জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি দায়িত্ব নেয়ার পর এক বছরে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন, তিনি বেপরোয়া ব্যয় করেন না। এখন তাকে সেই অবস্থানের সত্যতা প্রমাণ করতে হবে।
মিজুহো ব্যাংকের অধীন পরিচালিত মিজুহো রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ সাইসুকে সাকাই বলেন, ‘এখন থেকে আসল পরীক্ষা হবে কথায় নয়, কাজে।’
তিনি বলেন, ‘বাজেটের মাধ্যমে সরকার বাজারকে কতটা আশ্বস্ত করতে পারে, সেটিই হবে মূল বিষয়। একই সঙ্গে রাজস্ব শৃঙ্খলা বজায় রাখা, প্রবৃদ্ধিতে বিনিয়োগ, ভোগ্যপণ্যের ওপর কর কমানো এবং প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে।’
গত বছরের ২১ অক্টোবর জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে তাকাইচি প্রবৃদ্ধিমুখী রাজস্বনীতি এবং রাজস্বের স্থিতিশীলতা—দুটিই নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, প্রবৃদ্ধি উৎসাহিত করতে জাপান সরকার যথেষ্ট বিনিয়োগ করছে না। তাই সেমিকন্ডাক্টর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ‘বড় ধরনের বিনিয়োগ’ করতে চান তিনি।
জাপান রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান অর্থনীতিবিদ তোমোহিসা ইশিকাওয়া বলেন, ‘অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় গুরুত্ব দেয়া এবং একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় সক্রিয় রাজস্ব ব্যয়ের মাধ্যমে শিল্পনীতিকে এগিয়ে নেয়া বৈশ্বিক প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই আমার মনে হয়, কৌশলটি সঠিক দিকেই এগোচ্ছে।’
আগামী এপ্রিলে দুই বছর মেয়াদি একটি উদ্যোগের আওতায় নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের ওপর ভোগ কর ৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার পরিকল্পনা করেছে সরকার। এতে জাপানের প্রায় ১০ ট্রিলিয়ন ইয়েন (৬ বিলিয়ন ডলার) ব্যয় হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগামী বছরগুলোতে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোরও পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
তবে এসব নীতির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ কীভাবে সংগ্রহ করা হবে, তা এখনো ব্যাখ্যা করেনি তাকাইচির সরকার। এ বিষয়ে শুধু মৌখিক আশ্বাস দেয়া হয়েছে।
ভোগ কর কমানোর বিষয়ে পার্লামেন্টে তাকাইচি বলেন, ‘বাজারের আস্থা অর্জন করতে আমরা ঘাটতি অর্থায়নের বন্ড ইস্যু না করেই প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করব। তাই অর্থের জোগান নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই।’
বিশ্লেষকদের কাছে কর কমানোর বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
ইশিকাওয়া বলেন, ‘শুধু ভোগ কর কমালেই যে পণ্যের দাম কমবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, সরকার দুই বছর পর সত্যিই এই কর আবার বাড়াতে পারবে কি না।’
তাকাইচির রাজস্বনীতি নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও বিশ্লেষকদের মতে, এখন পর্যন্ত তিনি অনেকের প্রত্যাশার তুলনায় কম ব্যয় করেছেন। সম্পূরক বাজেটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর মতো কিছু সংস্কারের উদ্যোগও নিয়েছেন তিনি।
বর্তমানে আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজ চলছে জাপান সরকারের। বাজেটের খসড়া ডিসেম্বরে প্রকাশ করা হতে পারে।
গত মাসে জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয় জানায়, ২০২৭ অর্থবছরের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার বাজেট চাহিদা রেকর্ড ১৪৩ ট্রিলিয়ন ইয়েনে পৌঁছেছে। চলতি অর্থবছরের তুলনায় এই চাহিদা ২০ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ইয়েন বেড়েছে। পরে আলাদা সম্পূরক বাজেট প্রণয়ন না করে প্রাথমিক বাজেটেই বেশি ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
জাপানের ঋণ ও মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাত ধীরে ধীরে কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে জাপানের এই অনুপাত সবচেয়ে বেশি। দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে অনুপাতটি কমেছে। ২০২৩ সালে ২২০ শতাংশ থেকে চলতি বছর তা আনুমানিক ২০৪ শতাংশে নেমে আসবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে আংশিক ভূমিকা রয়েছে ‘মূল্যস্ফীতিজনিত সুবিধার’। মূল্যস্ফীতির কারণে সরকারের কর আয় বেড়েছে এবং ঋণ-জিডিপি অনুপাত কমেছে।
সাকাই বলেন, ‘মূল্যস্ফীতির কারণে কর আয় বাড়ায় এবং ঋণ-জিডিপি অনুপাত কমে আসায় এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে, বাজারের প্রাথমিক আশঙ্কার তুলনায় রাজস্বসংক্রান্ত ঝুঁকি আরও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।’
তবে ইশিকাওয়ার মতে, জাপানের রাজস্ব পরিস্থিতির উন্নতি নিয়ে সরকার এখনো আন্তরিক—এমন প্রমাণ দিতে পারেনি। ফলে বাজারের সংশয় কাটেনি।
তিনি বলেন, ‘কর আয় বাড়ছে, এটা সত্য। কিন্তু এই প্রবণতা সাময়িক হতে পারে। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় বাড়তে থাকায় জাপান এখনো কঠিন রাজস্ব পরিস্থিতির মুখে রয়েছে। নীতিনির্ধারকদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।’
গত এক বছরে তাকাইচির যেকোনো বক্তব্যের দিকে বাজার সতর্ক নজর রেখেছে। এর পেছনে রয়েছে, প্রধানমন্ত্রীকে রাজস্ব ও মুদ্রানীতিতে শিথিল অবস্থানের সমর্থক হিসেবে দেখার প্রবণতা।
তাকাইচি নেতৃত্ব গ্রহণের আগে, গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রতি ডলারের বিপরীতে ইয়েনের বিনিময়মূল্য ছিল ১৫০ ইয়েনের নিচে। কিন্তু জুলাইয়ে তা দুর্বল হয়ে প্রায় ১৬৪ ইয়েনে পৌঁছায়। এক বছর আগে জাপানের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদের হার ছিল প্রায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ। সম্প্রতি তা বেড়ে ৩ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা ১৯৯৬ সালের পর সর্বোচ্চ।
জুলাইয়ে ইয়েনের দর ধরে রাখতে জাপানকে সহায়তা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এরপর মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইয়েনের আরও দরপতন ঠেকাতে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সুদের হার বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
বেসেন্ট বলেছেন, জাপানের উচিত ‘অ্যাবেনোমিকস’ থেকে সরে আসা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের নামে পরিচিত এই অর্থনৈতিক কর্মসূচিতে ব্যাপক মুদ্রানীতি শিথিলকরণ, নমনীয় রাজস্ব ব্যয় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর কৌশল অন্তর্ভুক্ত ছিল।
অতীতে দেয়া বক্তব্য এবং শিনজো আবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে তাকাইচিকে প্রায়ই আবের অনুসৃত অর্থনৈতিক নীতির সমর্থক হিসেবে দেখা হয়।
তবে সম্প্রতি তাকাইচির সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী জোর দিয়ে বলেছেন, অতীতের কিছু মন্তব্য সত্ত্বেও তিনি মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতিতে শিথিলতার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি বাড়ানোর নীতির সমর্থক নন। তাদের মতে, জাপান এখন আর এমন পর্যায়ে নেই, যেখানে এ ধরনের নীতি কার্যকর হবে।
সূত্র: জাপান টাইমস
সূত্র: জাপান টাইমস