ‘ঢাকা জেলা গেরিলা ৭১’, ‘হাসু আপার বাংলা’, ‘শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন’ ও ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শ গেরিলা’-র মতো নানা নামে খোলা এসব গ্রুপে ছদ্মবেশে নাশকতার পরিকল্পনা আদান-প্রদান করা হতো। আলামত নিশ্চিহ্ন করতে বেশকিছু বার্তা ডিলিট করা হলেও ডিবির ফরেনসিক টিম অডিও ও ছবি উদ্ধার করেছে।
তদন্তে জানা যায়, মিছিলে অংশ নেওয়া ও গাড়িতে আগুন দেওয়ার ছবি তুলে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠালে তা দেখে সাবেক এমপি ইলিয়াস মোল্লার ভাগিনা আলিফ মোল্লা ও জুয়েল মোল্লা অর্থ পাঠাতেন। ১ নভেম্বর পল্লবীতে পুলিশের গাড়িতে আগুন দিয়ে সেই ভিডিও ধারণ করে শীর্ষ নেতাদের কাছে পাঠান কক্সবাজারের যুবলীগ নেতা মুয়াজ্জেম শাহরিয়ার নেওয়াজ।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা আরও জানান, পোশাক খাতের স্বাভাবিক দাবি-দাওয়াকে পুঁজি করতে পঞ্চগড়, কক্সবাজার ও নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলা থেকে ক্যাডার এনে ঢাকায় জড়ো করা হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, পঞ্চগড় কলেজ ছাত্রলীগের নেতা নাহিদ হাসানও মাঠে সক্রিয় ছিলেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেতা আকতার রনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করেন যে, গাজীপুরে দুজন পোশাক শ্রমিকের লাশ পাওয়া গেছে। এই ভুয়া খবর ও গুজব দ্রুত ছড়িয়ে দিয়ে হাজার হাজার সাধারণ শ্রমিককে উত্তেজিত করে রাস্তায় নামানো হয়।
গত ৩ নভেম্বর কালশী মোড়ে ডিএমপি কনস্টেবল সালমানকে ঘিরে ধরে বেধড়ক ও নৃশংস মারধর করা হয়। বিভিন্ন স্থানের ৪-৫টি ভিন্ন অ্যাঙ্গেলের সিসিটিভি ফুটেজ নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করে এই হামলায় সরাসরি জড়িত ৮ জনকে গ্রেফতার করেছে ডিবি। তারা হলেন আশিক জুলহাস, আরাফাত ইসলাম জিসান, মো. রশিদ আলী, সোহেল রানা, মিলন বাবু, আনারুল ইসলাম, মো. রানা ও মনছুর আলী। এর আগে ১ নভেম্বর গ্রেফতার হওয়া আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ১১ নেতাকর্মীকে তিন দিনের রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
জানতে চাইলে ডিবির সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, তাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতা আলিফ মোল্লা ও জুয়েল মোল্লার সরাসরি যোগাযোগ ছিল। তাদের হোয়াটসঅ্যাপ ঘেঁটে অর্থ লেনদেনের নেটওয়ার্ক পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গ্রেফতারকৃত নাশকতাকারীরা মাঠপর্যায়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভয়েস মেসেজভিত্তিক অ্যাপস ব্যবহার করত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আসা অডিও বার্তায় দেখা যায়, নাশকতাকারীদের দূর থেকে টেলিফোনে নির্দেশ দিয়ে নির্দিষ্ট পয়েন্টে জড়ো করা হতো। একটি অডিও বার্তায় গ্রেফতার হওয়া নাহিদকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনারা সবাই ১২ নম্বর ইলিয়াস মোল্লার মার্কেটের সামনে আসেন... এখানে পুলিশ একদিকে চলে গেছে, আমাদের সুযোগ নিতে হবে... আজকের দিনটা করতে পারলে আমাদের নাম হবে।’
১২ গ্রুপের ব্যাংক হিসাব তলব
গ্রুপসংশ্লিষ্ট শতাধিক ব্যক্তির হিসাব জব্দ
শ্রমিক আন্দোলনে উসকানি দেওয়ার অভিযোগে ১২ গ্রুপের শতাধিক প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব তলব করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। একইসঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানে মালিকানায় থাকা শতাধিক ব্যক্তি এবং সাবেক একাধিক সংসদ-সদস্যের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। এসব ব্যক্তির কেউ বর্তমানে পলাতক আছেন, আবার কেউ কারাগারে। এদের বেশির ভাগের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে কর ফাঁকির অনুসন্ধান শুরু করছে সংস্থাটি। দায়িত্বশীল সূত্রে এ তথ্য গেছে।
