Image description

রক্তের বাণিজ্যিকীকরণ, অসাধু চক্রের সিন্ডিকেট ও জনমনে আস্থার সংকটের কারণে রক্তদানে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন স্বেচ্ছায় রক্তদাতারা। ফলে জরুরি চিকিৎসা ও জীবনরক্ষাকারী রক্তের বিশাল চাহিদা মেটাতে এখন মূলত রোগীর স্বজনদের বিকল্প বা ‘রিপ্লেসমেন্ট’ দানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) আওতাধীন ন্যাশনাল সেফ ব্লাড ট্রান্সফিউশন প্রোগ্রামের (এনএসবিটিপি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে সংগৃহীত মোট রক্তের মাত্র ৩০ শতাংশ স্বেচ্ছায় ও বিনামূল্যে রক্তদানকারী দাতাদের কাছ থেকে আসে। বাকি ৭০ শতাংশই রোগীর স্বজন বা পরিচিতদের বিকল্প রক্তদানের মাধ্যমে সংগ্রহ করতে হয়।

দেশে প্রতি বছর আনুমানিক ৮ লাখ থেকে ১০ লাখ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে সন্তান প্রসবের সময় প্রসূতি নারী, থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত রোগী এবং সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের জন্য রক্তের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। অথচ নিরাপদ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য যতটুকু স্বেচ্ছায় রক্তদান প্রয়োজন, তার মাত্রা এখনো অনেক কম।

শৈশব থেকেই থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত ফারহান কবিরের (ছদ্মনাম) জন্য রক্তদাতা পাওয়া এখন অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১১ মাস বয়স থেকেই তাকে নিয়মিত রক্ত নিতে হয়। ছোটবেলায় তিন মাস পর পর লাগলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এখন প্রতি ১৫ দিন পর পর তাকে রক্ত নিতে হয়।

কলেজজীবন পর্যন্ত রক্তদাতা পেতে সমস্যা না হলেও গত তিন বছর ধরে রক্ত পেতে তার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। তার মতে, বিভিন্ন বেসরকারি ব্লাড ব্যাংক ও সংগঠন তৈরি হওয়ায় তাদের বাইরে সাধারণ মানুষ আর সহজে রক্ত দিতে চায় না।

 

ফারহান অভিযোগ করেন, কিছু সংগঠন রক্তদাতাদের নানা রকম উপহার দেয় ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের প্রশংসা করে পোস্ট দেয়। এর ফলে স্বেচ্ছায় রক্তদাতারা ওইসব নির্দিষ্ট সংগঠনের বাইরে গিয়ে আর রক্ত দিতে চান না। এ ছাড়া রক্ত নিয়ে ব্যবসার অভিযোগও মানুষের ভরসা কমিয়ে দিয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কবীর হোসেন ১৮ বছর বয়স থেকেই নিয়মিত রক্ত দিতেন। উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বিধ্বস্তের মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর আহতদের রক্ত দিতে ছুটে গিয়েছিলেন তিনি। ওই দুর্ঘটনায় ৩৬ জন মারা যান, আহত হন শতাধিক মানুষ।

 

পুরো দেশ যখন আহতদের সাহায্যে এগিয়ে আসে, তখন কিছুদিন পর বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রকাশ পায়—সেই রক্তের একটা বড় অংশ আহতদের কাছে পৌঁছায়নি। বরং দালাল ও কিছু বেসরকারি ব্লাড ব্যাংকের সিন্ডিকেট তা গোপনে বিক্রি করে দিয়েছে।

এই খবর কবীরকে ভীষণ হতাশ করে। তিনি স্বেচ্ছায় রক্ত দেওয়া বন্ধ করে দেন। টাইমসকে তিনি বলেন, ‘জীবন বাঁচাতে দেওয়া রক্ত যদি বেচাকেনা হয়, তবে রক্তদান অর্থহীন।’ পরিচিত কারও দরকার হলে তিনি এখনো রক্ত দেন, কিন্তু কোনো স্বেচ্ছাসেবী প্রচারাভিযানে আর যান না।

বাংলাদেশ জার্নাল অব ট্রান্সফিউশন মেডিসিনের (বিজেটিএম) সহকারী সম্পাদক ডা. তামান্না আফরোজ টাইমসকে বলেন, মানুষের পুরনো কিছু ভীতি ও ধারণাই স্বেচ্ছায় রক্তদানের বড় বাধা। অতীতে অনেকেই টাকার বিনিময়ে বা নেশাগ্রস্তদের থেকে রক্ত নেওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে অপরিচিতদের থেকে রক্ত নিতে ভয় পান।

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ব্লাড সেন্টারের সাবেক কর্মকর্তা জহুরুল রহমান বলেন, দেশে এখনো স্বেচ্ছায় রক্তদানের প্রকৃত সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। এটি তৈরি না হলে নিরাপদ রক্তের চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশের ২০৬টি সরকারি ও ১৭২টি বেসরকারি সেন্টারে নিয়মিত রক্ত সঞ্চালন হয়। গত চার বছরে প্রায় ৩৩ লাখ ব্যাগ রক্ত নেওয়া হলেও তার বেশিরভাগই ছিল স্বজন বা পরিচিতদের দেওয়া বিকল্প রক্ত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বারবার বলছে, শুধু স্বেচ্ছায় ও বিনামূল্যে রক্তদানের ওপর ভরসা করলেই রক্তের মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। বিশ্বের প্রায় ৬২টি দেশ সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় রক্তদানের মাধ্যমে তাদের চাহিদা মেটায়। উন্নত বিশ্বে প্রতি হাজার মানুষের মধ্যে ৪৫ জন রক্ত দিলেও বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই সংখ্যা চারেরও কম।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি মুরাদ সুলতান টাইমসকে জানান, বাংলাদেশ রক্ত ব্যবস্থাপনায় কিছুটা এগিয়েছে। তবে সচেতনতা আরও বাড়াতে হবে।

কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন, বাঁধন ও সন্ধানীসহ বিভিন্ন সংস্থা স্বেচ্ছায় রক্তদানে কাজ করছে। ২০০০ সাল থেকে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন ১৭ লাখের বেশি ব্যাগ রক্ত সরবরাহ করেছে। তাদের নিবন্ধিত রক্তদাতা রয়েছে পাঁচ লাখেরও বেশি।

কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের প্রধান সমন্বয়ক নাহার আল বোখারী টাইমসকে বলেন, দেশের মাত্র ২ শতাংশ তরুণ যদি বছরে একবারও রক্ত দেন, তবে বাংলাদেশ নিরাপদ রক্ত সরবরাহে বিশ্বের অন্যতম সেরা দেশ হতে পারে। তখন রক্তের অভাবে কোনো রোগীকে আর মৃত্যুবরণ করতে হবে না।

 

 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস রক্তদাতাদের একটি সঠিক তালিকা বা ডেটাবেজ তৈরির ওপর জোর দেন। অন্যদিকে হসপিটাল সার্ভিসেস ম্যানেজমেন্টের লাইন ডিরেক্টর মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন টিটো তরুণদের এই মহৎ কাজে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।