Image description

দেশের অন্যতম ব্যস্ত রেল স্টেশন ‘ঢাকা বিমানবন্দর’। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এই স্টেশন দিয়ে যাতায়াত করেন। তবে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকায় স্টেশনের ভেতরে ও বাইরে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে যাত্রীদের।

অন্তঃসত্ত্বা তাসনীম মাহবুব কোনো মতে একটি বিশ্রামাগারে বসার সুযোগ পেয়েছিলেন। সেখানে থাকা দুটি টয়লেটের একটিতে যাওয়ার জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। এর আগে প্ল্যাটফর্মের সাধারণ টয়লেটে গিয়ে ভয় পেয়ে ফিরে এসেছেন, কারণ সেখানে ঘুরঘুর করছিল বেশ কয়েকজন ভবঘুরে।

তাসনীন আক্ষেপ করে টাইমসকে বলেন, ‘আমার পেটে বাচ্চা, এতক্ষণ কি দাঁড়িয়ে থাকা যায়? অথচ পুরুষদের টয়লেটের সামনে কোনো ভবঘুরে নেই।’

প্রতিদিন ঢাকার কমলাপুর থেকে কমপক্ষে ৬৯ জোড়া ট্রেন চলাচল করে। এসব ট্রেন পরিবহন করে দেড় থেকে দুই লাখ যাত্রী। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ ও পদ্মাসেতু হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলগামী ট্রেন ছাড়া বিমানবন্দর স্টেশন হয়ে চলে সমগ্র উত্তরবঙ্গ, খলিনা-যশোরের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ, জামালপুর, নেত্রকোণা, নোয়াখালী ও কিশোরগঞ্জের ট্রেন। এসব ট্রেনের প্রত্যেকটি বিমানবন্দর স্টেশনে থামে।

অথচ ঢাকার কমলাপুর স্টেশনে ১১টি প্ল্যাটফর্ম থাকলেও বিমানবন্দরে আছে মাত্র দুটি। সাধারণত একটি প্ল্যাটফর্ম ঢাকা থেকে বের হওয়ার এবং অন্যটি ঢাকায় প্রবেশের জন্য ব্যবহার হয়।

এক সময় ছোট্ট স্টেশন হিসেবে বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছিল। তখন লোকাল ট্রেন ছাড়া অন্য কোনো ট্রেনের এই স্টেশনে বিরতি ছিল না। পরে বিমানবন্দরকেন্দ্রীক যাত্রীদের সুবিধার জন্য এই পথে চলা সকল ট্রেনের বিরতি দেওয়া হয়। বর্তমানে কলকাতা ও শিলিগুড়িতে চলাচল করা দুটি আন্তর্জাতিক ট্রেন ছাড়া এই পথে চলাচল করা সকল ট্রেনেরই বিমানবন্দর স্টেশনে বিরতি রয়েছে। স্টেশন কর্মীদের মতে, প্রতিদিন এই স্টেশন দিয়ে প্রতিদিন অন্তত ৬০ হাজার মানুষ যাতায়াত করেন।

ট্রেন সময়মতো না চলায় প্ল্যাটফর্মে ভিড় জমে জনসভার রূপ নেয়। সেখানে বসার জায়গা কম, বৈদ্যুতিক পাখা হাতে গোনা কয়েকটি। গরমে হাঁসফাঁস করতে করতে যাত্রীরা প্রহর গুনতে থাকেন। প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে অনেক সময় ট্রেনে ওঠাই দায় হয়ে পড়ে। প্ল্যাটফর্মে কয়েকটি বেঞ্চ থাকলেও অনেক বেঞ্চ আবার ভাঙা। বসার জায়গা না পেয়ে অনেকেই মেঝেতে বসে পড়েন।

দুই সন্তান নিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা মনিরা সুলতানা টাইমসকে জানান, ভিড়ের কারণে তিনি পরপর দুটি ট্রেনে উঠতেই পারেননি।

বিশ্রামাগার ও টয়লেটের বেহাল দশা

প্রথম শ্রেণির বিশ্রামাগার দুটিতে মাত্র ৫২ জনের বসার ব্যবস্থা আছে। ভেতরের মেঝেতেও নারী ও শিশুদের গাদাগাদি করে বসে থাকতে দেখা যায়। ফ্যান চললেও ভিড়ের কারণে দমবন্ধ করা পরিবেশ। তীব্র দুর্গন্ধে বিশ্রামাগারের টয়লেটগুলোর দরজাই খোলা যায় না। আর প্ল্যাটফর্মের বাইরের পাবলিক টয়লেটগুলোর অবস্থা এতটাই বাজে যে, যাত্রীদের নাক চেপে যাতায়াত করতে হয়।

 

 

অন্যদিকে, স্টেশনের ভিআইপি রুমটি প্রায় সবসময়ই ফাঁকা থাকে। সেখানে সারাদিন ভিআইপিদের অপেক্ষায় বসে থাকেন একজন রেলকর্মী।

গত ১৩ অক্টোবর দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত স্টেশন মাস্টার মো. আলমগীর হোসেনকে অফিসে পাওয়া যায়নি। অন্য এক রুমে পাওয়া যায় গ্রেড-সি স্টেশন মাস্টার মো. ফজলুর রহমান ভূঁইয়াকে। তিনি টাইমসকে জানান, ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ এই স্টেশন ব্যবহার করেন। সুযোগ-সুবিধার অভাব প্রসঙ্গে তিনি অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, ‘এখানে আমার কী করার আছে?’

নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে টাইমসকে বলেন, বিপুল যাত্রীর চাপ সামলানোর পরিকল্পনা নিয়ে বিমানবন্দর স্টেশনটি তৈরি করা হয়নি। এখন ঢাকার বড় একটি অংশ এই স্টেশন ব্যবহার করে। তাই অবিলম্বে প্ল্যাটফর্ম বড় করা এবং যাত্রীদের জন্য বিশ্রামাগারের সুবিধা বাড়ানো উচিত।

চুরি, ছিনতাই ও নিরাপত্তার অভাব

স্টেশনের সামনের এয়ারপোর্টে রোডে ফুটওভার ব্রিজের চলন্ত সিঁড়িটি দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট। সেখানে ভবঘুরেদের আড্ডা, যারা সুযোগ পেলেই যাত্রীদের ব্যাগ টান মারে।

নিরাপত্তার ঝুঁকি রয়েছে প্ল্যাটফর্মের ভেতরেও। রাজশাহী থেকে আসা যাত্রী সোবহান ইসলাম জানান, ভরা দুপুরেই ওভারব্রিজে উঠতে ভয় লাগে। তিনি বলেন, ‘ব্রিজে বসে থাকা ছোট ছোট শিশুরা আসলে ছিনতাই ও চুরি চক্রের সদস্য।’

রেললাইনের মাঝের লোহার বেড়া কেটে তৈরি করা অবৈধ পথ দিয়েও ঝুঁকি নিয়ে পার হচ্ছেন যাত্রীরা। এমনই এক পরিবারের সদস্য জামান হক বলেন, ‘ফুটওভার ব্রিজ নিরাপদ নয়, তাই অবৈধ হলেও সময় বাঁচাতে এভাবেই পার হচ্ছি।’

এমনকি রেলওয়ে পুলিশকেও এই কাটা অংশ দিয়ে যাতায়াত করতে দেখা গেছে।

জরুরি আইনি সহায়তার জন্য জিআরপি পুলিশের হেল্প ডেস্ক থাকলেও সেখানে কাউকে পাওয়া যায়নি। টিকিট, মোবাইল ও সাত হাজার টাকা খোয়ানো ক্ষুব্ধ যাত্রী ফজলে ইসলাম রায়হান বলেন, ‘স্টেশন মাস্টারে রুমে গিয়েও তাকে পাইনি, পুলিশও নেই।’

পকেটমার ও চুরি ঠেকাতে মাত্র দুজন আনসার সদস্যকে একটি ট্রেনে যাত্রী ওঠার সময় মোবাইলে ভিডিও করতে দেখা যায়। কিন্তু অন্য ট্রেনের সময় তাদেরও হদিস থাকে না। যাত্রীদের প্রশ্ন—দুজন আনসারের মোবাইল ভিডিও দিয়ে কি আদৌ চুরি-ছিনতাই রোখা সম্ভব?

হকার ও অবৈধ দোকানপাটের রাজত্ব

স্টেশনে ঢোকা-বের হওয়ার পথে অবৈধ ফলের দোকান ও মুদি দোকানের ছড়াছড়ি। অনেকে বাধ্য হয়ে মূল গেট এড়িয়ে সরাসরি রেললাইনের ওপর দিয়ে স্টেশনে ঢুকছেন। স্টেশনের ফুটপাত, পার্কিং এলাকা এমনকি আশকোনা লেভেল ক্রসিংয়ের ওপরও দোকান বসানো হয়েছে।

মূল গেটের সামনে অন্তত ১৫টি ভাসমান দোকান রয়েছে। রমজান নামে এক দোকানি টাইমসকে জানান, দিনপ্রতি এক হাজার টাকার বিনিময়ে আনসার সদস্যরা তাদের বসতে দেন। এই টাকার ভাগ স্টেশনের কর্মকর্তা ও লাইনম্যানদের মধ্যেও যায়। তবে আনসার সদস্য ও স্টেশনের কর্মীরা এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

এর পাশাপাশি, স্টেশনের সামনের ওভারব্রিজের নিচে ময়লা-প্লাস্টিকের স্তূপ জমে রয়েছে। সেখানে মশা-মাছির উপদ্রব প্রবল। যাত্রীদের মতে, সন্ধ্যা নামলেই প্ল্যাটফর্মে মশার কামড়ে টেকা দায় হয়ে পড়ে।