যেসব প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চাওয়া হয়েছে, সেগুলো হলো-তুসুকা গ্রুপ, ওয়েল গ্রুপ, নিপা গ্রুপ, অ্যাক্সিস নিটওয়্যার্স লিমিটেড, স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ, গিভেন্সি গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, সেপাল গ্রুপ, এনভয় গ্রুপ, রেনেসাঁ গ্রুপ, হামিদ গ্রুপ ও ফেবিয়ান গ্রুপ। এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালকদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আয়কর গোয়েন্দার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনে উসকানি দিতে এসব গার্মেন্ট মালিকদের কালোটাকা ব্যবহারের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই অর্থ তাদের শিল্প প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত আয়কর নথিতে উল্লেখ আছে কিনা তা যাচাই করতে ব্যাংক হিসাব তলব করা হয়েছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আয়কর ফাঁকিও পাওয়া গেছে। তিনি আরও বলেন, গার্মেন্ট মালিকদের ছাড়াও রাষ্ট্রীয় একাধিক সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের বোনের জামাই আলিফ মোল্লার হিসাব জব্দ করা হয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং ছাড়াও তার বিরুদ্ধে ক্রিপ্টো কারেন্সি দিয়ে পোশাক খাতে অস্থিরতা সৃষ্টির তথ্য পাওয়া গেছে।
যেসব ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে, তারা হলেন-মন্ডল গ্রুপের আব্দুল আলিম মন্ডল, তারিন তাসলিমা, জুবায়ের মন্ডল, সুলতানা খাতুন, মাসুদা খাতুন, হাজী আব্দুল মান্নান মন্ডল, মোমেনা খাতুন, আব্দুল মমিন মন্ডল, মাহমুদুল হাসান, জান্নাতুল ফেরদৌস, আসাদুর রহমান সিকদার, গোলাম ফারুক তালুকদার, জাহিদ হাসান, সুরভী রহমান, শিরিন সুলতানা, তাসলিমা আক্তার, খন্দকার ফারুক কায়সার, নাহিদ খন্দকার, হাজী আব্দুল মজিদ মন্ডল।
গিভেন্সি গ্রুপের খতিব আবদুল জাহিদ মুকুল, মাসুমা খাতুন, মাহমুদা খাতুন, খতিব আব্দুল হাদী। স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের হোসনে আরা বেগম, ইঞ্জিনিয়ার আতিকুর রহমান, মাহমুদা বেগম, ইঞ্জিনিয়ার একেএম মোশাররফ হোসেন, তাসমিয়া রহমান, হাসনাত মোশাররফ, ফারিয়া রহমান, ফাহিম মোশাররফ, হাসিব মোশাররফ।
নিপা গ্রুপের সানজিদ চৌধুরী, খসরু চৌধুরী, এম. মনিরুল ইসলাম, টিপু সুলতান। ওয়েল গ্রুপের নাসরিন আক্তার, আব্দুস সালাম, সৈয়দ নূরুল ইসলাম, সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম, নজরুল ইসলাম, সাইদুল ইসলাম, তরিকুল ইসলাম, আসিফ হাসান, জান্নাতুল ইসলাম, আফরোজা বেগম, ডা. নাসরিন আফরোজ, আক্তারুন্নেসা, জিনাত ইসলাম। তুসুকা গ্রুপের ফিরোজ আলম, রাফায়েত উল্লাহ খান, শফিকুল ইসলাম, ইকবাল কবির, ফায়জুর রহমান, আরশাদ জামাল, একরামুল হক, আতিকুজ্জামান সাগর, আতিকুজ্জামান রিপন। এনভয় গ্রুপের আব্দুস সালাম মুর্শেদী, রাশিদা আহমেদ, শারমিন সালাম, তানভির আহমেদ, শেহরিন সালাম ঐশী।
এছাড়াও ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে-সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা ও বেক্সিমকো গ্রুপের মালিক সালমান এফ রহমান, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ও সেপাল গ্রুপের টিপু মুনশি, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও রেনেসা গ্রুপের শাহরিয়ার আলম, সাবেক জ্বালানিমন্ত্রী ও হামিদ গ্রুপের নসরুল হামিদ বিপু, সাবেক স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এসএম মান্নান কচি ও তার স্ত্রী ফরিদা মান্নান, মিরপুরের সাবেক সংসদ-সদস্য ইলিয়াস মোল্লা ও তার স্ত্রী ফরিদা ইলিয়াস এবং ভাগনে আলিফ মোল্লা, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী জাহাঙ্গীর আলম, জাহাঙ্গীর আলমের সহযোগী মাহবুবুর রহমান জুয়েলের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে।