Image description

‘আপনি কি কাজের পাশাপাশি ঘরে বসেই অতিরিক্ত টাকা আয় করতে চান’—হাতে থাকা মুঠোফোনে হঠাৎ অচেনা নম্বর থেকে এল এমন ক্ষুদেবার্তার নোটিফিকেশন। বেকার শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে করপোরেট কর্মকর্তা কিংবা গণমাধ্যমকর্মী—অনেকেরই কাছেই আসছে এমন প্রলুব্ধ করা বার্তা। আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ এই বর্তার আড়ালে রয়েছে সাইবার প্রতারক চক্রের এক অদৃশ্য জাল।

সাইবার অপরাধের এই আধুনিক সংস্করণে নেই র‌্যানসমওয়্যারের মতো জবরদস্তি। অপরাধীরা এখানে মানুষের মনস্তত্ত্ব কাজে লাগায়। প্রথমে কোনো কাজ ছাড়াই অথবা অতি সাধারণ ‘টাস্ক’ করিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিকাশে ছোট অঙ্কের টাকা পাঠিয়ে আস্থার পরিবেশ তৈরি করে। এরপর সেই আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে ধাপে ধাপে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে সর্বস্বান্ত করে ভুক্তভোগীকে।

হোয়াটসঅ্যাপে শুরু হওয়া যোগাযোগ এক পর্যায়ে গড়ায় টেলিগ্রামের গোপন গ্রুপে। শেষে ভুয়া বিনিয়োগের নামে বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এই সংগঠিত সাইবার অপরাধ ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে।

আস্থার ফাঁদ

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী শফিকুল ইসলাম সবুজ (ছদ্মনাম) নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন স্ট্রিমের কাছে।

সবুজ বলেন, ‘ওরা কীভাবে গ্রাহকদের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর সংগ্রহ করে, তা আমি জানি না। ওরা কোনো একটা নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিত। মেসেজ দিয়ে তাদের কিছু গ্রুপের লিংক বা আইডি দিত। বলা হতো, এই গ্রুপে যুক্ত হলে সারাদিনে নির্দিষ্ট কিছু টাস্ক দেওয়া হবে। আর এই টাস্কগুলো সম্পন্ন করলে প্রতিটির জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দেওয়ার লোভনীয় অফার দিত তারা।’

টাস্কগুলো অবিশ্বাস্য রকমের সহজ ছিল উল্লেখ করে সবুজ বলেন, ‘গ্রুপে যুক্ত হওয়ার পর দেখা যেত, প্রতি এক বা দুই ঘণ্টা পর পর তারা এমসিকিউর মতো একটা করে প্রশ্ন দিত। উত্তরগুলোও ওখানেই দেওয়া থাকত, শুধু সেগুলো সিলেক্ট করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হতো। টাস্ক শেষ করে তার স্ক্রিনশট গ্রুপে পাঠাতে হতো। স্ক্রিনশট দেওয়ার পরপরই বিকাশে টাকা চলে আসত। আমি যতদূর দেখেছি, প্রতি টাস্কে তারা ২৫০ টাকা বা ২৭০ টাকা করে দিত।’

এই প্রক্রিয়াটিই হলো প্রতারকদের সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র। তারা ভুক্তভোগীর মনে প্রবেশ করায় যে, এটি সম্পূর্ণ বৈধ ও লাভজনক কাজ। সবুজ আরো বলেন, ‘এভাবে পাঁচ-সাতটা টাস্ক করিয়ে প্রথমে অ্যাকাউন্টে দেড়, দুই অথবা আড়াই হাজার টাকা বিকাশে পাঠিয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করত।’

বিনামূল্যে অর্থ বিলিয়ে দেওয়ার এই বিষয়টিই মূল ফাঁদ। বিশ্বাস যখন পুরোপুরি তৈরি হয়, তখনই শুরু হয় প্রতারণা।

সবুজ বলেন, ‘এরপরের ধাপে যে টাস্ক আসত, সেখানে বলা হতো আগে পেমেন্ট বা বিনিয়োগ করতে হবে। যে পরিমাণ টাকা দেওয়া হবে, তার দ্বিগুণ বা তিনগুণ ফেরত পাওয়া যাবে। সর্বনিম্ন ডিপোজিট ছিল ৫ হাজার টাকা, আর সর্বোচ্চ এক লাখ, দুই লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত।’

