দুর্গাপূজা চলাকালীন সময়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা জানানো ও মন্ডপ পরিদর্শন করায় বিএনপির এমপি-মন্ত্রীদের হিন্দু পুরোহিত ও দেব-দেবী সাজিয়ে এআই জেনারেটেড সাম্প্রদায়িক আক্রমণমূলক বিভিন্ন ছবি নিজের ফেসবুক পেজে পোস্ট করে আসছেন জামায়াতপন্থী অ্যাক্টিভিস্ট মীর জাহান। এই তালিকায় ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানাও। গতকাল বুধবার রাতে রুমিন ফারহানার ছবিকে দেবী দুর্গারূপে সাজিয়ে পোস্ট করে মীর জাহান লিখেছেন, “ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের মুসলমানদের প্রিয় দেবী”।
মীর জাহানের ওই পোস্টের কমেন্ট বক্সে ধর্মীয় আক্রমণমূলক মন্তব্য করতে দেখা যায় তার অনুসারীদের।
প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে দেবী আকৃতিতে বানানো ছবিটি রুমিন ফারহানা নিজেও তার পেইজে পোস্ট করেন।
ওই পোস্টে তিনি লিখেছেন, “ছবিটি কেউ একজন তৈরি করে ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়েছে বিভাজন আর ঘৃনা উস্কে দিতে। যারা ঘৃনার চাষকে ধর্ম ভাবেন তাদের বলছি… বলাৎকারে ধর্ম যায় না, ঘুষ খেলে ধর্ম যায় না, শিশু ধর্ষন বা নির্যাতনে ধর্ম যায় না, মানুষ খুনে ধর্ম যায় না, নারীর উপর সহিংসতায় ধর্ম যায় না, ওজন বা মাপে কম দিলে ধর্ম যায় না, খাদ্যে ভেজাল এমন কি বিষ মেশালেও ধর্ম যায় না। ধর্ম যায় কেবল অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলে। বি:দ্র: মা দুর্গা দশভুজা, আটভুজা না। যাই হোক মূর্খের সমাজ, কি আর করা।”
রুমিন ফারহানার এই প্রতিক্রিয়ার পর নিজের আইডিতে পাল্টা পোস্ট দিয়ে মীর জাহান দাবি করেছেন ‘রুমিন ফারহানা আর মুসলিম নন’।
ওই পোস্টে তিনি লিখেছেন, “ভেবেছিলাম ব্যারিস্টার মানুষ হয়তো শিক্ষিত, কিন্তু রুমীন আসলে ধর্মের বিষয়ে অজ্ঞ, মূর্খ যার প্রাথমিক জ্ঞানটুকুও নেই।… অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলে ধর্ম যায় না, বরং ইসলাম আমাদেরকে অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং সহনশীলতা শেখায়। শ্রদ্ধাশীল হওয়ার অর্থ এই নয় যে সেই ধর্মকে লালন করা। হ্যাঁ, ধর্ম যায় তোমার মতো সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী এবং দশমীর জন্য শাড়ি জমিয়ে রাখলে, সেই ধর্ম পালন করলে। তখন আর তওবাহ করলে হয় না, নতুন করে ঈমান আনতে হয়। রুমীন তুমি এখন আর মুসলমান নও।”
মীর জাহানের উস্কানিতে রুমিন ফারহানার বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন
এআই জেনারেটেড ছবিটি পোস্ট করে Md. Abdul Kayum নামে একজন লিখেছেন, “রুমিন ফারহানার ঈমান চলে গেছে। সে মুরতাদ হয়ে গেল। নতুন করে ইসলামে ফিরতে হলে তাওবাহ করে পুনরায় কালেমা পড়তে হবে। বর্তমান অবস্থায় সে মারা গেলে তার জানাযা পড়ানো হারাম, তাকে মুসলিমদের কবরস্হানে দাফন করা হারাম।”
Md Nurul Alam Alam নামে একজন ছবিটি শেয়ার দিয়ে ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “এগুলোর ঈমান অনেক আগেই নাই। মুসলিম নামধারী এই কাফেরদেরকে বয়কট করা না হলে এরা মুসলিমদেরকে কাফেরদের দাস বানিয়ে দিবে। ফিলিস্তিন আরাকানের মুসলিমদের অবস্হা বাংলাদেশে ফিরে আসবে।”
মুহাম্মাদ মোবারক সাদী নামে একজন রুমিন ফারহানার পোস্টটি শেয়ার দিয়ে লিখেছেন, “রুমিন ফারহানার ২২ টা কথায় ইমান যায় না....২২ এর পর যা বললো তাতে ইমান চলে যায়.....সুতরাং স্পষ্ট অমুসলিম হয়ে গেছে।”
যাচাই না করেই খবর বানায় মিডিয়া
মীর জাহানের ছড়ানো ছবিটি ছিল ধর্মীয় আক্রমণমূলক। অন্যদিকে রুমিন ফারহানা নিজে ওই ছবিটি পোস্ট করা ছিল প্রতিবাদমূলক। পুরো বিষয়টি যাচাই না করে সংবাদমাধ্যম শিরোনাম করেছে “দুর্গার সাজে রুমিন ফারহানা”।
স্টার নিউজে প্রকাশিত সংবাদে লেখা হয়েছে, “এখনো পূজার রেশ কাটেনি। এরইমধ্যে দুর্গার সাজে সেজেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। সেই ছবি পোস্ট করেছেন নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে। সেখানে তিনি ২২টি বচনও দিয়েছেন।”
