Image description

গাজীপুরের টঙ্গী এলাকার ক্ষুদ্র ঝুট ব্যবসায়ী রবিউল মিয়া। সম্প্রতি সিটি ব্যাংক থেকে ৫ লাখ টাকা ঋণ চেয়ে ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্স ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু নিয়মের বেড়াজালে ঋণ পাননি। তাকে জানানো হয়— তিনজন গ্যারান্টারের স্বাক্ষর, বিআইএন (বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার)সহ নানা শর্ত পূরণ করে আবেদন করতে হবে। কিন্তু এগুলো দেওয়া সম্ভব হয়নি। পদে পদে ভোগান্তির শিকার এ ব্যবসায়ী পরে বাধ্য হয়ে এক দালালের সহযোগিতা নিয়েছিলেন। এতে আগের দেওয়া কাগজপত্রেই নির্বিঘ্নে ছাড় হয়ে যায় ঋণ। তবে বকশিশের নামে ঘুষ দিতে হয়েছিল ওই দালালকে।

কথাগুলো অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে আগামীর সময়ের কাছে এভাবেই তুলে ধরেছিলেন রবিউল মিয়া। তার ভাষ্য, ‘আমাদের মতো ছোট ব্যবসায়ীর ক্ষেত্রেই যত আইনকানুন ও নানা শর্ত। আর বড়দের জন্য সাত খুন মাফ। ব্যাংক ফোকলা করে ফেলতেছে, এরপরও একের পর এক ছাড় দিয়ে তাদের দেওয়া হচ্ছে মোটা অঙ্কের ঋণ।’

শুধু রবিউল নন, তার মতো দেশের প্রায় সব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাই ব্যাংকঋণ পেতে নীতিমালার বেড়াজালে আটকে যাচ্ছেন। আর যারা ঋণ পান, তাদের অধিকাংশই নির্ধারিত সময়ে কিস্তি পরিশোধ করেন। এর মধ্যে কেউ যদি কোনো যৌক্তিক কারণে কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হন, তাদের ওপর চলে রীতিমতো ‘স্টিমরোলার’। সব ধরনের বিধিবিধান তাদের ওপর প্রয়োগ করা হয়। এমনকি মাত্র ৪০০ টাকা খেলাপির জন্য কোমরে দড়ি বেঁধে জেলে পাঠানোরও নজির আছে। অথচ বড় বড় ঋণখেলাপির ক্ষেত্রে এসব আইনকানুন পুরোপুরি অনুপস্থিত। তাদের বিরুদ্ধে ঋণ আদায়ে ন্যূনতম ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো নানা অজুহাত দেখিয়ে নতুন করে আরও ঋণ দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে— এস আলম ও বেক্সিমকো গ্রুপ।

বহুল আলোচিত এস আলম গ্রুপ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়ে শীর্ষ খেলাপির তালিকায় রয়েছে। আর এই গ্রুপটির কারণেই পাঁচটি ইসলামি ব্যাংক অতি দুর্বল হয়ে যায়। গ্রাহকের টাকা দিতে না পারায় সেগুলোকে একীভূত করে নিয়ন্ত্রণ নেয় সরকার। অথচ গত আগস্টে এ গ্রুপের প্রতিষ্ঠান এসএস পাওয়ার-১ লিমিটেডের জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলার বিশেষ অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শতভাগ নগদ টাকা জমার বিপরীতে রাষ্ট্রমালিকানাধীন রূপালী ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটির এলসি খুলতে পারবে। যদিও ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী কোনো খেলাপি প্রতিষ্ঠান ঋণ পেতে পারে না। একইভাবে ব্যাংক থেকে প্রায় ৮০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়েছে বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। গ্রুপটির বেক্সিমকো এলপিজি ইউনিট-১ ও শাইনপুকুর সিরামিকস খেলাপি হওয়ার পরও বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠান দুটিকে নতুন করে ঋণের সুযোগ দিয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘ক্ষুদ্র ও ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে আসছি। কিন্তু তাদের লজিস্টিক সাপোর্ট কম থাকায় ঋণ পেতে অসুবিধা হয়। আবার ব্যাংকের ঋণ ফেরতে সিএমএসএমই খাতের উদ্যোক্তারাই এগিয়ে। অন্যদিকে দেশের বৃহৎ স্বার্থে বড়দের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে সুবিধা দেওয়া হয়। তারা ভালো করলে ঋণ ফেরত আসবে। বন্ধ হলে ঋণ ফেরত বাধাগ্রস্ত হবে।’

ঋণসংক্রান্ত বিভিন্ন নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পাঁচ হাজার শিল্প গ্রাহকের কাছে রয়েছে প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকার ঋণ, যা মোট ঋণের ৩৩ শতাংশ। বড়দের খেলাপিমুক্ত রাখতে ঋণ পুনঃতফসিলের আড়ালে নামমাত্র এককালীন (ডাউনপেমেন্ট) পরিশোধে মোটা অঙ্কের বকেয়া ঋণ ১৫ বছর পর্যন্ত নিয়মিত দেখানো হচ্ছে। একই সঙ্গে এক্সিট পলিসি ও হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপিদের জন্য রয়েছে বিশেষ ছাড়। কিন্তু ছোট গ্রাহকদের ঋণ দিতে ভূরি ভূরি শর্ত জুড়ে দিয়েছে এসব ব্যাংক, যা পূরণ করতে ছোট গ্রাহকরা রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। এতে ঋণবঞ্চিত হচ্ছেন ছোট গ্রাহকরা। শুধু বিসিকের অধীন কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের

(সিএমএসএমই) তালিকাভুক্ত ১ কোটি ১৭ লাখ প্রতিষ্ঠান থাকলেও তােদর ঋণ স্থিতি ২ লাখ ৯৮ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১৬ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে কৃষক ও ছোট ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট মামলা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ১২৩টি। সেখানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ৩৯৩ কোটি টাকা। অথচ ব্যাংক খাতে ১১টি শিল্প গ্রুপের কাছে ঋণ পুঞ্জীভূত হয়েছে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা। আবার গত আগস্টে এসএমই ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১ কোটি ১৭ লাখ ক্ষুদ্র, অতিক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তার মধ্যে প্রায় ৭৭ শতাংশ আনুষ্ঠানিক ঋণের বাইরে রয়েছেন। সরাসরি ব্যাংকঋণ পান মাত্র ৯ শতাংশ

উদ্যোক্তা। ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণ পাচ্ছেন আরও ১৪ শতাংশ।

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ওপর নির্যাতনের কয়েকটি ঘটনা

পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার ভাড়ইমারি গ্রামের নারী উদ্যোক্তা রহিমা বেগম ২০১৬ সালে ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে সুদসহ ৪৫ হাজার পরিশোধ করেছিলেন। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে মাত্র ৯০০ টাকা বকেয়া থাকায় ২০২১ সালে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। শেষ পর্যন্ত তাকে খেলাপি মামলায় জেল খাটতে হয়। একই এলাকার কৃষক আতিয়ার রহমান আঞ্চলিক ভাষায় বলছিলেন, ‘আমাদের কি মানসম্মান নাই? বকেয়া ৪০০ টাহার জন্য হামার েকামরে দড়ি। জেল খাটা লাগল। হগলে মনে করল, কত টেহা জিনি মারে খাইছি। গেরামে মুখ দেহাবের পারিনে।’ একই গ্রামের মজনু প্রামাণিক বললেন, ‘৪০ হাজারে ১৫ হাজার সুদ দিলেম। তারপরেও জেলে গেলেম। ইডা কুন নিয়ম, বুঝলেম না। আমাগের এই হয়রানির বিচার চাই।’