ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এ বছর সবচেয়ে বেশি ফেল করেছে মানবিক বিভাগের ছাত্ররা। সারা দেশে এ বিভাগে ছেলেদের পাসের হার মাত্র ৩৫ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে মানবিকে ছেলেদের পাসের হার সবচেয়ে কম রাজশাহী বোর্ডে, ২৮ দশমিক ১১ শতাংশ।
এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় চলতি বছর মোট ১০ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্র ছিল ৪ লাখ ৮৩ হাজার ১৯১। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ২ লাখ ২৭ হাজার ৭৮৯ জন। সে হিসাবে ছেলেদের পাসের হার ৪৭ দশমিক ১৪ শতাংশ। অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি ছাত্রই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। অন্যদিকে এ বছর ছাত্রীদের পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ। ২০২৫ সালেও ছেলেদের পাসের হার ছিল ৫৪ দশমিক ৬০ শতাংশ, যেখানে মেয়েদের ছিল ৬২ দশমিক ৯৭ শতাংশ।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েক বছর ধরেই কিশোরদের মধ্যে পড়ালেখার প্রতি মনোযোগ ও আগ্রহের ঘাটতি প্রকট হচ্ছে। পাশাপাশি ঝরে পড়া, মাদকাসক্তি ও কিশোর গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়ার মতো ঘটনাও তাদের শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এ বছর সবচেয়ে বেশি ফেল করেছে মানবিক বিভাগের ছাত্ররা। সারা দেশে এ বিভাগে ছেলেদের পাসের হার মাত্র ৩৫ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে মানবিকে ছেলেদের পাসের হার সবচেয়ে কম রাজশাহী বোর্ডে, ২৮ দশমিক ১১ শতাংশ। একই বোর্ডে মানবিকে মেয়েদের পাসের হার ৪৬ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। এছাড়া যশোর বোর্ডে ছেলেদের পাসের হার ৩০ দশমিক ৬৫ শতাংশ, বরিশালে ৩০ দশমিক ৯৫, চট্টগ্রামে ৩২ দশমিক ৮৯, দিনাজপুরে ৩৩ দশমিক ১৯, কুমিল্লায় ৩৩ দশমিক ৬৭, ময়মনসিংহে ৩৯ দশমিক ৩৭ ও সিলেটে ৪১ দশমিক ৯২ শতাংশ। মানবিকে ছেলেদের পাসের হার সবচেয়ে বেশি ঢাকা বোর্ডে, ৪৩ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ মোজাহেদুল ইসলাম চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে দেশে ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা পড়াশোনায় বেশি মনোযোগী। নারী শিক্ষায় সরকারের বিশেষ গুরুত্বের পাশাপাশি পরিবার থেকেও মেয়েদের কলেজ পর্যায় পর্যন্ত তুলনামূলক বেশি তদারকিতে রাখা হয়। এসব কারণে ছেলে শিক্ষার্থীদের তুলনায় মেয়েরা ভালো ফল করছে।’
ছেলে শিক্ষার্থীদের ফল নিম্নমুখী হওয়ার বিষয়ে তিনি আরো বলেন, ‘কভিডকালে শ্রেণীকক্ষে উপস্থিতির বিষয়ে সারা দেশের প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শিথিলতা ছিল। ওই সময় শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোচিংনির্ভরতা বাড়তে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও আন্দোলনমুখর শিক্ষাঙ্গনের কারণে পড়াশোনায় অমনোযোগিতার প্রবণতাও তৈরি হয়, যার প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি পড়েছে ছাত্রদের ওপর। সব মিলিয়ে এইচএসসি পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ওপর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব কমে যাওয়ায় অনেক ছাত্রের মধ্যে আড্ডা ও কোচিংনির্ভর পড়াশোনার মাধ্যমে সহজে পাস করার মানসিকতা তৈরি হয়েছে। এছাড়া কৈশোরের বিভিন্ন নেতিবাচক প্রভাব ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের কম প্রভাবিত করায় তারাও তুলনামূলক ভালো ফল করছে।’
