বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা চালু করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনরর্থায়ন তহবিল থেকে ঋণ পেতে অপেক্ষা বাড়ছে উদ্যোক্তাদের। কঠিন শর্ত, ঋণগ্রহীতার সক্ষমতা যাচাই এবং ঋণ ফেরত পাওয়ার ঝুঁকি থাকায় ব্যাংকগুলো সতর্কভাবে আবেদন যাচাই করছে।
যদিও গতকাল বৃহস্পতিবার এই ঋণের গতি ফেরাতে প্রজ্ঞাপনে কিছু পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বন্ধ কারখানা চালুর এই কর্মসূচিতে ব্যাংকগুলো মোট এক হাজার ৪৯০ কোটি টাকার ঋণ আবেদন জমা দিয়েছে।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই কর্মসূচিতে ৮০০ কোটি টাকার ঋণ আবেদন জমা পড়েছিল। তখন আটটি প্রতিষ্ঠানকে ১১০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়। পরবর্তী ১৮ দিনে বিতরণ বেড়ে ৫৬০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ এই সময়ে আরো ৪৫০ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। তবে আবেদন করা অর্থের বড় অংশ এখনো উদ্যোক্তাদের হাতে পৌঁছেনি।
বিজিএমইএ জানিয়েছে, এই কর্মসূচির শর্ত পূরণ করেছে বলে সংগঠনটির প্রত্যয়ন পাওয়া প্রায় ২০০টি পোশাক কারখানা এখনো ঋণ পায়নি। বিজিএমইএর সহসভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের জানা মতে, এই কর্মসূচির আওতায় এখন পর্যন্ত একটি পোশাক কারখানাও ঋণের অর্থ পায়নি।’ এ ছাড়া চারটি কারখানার মালিক জানিয়েছেন, তাঁরাও ঋণের অর্থ ছাড়ের অপেক্ষায় রয়েছেন।
ঋণের ঝুঁকি নিতে চায় না ব্যাংক : বাংলাদেশ ব্যাংক গত জুনে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প ও সেবাপ্রতিষ্ঠান চালু করতে ২০ হাজার কোটি টাকার অর্থায়ন কর্মসূচি ঘোষণা করে। এই কর্মসূচিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তুলনামূলক কম সুদে তহবিল সরবরাহ করলেও ঋণ ফেরত না পাওয়ার ঝুঁকি নিতে হচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে। ঋণগ্রহীতার আর্থিক অবস্থা, ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা এবং প্রতিষ্ঠানটি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না, তা যাচাই করার দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের।
এই ব্যবস্থায় উদ্যোক্তারা প্রথমে বাণিজ্যিক ব্যাংকে ঋণের আবেদন করেন। ব্যাংক আবেদন যাচাই করে অনুমোদন দিলে তা পুনরর্থায়নের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠায়। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তহবিল বরাদ্দ থাকলেও ব্যাংকের যাচাই-বাছাই ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত উদ্যোক্তারা অর্থ পান না। ঋণের পুরো ঝুঁকি বহন করতে হওয়ায় ব্যাংকগুলো সতর্কভাবে আবেদন যাচাই করছে।
এই কর্মসূচি ঘোষণার সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেছিলেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। বন্ধ কারখানা চালু করে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোই এ কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য।
৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিলেও ধীরগতি : বন্ধ কারখানা চালুর তহবিলের বাইরে বাংলাদেশ ব্যাংকের আরো ১৪টি পুনরর্থায়ন কর্মসূচি রয়েছে। সব মিলিয়ে ১৫টি কর্মসূচিতে বরাদ্দ ৬০ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এসব কর্মসূচির আওতায় ১৪ হাজার ৫১৯ কোটি টাকার ঋণ আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ১১ হাজার ৯৫৯ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে; আরো দুই হাজার ৫৬০ কোটি টাকার ঋণ আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
মোট বরাদ্দের মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা পুনরর্থায়নের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়ার কথা রয়েছে।
তবে কর্মসূচিভেদে ঋণ বিতরণের চিত্রে বড় পার্থক্য রয়েছে। কোনো কোনো খাতে বরাদ্দের পুরো অর্থ বিতরণ করা হয়েছে, আবার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে অগ্রগতি খুবই কম।
সবচেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট পুনরর্থায়ন কর্মসূচিতে। এই কর্মসূচিতে পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ছয় হাজার ৯১৭ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে, যা বরাদ্দের চেয়ে ৩৮.৩৪ শতাংশ বেশি।
কুটির ও মাইক্রো উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ কর্মসূচিতে পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে বিতরণ করা হয়েছে দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই কর্মসূচির অর্ধেক অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। সৃজনশীল অর্থনীতি কর্মসূচির আওতায় বরাদ্দের পুরো ৫০০ কোটি টাকাই বিতরণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পের (সিএমএসএমই) চলতি মূলধন পুনরর্থায়ন কর্মসূচিতে পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে বিতরণ করা হয়েছে ৯০৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। বিদেশে কর্মসংস্থান অর্থায়ন কর্মসূচিতে এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে বিতরণ করা হয়েছে ২০০ কোটি টাকা।
কৃষি ও গ্রামীণ অর্থায়নে অগ্রগতি কম : কৃষি ও গ্রামীণ খাদ্য নিরাপত্তা পুনরর্থায়ন কর্মসূচিতে ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও ঋণ বিতরণ করা হয়েছে মাত্র ২৯২ কোটি ৯০ লাখ টাকা। বরাদ্দের হিসাবে বিতরণের পরিমাণ ২.৯৩ শতাংশ।
উত্তরবঙ্গে কৃষিভিত্তিক বিশেষ অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে তোলার কর্মসূচিতে তিন হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে বিতরণ করা হয়েছে ৪৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। স্টার্টআপ খাতে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে বিতরণ করা হয়েছে ৩২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। এই খাতে আরো পাঁচ কোটি টাকার ঋণ আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান তৈরির জন্য এক হাজার কোটি টাকার কর্মসূচি থাকলেও ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত কোনো ঋণ বিতরণ করা হয়নি। তবে পুরো বরাদ্দের অর্থই বিতরণের প্রক্রিয়ায় ছিল।
পরিবেশবান্ধব কারখানা ভবন ও সবুজ শিল্পের জন্য এক হাজার কোটি টাকার কর্মসূচিতে ৫২৭ কোটি ৪৭ লাখ টাকার ঋণ আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা রপ্তানি খাতের দুই হাজার কোটি টাকার কর্মসূচিতে প্রক্রিয়াধীন ঋণ আবেদনের পরিমাণ ৯৮ কোটি টাকা। এই দুটি কর্মসূচিতে এখনো কোনো ঋণ বিতরণ করা হয়নি।
এ ছাড়া রপ্তানি বহুমুখীকরণ, গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল করা এবং হিমায়িত চিংড়ি ও অন্যান্য মাছ রপ্তানির জন্য নির্ধারিত তিনটি কর্মসূচিতে এখন পর্যন্ত কোনো ঋণ বিতরণ করা হয়নি। এসব কর্মসূচিতে কোনো ঋণ আবেদনও প্রক্রিয়াধীন নেই। তিন কর্মসূচিতে মোট বরাদ্দ ছয় হাজার কোটি টাকা।
অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর আশা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের : বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান কালের কণ্ঠকে বলেন, অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং আগের ঋণ পুনঃ তফসিলের সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা যেন নতুন করে বাধার মুখে না পড়েন, সেই চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে শিগগিরই অর্থনীতিতে গতি ফিরবে।