লোভ ও বিশ্বাসের এই সংমিশ্রণে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া তুলে ধরে তিনি জানান, ‘শুরুতে যখন কেউ দেখে ছোট টাস্ক করে বিকাশে সত্যিই টাকা পাওয়া যাচ্ছে, তখন সে বিশ্বাস করে। অনেকে চিন্তা করে—৫ হাজার টাকা দিয়ে যদি টাস্ক শেষে ১০ হাজার টাকা পাওয়া যায়, তবে ক্ষতি কী! শুরুতে ৫ হাজার দিলে প্রতারকরা ১০ হাজার টাকা ফেরত দিয়ে লোভ আরও বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু যখনই কেউ বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করে, তখনই তারা পুরো টাকা মেরে দেয়। পরবর্তীতে আর কোনো টাকাই ফেরত দেয় না তারা।’

সবুজ নিজে সচেতন থাকায় ফাঁদে পা দেননি। তিনি বলেন, ‘আমি নিজেও বেশ কয়েকবার ২৫০ টাকা করে পেয়েছি। কিন্তু পরে বুঝতে পারি, বিষয়টি আসলে স্ক্যামের। তখন থেকে এসব মেসেজ ইগনোর করতে শুরু করি।’

কিন্তু সবাই সবুজের মতো সচেতন বা সতর্ক হতে পারেন না। একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে কর্মরত এহতেশাম (ছদ্মনাম) ঠিক এই ফাঁদেই টাকা খুইয়েছেন। স্ট্রিমকে তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে এহতেশাম বলেন, ‘শুরুতে বিষয়টি আমার কাছে ইন্টারেস্টিং ও লাভজনক মনে হয়েছিল। কিন্তু পরে দেখি বেশি বেশি ইনভেস্ট করতে বলে। আমি করেওছিলাম। কিন্তু টাকা আর ফেরত পাইনি।’

তিনি বলেন, ‘প্রায় আড়াই লাখ টাকা হারিয়েছি। এরপর থেকে এমন মেসেজ আরও এসেছে। কিন্তু আর কখনই যুক্ত হইনি।’

একজন তরুণের সর্বস্বান্ত হওয়ার গল্প

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাহিদ (ছদ্মনাম) কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই জড়িয়ে পড়েন সাইবার অপরাধ সিন্ডিকেটের জালে। সেই ঘটনাই স্ট্রিমকে জানান তিনি।

ঘটনার শুরু হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা দিয়ে—‘আপনি কি কাজের পাশাপাশি অতিরিক্ত আয় করতে চান?’ কোনো সন্দেহ না করে নাহিদ তাতে সম্মতি জানান। পার্টটাইম কাজ ভেবে তিনি নিজের নাম, বয়স ও পেশার তথ্য দেন। এরপর তাকে একটি কাজ দেওয়া হয়—দেশের একটি ফাইভ স্টার হোটেলের ইতিবাচক মন্তব্যসহ ফাইভ স্টার রেটিং দিয়ে স্ক্রিনশট পাঠানো। কাজ শেষ করতেই তার বিকাশ নম্বরে ১৫০ টাকা চলে আসে। একইভাবে পরের দুটি টাস্কেও রেটিং দিয়ে তিনি তিনবারে মোট ৪৫০ টাকা আয় করেন।

এরপর প্ল্যাটফর্ম পরিবর্তন করে নাহিদকে নেওয়া হয় টেলিগ্রামে। সেখানে প্রথমে এক ‘রিসিপশনিস্ট’ তাকে তাদের এক ‘সিনিয়র অফিসারের’ সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন। টেলিগ্রামে তাদের নাম ছিল বিদেশি। তারা ইংরেজিতে কথা বললেও বাংলা বুঝত।