ব্যবসায় শিক্ষা ও বিজ্ঞান বিভাগের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিজ্ঞানের ছাত্ররা তুলনামূলকভাবে ভালো ফল করেছে। এ বছর ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ছেলেদের সামগ্রিক পাসের হার ৪৫ দশমিক ৯৪, আর বিজ্ঞান বিভাগে ৭৩ দশমিক ১২ শতাংশ। বোর্ডভিত্তিক হিসাবে বিজ্ঞানে ছেলেদের পাসের হার সবচেয়ে বেশি ঢাকা বোর্ডে, ৮০ দশমিক ৯৭ শতাংশ। এছাড়া চট্টগ্রাম বোর্ডে ৭৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৭৩ দশমিক ৩৯, সিলেটে ৭০ দশমিক ৬৪, যশোরে ৬৮ দশমিক ২৬, দিনাজপুরে ৬৫ দশমিক শূন্য ৯, রাজশাহীতে ৬৪ দশমিক ২৫ ও কুমিল্লায় ৬১ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ ছাত্র পাস করেছে। বিজ্ঞান বিভাগে ছেলেদের পাসের হার সবচেয়ে কম বরিশাল বোর্ডে, ৫২ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
চলতি বছর মাদারীপুরের একটি বেসরকারি কলেজ থেকে মানবিকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে অকৃতকার্য হয়েছে জহিরুল ইসলাম। তার মা রেবেকা আকতার বলেন, ‘কলেজে ভর্তির পর থেকেই ছেলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। তার ব্যস্ততার বড় অংশই ছিল রাজনীতি ও মুঠোফোনকেন্দ্রিক। অনেক চেষ্টা করেও তাকে পড়ালেখায় মনোযোগী করা যায়নি। বাড়িতে শিক্ষক রাখা হলেও সে প্রায়ই থাকত না। এখন তাকে দেশের বাইরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ ও মুঠোফোন ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ থাকা উচিত।’
করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা, অনলাইন শিক্ষার সঙ্গে নতুনভাবে পরিচিত হওয়া এবং পরবর্তী সময়ে সংক্ষিপ্ত সিলেবাস ও অটো পাসের সংস্কৃতি শিক্ষার্থীদের বইবিমুখ করে তুলেছে বলে মনে করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক ড. আকতার বানু। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সৃজনশীল পদ্ধতিতে অতিরিক্ত নম্বর দেয়া বা ওভারমার্কিংয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে না পড়েও ভালো ফল করার একধরনের প্রবণতা তৈরি হয়েছিল। এতে তাদের অধ্যবসায় ও গভীরভাবে পড়ার আগ্রহ কমেছে। পাশাপাশি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও আন্দোলনও শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্বে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে বিভিন্ন নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে ছেলে শিক্ষার্থীদের জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ক্লাস না হওয়া, কোচিং সেন্টারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মের কারণে তুলনামূলক কম দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ পাওয়ায় শিক্ষার মানও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।’
পরিস্থিতির পরিবর্তনে কঠোর তদারকির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত শ্রেণীকক্ষে উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং কোচিংনির্ভরতা কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি জানিয়ে অধ্যাপক ড. আকতার বানু আরো বলেন, ‘সমাজে কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং মাদকের বিস্তার রোধে উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পুলিশের জনবল ও টহল বাড়িয়ে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি। মাদকের সহজলভ্যতা শুধু তরুণ প্রজন্ম বা কিশোরদেরই নয়, সমাজের সব স্তরের মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাই এর সরবরাহ বন্ধে এখনই কঠোর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।’
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, ‘ছাত্রদের ফল কয়েক বছর ধরেই নিম্নমুখী। এর পেছনে পড়ালেখায় অমনোযোগিতা, অভিভাবক ও শিক্ষকদের নজরদারির ঘাটতিসহ বিভিন্ন কারণ রয়েছে। বর্তমান সরকার শিক্ষার সামগ্রিক মানোন্নয়নে কাজ করছে। শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়ানো, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা ও সহশিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং এর মাধ্যমে মাদকাসক্তি প্রতিরোধসহ নানা উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষা খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আমরা আশা করছি।’