Image description

চাল ও ভোজ্যতেলের বাজারে উৎপাদন বা আমদানি পর্যায় থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত দামের ব্যবধান ক্রমেই ভোক্তাদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ধান উৎপাদন, চাল প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও বিপণনের ব্যয় যেমন দামের ওপর প্রভাব ফেলে, তেমনি ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারদর, আমদানি ব্যয়, শুল্ক ও সরবরাহ ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব ব্যয়ের সাথে খুচরা বাজারের দামের সামঞ্জস্য কতটা, আর সরবরাহ শৃঙ্খলের কোন পর্যায়ে কতটা মুনাফা যুক্ত হচ্ছে, তার স্বচ্ছ হিসাব সাধারণ ভোক্তার সামনে নেই। এমন পরিস্থিতিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই দুই পণ্যের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছে সীমিত আয়ের মানুষ; অন্য দিকে উৎপাদক, আমদানিকারক, মিল মালিক, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতার মধ্যে বাড়তি দামের সুবিধা কীভাবে বণ্টিত হচ্ছে, তা নিয়ে তৈরি হচ্ছে প্রশ্ন। তারা বলছেন, বাজারের প্রকৃত চিত্র বুঝতে তাই উৎপাদন ও আমদানি ব্যয় থেকে শুরু করে পাইকারি ও খুচরা বিক্রির পর্যায় পর্যন্ত দামের ব্যবধান, মুনাফা ও বাজার তদারকির কার্যকারিতা খতিয়ে দেখা জরুরি। 


তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাজারে এক কেজি চালের জন্য ভোক্তাকে যে টাকা দিতে হচ্ছে, তার পুরোটা কৃষকের হাতে পৌঁছায় না। একইভাবে আমদানি করা এক লিটার ভোজ্যতেল খুচরা দোকানে বিক্রির আগেই কয়েকটি পর্যায় অতিক্রম করে। উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও বিপণনের প্রতিটি ধাপে ব্যয় যুক্ত হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এসব ব্যয়ের বাইরে কোথায় কত টাকা মুনাফা থাকছে, কোন পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধির চাপ সবচেয়ে বেশি তৈরি হচ্ছে এবং বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারদর নির্ধারণে কতটা প্রভাব রাখছেÑ এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর স্পষ্ট নয়। 


খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিত্যপণ্যের বাজারে চাল ও ভোজ্যতেলের দাম নিয়ে ভোক্তাদের উদ্বেগের মধ্যে মূল্যশৃঙ্খলের এই অস্বচ্ছতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। উৎপাদন বা আমদানি পর্যায়ের মূল্য এবং খুচরা বাজারের দামের মধ্যে বড় ব্যবধান দেখা গেলেও সেটিকে সরাসরি ব্যবসায়ীদের মুনাফা হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। তারা বলছেন, প্রকৃত চিত্র জানতে প্রয়োজন উৎপাদন ব্যয়, আমদানি মূল্য, পরিবহন, সংরণ, কমিশন, কর এবং প্রতিটি পর্যায়ের ক্রয়-বিক্রয়ের হিসাব। এসব তথ্য একসাথে বিশ্লেষণ করা না হলে মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত কারণ আড়ালেই থেকে যায়। 
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) প্রকাশিত এক গবেষণায় খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ও খুচরা পর্যায়ের দামের ব্যবধানের একটি চিত্র পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা তথ্যে দেখা যায়, মাঝারি মানের পাইজাম চাল উৎপাদন পর্যায়ে প্রতি কেজি গড়ে ৩০ টাকা ৬৫ পয়সায় বিক্রি হলেও খুচরা বাজারে এর দাম ছিল ৫৯ টাকা ৬৯ পয়সা; অর্থাৎ দুই পর্যায়ের দামের ব্যবধান ২৯ টাকা ৪ পয়সা, যা উৎপাদন পর্যায়ের দামের প্রায় ৯৫ শতাংশ। 


প্রতিষ্ঠানটির গবেষণায় দেখা যায়, উৎপাদক থেকে খুচরা বাজারে পৌঁছাতে কাঁচামরিচের দাম ১১৬ শতাংশ, দেশী পেঁয়াজের ৮৭ শতাংশ, মসুর ডালের ৭৮ শতাংশ, বেগুনের ৭২ শতাংশ এবং আলুর ৫০ শতাংশ বাড়ার তথ্য উঠে এসেছে। এসব পরিসংখ্যান বাজারজাতকরণের বিভিন্ন পর্যায়ে মূল্য সংযোজনের বিষয়টি সামনে আনে। তবে চালের েেত্র ধান থেকে চাল তৈরির প্রক্রিয়া, চালের উৎপাদন অনুপাত, উপজাত বিক্রি থেকে আয়, পরিবহন ও সংরণ ব্যয় বিবেচনা করতে হবে। অন্য পণ্যের েেত্রও একইভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যয় বাদ দিয়ে প্রকৃত মুনাফা নির্ধারণ করা জরুরি। 


সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চালের বাজারে সাম্প্রতিক দর বৃদ্ধির পেছনে ধানের মূল্য, পরিবহন ব্যয় এবং সরবরাহ পরিস্থিতির প্রভাব রয়েছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে ঢাকায় সরু চালের দাম এক সপ্তাহে কেজিপ্রতি ৭২ টাকা থেকে বেড়ে ৭৪-৭৫ টাকা হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। মাঝারি চালের দাম ৫৫-৬২ টাকা থেকে বেড়ে ৫৮-৬৫ টাকায় উঠেছে। তবে মোটা চালের দাম ৫০-৫৫ টাকায় অপরিবর্তিত রয়েছে। 
এ দিকে পাইকারি বাজারে একই সময়ে সরু চালের দাম কেজিপ্রতি প্রায় এক টাকা বেড়ে ৬৬ টাকা এবং মাঝারি চালের দাম দেড় টাকা বেড়ে ৪৮ টাকা ৫০ পয়সায় দাঁড়ায় বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা বলছেন, কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় এক ট্রাক চাল পরিবহনের ভাড়া ২০ হাজার থেকে বেড়ে ২৪ হাজার টাকা হয়েছে। পরিবহন ব্যয়ের এই বৃদ্ধি বাজারদরে প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু ভাড়া বৃদ্ধির কারণে প্রতি কেজি চালে প্রকৃতপে কত টাকা বাড়তি ব্যয় হচ্ছে, তা নির্ণয় না করে পুরো মূল্যবৃদ্ধির ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব নয়। 


এ দিকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভোজ্যতেলের বাজারে মূল্য নির্ধারণের হিসাব আরো কয়েকটি বিষয়ের সাথে যুক্ত। বাংলাদেশে সয়াবিন ও পাম তেলের বড় অংশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারদর, ডলারের বিনিময় হার, জাহাজভাড়া, আমদানি অর্থায়ন, শুল্ক-কর এবং পরিশোধন ব্যয় দেশীয় মূল্যে প্রভাব ফেলে। এসব ব্যয়ের পরিবর্তন হলে তার প্রতিফলন বাজারে দেখা যাওয়ার কথা। 
এ দিকে ২৬ অক্টোবর ভোজ্যতেল ব্যবসায়ীরা প্রতি লিটারে আরো ১৫ টাকা মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছেন। তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামাল ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। তবে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব আর সরকারের অনুমোদিত দাম এক নয়। প্রস্তাবটির যৌক্তিকতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আমদানি চালান, বর্তমান মজুদ, পরিশোধন ব্যয়, পরিবেশকদের কাছে বিক্রয়মূল্য এবং আগের মূল্য সমন্বয়ের প্রভাব পরীা করা দরকার বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। 
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান নয়া দিগন্তকে বলেন, সরবরাহ কম থাকার অভিযোগও একইভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বা আমদানি কমে গেলে তার কারণ কী, বাজারে মোট সরবরাহ কতটা কমেছে এবং অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো ঘাটতি পূরণ করতে পারছে কি না এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া সরবরাহ সঙ্কটের দায় নির্দিষ্ট কোনো পরে ওপর চাপানো যায় না। আবার বাজারে পর্যাপ্ত পণ্য থাকা সত্ত্বেও দোকানে সরবরাহ না পাওয়া গেলে পরিবেশক ও সরবরাহকারীদের বিক্রয় নথি পরীা করা জরুরি বলে তিনি মনে করেন। 


তিনি বলেন, সরকারি নীতির কার্যকারিতা যাচাইয়ের েেত্রও একই ধরনের স্বচ্ছতা প্রয়োজন। চাল আমদানির অনুমতি, সরকারি খাদ্যগুদামের মজুত, বাজারে সরকারি চাল সরবরাহ এবং ভোজ্যতেলের শুল্ক-কর সমন্বয়ের উদ্দেশ্য হলো সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলা। কিন্তু কোনো নীতিগত সুবিধা দেওয়ার পর আমদানিকারকের ব্যয় কতটা কমেছে এবং সেই সুবিধার কতটা ভোক্তার কাছে পৌঁছেছে, তা আলাদা করে পরিমাপ করা জরুরি। শুধু শুল্ক কমানো বা বাজারে অভিযান পরিচালনার তথ্য দিয়ে নীতির সাফল্য বিচার করা যায় না। 


কৃষি অর্থনীতিবিদ প্রফেসর গোলাম হাফিজ কেনেডি নয়া দিগন্তকে বলেন, একই পণ্যের উৎপাদন বা আমদানি পর্যায়ের মূল্য, প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যয়, পরিবহন, সংরণ, কমিশন এবং পাইকারি ও খুচরা বিক্রির মূল্য পাশাপাশি প্রকাশ করা হলে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি শনাক্ত করা সহজ হবে। বড় চালকল ও ভোজ্যতেল সরবরাহকারীদের বাজারে অংশীদারত্ব এবং সরবরাহের পরিবর্তনের তথ্যও প্রকাশ করতে হবে। 


তিনি বলেন, অস্বাভাবিক মজুদ, সরবরাহ আটকে রাখা, প্রতিযোগীদের সাথে যোগসাজশ কিংবা ব্যয়ের তুলনায় অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপরে তদন্ত করা উচিত। তবে শুধু বেশি দাম বা বড় মূল্য ব্যবধান দেখেই কোনো প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা ঠিক হবে না। একইভাবে ব্যবসায়ীদের ব্যয় বৃদ্ধির দাবি যাচাই ছাড়াই গ্রহণ করাও ভোক্তার স্বার্থের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে তিনি মনে করেন। 


খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ের মূল্য, ব্যয় ও মুনাফার হিসাব প্রকাশ করা গেলে বোঝা সম্ভব হবে কোথায় অপ্রয়োজনীয় খরচ বাড়ছে, কোথায় প্রতিযোগিতা দুর্বল এবং সরকারি নীতির সুফল কোথায় আটকে যাচ্ছে। তাতে বাজারের সব মূল্যবৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যাবে এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে অনুমাননির্ভর অভিযোগের বদলে প্রমাণের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ এবং ভোক্তার স্বার্থ রার জন্য এটি হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর সূচনা।