এই সিনিয়র অফিসার নাহিদকে বিনিয়োগের ফাঁদে ফেলেন। তিনি বিকাশ নম্বরে ৩০০ টাকা পাঠাতে বলেন এবং জানান, ‘বিট’ নামের একটি সাইটে ডলার বা ইউরোর দামের ওঠানামার ওপর এ টাকা খাটানো হবে। লাভসহ মোট ৮০০ টাকা ফেরত পাওয়া যাবে। নির্দেশমতো ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করে টাকা খাটানোর পর সত্যিই নাহিদ ৮০০ টাকা তুলে নিতে পারেন।

বিশ্বাস দৃঢ় হলে এক ঘণ্টা পর তাকে ১ হাজার টাকা বিনিয়োগ করতে বলা হয়। নাহিদ কোনো চিন্তা ছাড়াই ১ হাজার টাকা রিচার্জ করেন এবং কথামতো সাইটে কাজ করে বিকাশে ১ হাজার ৮০০ টাকা পেয়ে যান।

লোভের পারদ চূড়ান্তে পৌঁছায়, যখন অফিসার ৫ হাজার টাকা বিনিয়োগ করতে বলেন। জিতলে ফেরত মিলবে ১২ হাজার টাকা। নাহিদের নিজের কাছে ছিল ২ হাজার টাকা। লোভ সংবরণ করতে না পেরে ৩ হাজার টাকা বন্ধুর কাছ থেকে ধার করে মোট ৫ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেন তিনি। এবারও আসলসহ মোট ১২ হাজার টাকা পেয়ে যান। লাভ হয় ৭ হাজার টাকা।

নাহিদের সংশয় তখন সম্পূর্ণ উবে গেছে। সেই ‘সিনিয়র অফিসার’ এবার তাকে ২০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করতে বলেন, যা জিতলে পাওয়ার কথা ৩৫ হাজার টাকা। নাহিদ আবার ধার করে সেই ২০ হাজার টাকা সাইটে বিনিয়োগ করেন। কিন্তু এবার নির্দেশমতো কাজ করলেও বিকাশে আর কোনো টাকা আসে না।

আতঙ্কিত নাহিদ জবাব চাইলে সিনিয়র অফিসার উল্টো তার ওপর দোষ চাপিয়ে দেন। তিনি দাবি করেন, নাহিদের ভুলের কারণে টেলিগ্রাম গ্রুপের অন্য ১২-১৩ জন গ্রাহকের টাকাও নষ্ট হয়েছে। এরপর হারানো সব টাকা উদ্ধারের শর্ত হিসেবে প্রত্যেককে নতুন করে ৩০ হাজার টাকা জমা দিতে বলা হয়। গ্রুপের কিছু ছদ্মবেশী সদস্য টাকা দেওয়ার ভান করলেও নিঃস্ব নাহিদের পক্ষে আর টাকা জোগাড় করা সম্ভব হয়নি। ২০ হাজার টাকা হারিয়ে প্রতারিত হওয়া ছাড়া তার আর কোনো উপায় ছিল না।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কী বলছে?

সংগঠিত এই সাইবার চক্রগুলোর লাখ লাখ টাকা লোপাটের বিষয়ে বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ছুফি উল্লাহ স্ট্রিমকে বলেন, ‘সাইবার অপরাধগুলো নিয়ে আমাদের কাছে যখনই অভিযোগ আসে, আমরা তাৎক্ষণিকভাবে সেগুলো নিয়ে কাজ করি। এর মধ্যে কিছু মামলাও এসেছে। সেগুলো নিয়ে আমরা কাজ করেছি।’

প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের আইনি সহায়তা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো ভুক্তভোগী যদি সুর্নিদিষ্টভাবে আমাদের কাছে অভিযোগ করেন, তাহলে দ্রুত পদক্ষেপ নেব। আমাদের হটলাইন নাম্বার আছে। সেখানে যোগাযোগ করলেও হবে।’

প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার সফলতার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘এর আগে একজনের মোবাইলে একটি সফটওয়্যারের লিংক এসেছিল। সেই সফটওয়্যারে প্রবেশের ফলে তার প্রায় ৯ লাখ টাকা চুরি হয়। আমাদের কাছে অভিযোগ করলে আমরা সেই টাকা উদ্ধার করি। তাই সুর্নিদিষ্ট অভিযোগ পেলে আমরা এ বিষয়ে কাজ করতে পারব।’