বার্তা বাজারের সংবাদে লেখা হয়েছে, “ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা দুর্গার সাজে একটি ছবি পোস্ট করেছেন। সেখানে তিনি ২২টি বচন দিয়েছেন তিনি।”
একই ধরনের শিরোনামে ভিডিও প্রতিবেদন বানিয়েছে দৈনিক যুগান্তর ও ইত্তেফাক।
এসব খবরে এই ছবির মূল উৎস এবং আলোচনা-সমালোচনার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি। এবং রুমিন ফারহানা যে এআই জেনারেটেড ছবিটির প্রতিক্রিয়া হিসেবে পোস্টটি দিয়েছেন, সেই বিষয়টিও এসব খবরে অস্পষ্ট।
যা বলছেন রুমিন ফারহানা
রুমিন ফারহানা তার বিরুদ্ধে চালানো ক্যাম্পেইন সম্পর্কে বেঙ্গল লেন্সকে বলেন, “আমি পোস্টে এ ছবির বিষয়ে আমার বক্তব্য স্পষ্ট করেছি। যিনি এটা ছড়িয়েছেন, তাকে আমি চিনিও না। আমি শুধু বলতে চাই কারা সমাজে অশান্তি, বিভাজন আর ঘৃণা সৃষ্টি করতে চায় তাদের ব্যাপারে মানুষকে সচেতন এবং সাবধান হতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশ একটা অসাম্প্রদায়িক দেশ। আবহমান কাল থেকেই হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এই চার ধর্মের মানুষ আমরা একসাথে থেকে আসছি। বাংলাদেশ কোনো উগ্রপন্থার দেশ না। বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত সহনশীল, ধৈর্যশীল এবং অসাম্প্রদায়িক। তো এর মধ্যে যারা ঘৃণার চাষ করতে চায়, এটা দুই চারজন। এরা খুব বেশি লোক না। সুতরাং তারা কখনোই সফল হবে না।”
বিএনপির অন্য নেতাদের নিয়েও সাম্প্রদায়িক ছবি ছড়িয়েছেন মীর জাহান
২১ অক্টোবর সন্ধ্যায় পানি সম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানিকে সনাতনী শঙ্করাচার্য রূপে সাজিয়ে এআই জেনারেটেড একটি ছবি পোস্ট দিয়ে লিখেছেন, “ভোটের আগে এরা মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে খুতবা দেয়, আর ভোটের পরে পূজায় দুগ্গার পায়ে পেন্নাম করে।”
আইনমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানকে পুরোহিত রূপে সাজিয়ে ২০ অক্টোবর রাতে দেওয়া এক পোস্টে মীর জাহান লিখেন, “যারা ভোট দিয়ে এদের নেতা নির্বাচন করে, তারাও এদের পাপাচারের ভাগীদার।”
২০ অক্টোবর সন্ধ্যায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খানের পুরোহিত রূপে একটি ছবি পোস্ট করে তিনি লিখেন, "মা দূর্গা স্বর্গ থেকে নেমে আসে দুঃশাসন দূর করতে"! ডা মঈন খান। এদের ডিএনএ টেস্ট করার দরকার আছে?”
২০ অক্টোবর বিকেলে জাতীয় সংসদের হুইপ এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজানকে এআই এর সাহায্যে সনাতনী সন্ন্যাসী রূপে সাজিয়ে একটি পোস্টে মীর জাহান লিখেছেন, “ধর্মীয় নানা জনপ্রিয় বক্তব্য দিয়ে একজন মুসলমান হিসেবে পরিচিতি পাওয়া আশরাফ উদ্দিন নিজান সাহেব পূজোয় গিয়ে বুঝিয়ে দিলেন, ভোটের রাজনীতিতে ঈমানও বিসর্জন দেওয়া তুচ্ছ ব্যপার! ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে পরিচিতি অর্জন, আর ভোটের স্বার্থে সেই ধর্মীয় অবস্থানকে জলাঞ্জলি দেওয়া এদের কাছে কোন ব্যাপারই না।”
সেই ছবিতে লেখা ছিলো,“আমি ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি, কেউ আমার সাথে থাকুক বা না থাকুক ভগবান আমাকে শক্তি নান করুন”
১৯ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে পুরোহিত সাজিয়ে এআই জেনারেটেড একটি ছবি পোস্ট করে তিনি লিখেছেন, “শরীয়া আইনে বিশ্বাস না করলেও, পৃথিবীকে অন্যায় অবিচার থেকে মুক্ত করতে দূর্গার আগমনে বিশ্বাস ঠিকই আছে। ফাকরুল দেবনাথ।”
জামায়াতের পক্ষে প্রচারণা চালানো এই অনলাইন একটিভিস্টকে প্রায়শই অনলাইনে অপতথ্য ছড়াতে দেখা যায়। ইতিপূর্বে একাধিক ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান তার ছড়ানো অপতথ্য শনাক্ত করেছে।
দুর্গা পূজা উপলক্ষে রুমিন ফারহানা ও বিএনপি নেতাদের নিয়ে ধর্মীয় আক্রমণমূলক ছবি ছড়ানোয় তার বিরুদ্ধে অনলাইনে সরব হয়েছেন অনেকেই।