দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কে তিন চাকার যান চলাচল নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে এ নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করেই মহাসড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটোরিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন ধরনের ছোট যানবাহন। কিন্তু কীভাবে এসব যান চলছে, সেই প্রশ্ন উঠছে বারবার।
এ বিষয়ে চালকরা বলছেন, পুলিশি নজরদারির দুর্বলতা, স্থানীয় প্রভাবশালীদের তদবির এবং শ্রমিক সংগঠনের নামে ‘বিটমানি’ দিয়ে এসব যানবাহন মহাসড়কে চালাচ্ছেন চালকরা। এতে বাস-ট্রাকসহ বড় যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি—এটি অস্বীকার করার কোনও সুযোগ নেই বলছেন তারাও।
‘বিটমানি’ কী
‘বিটমানি’ বলতে মহাসড়কে নিষিদ্ধ ছোট যানবাহন চলাচলের সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে শ্রমিক সংগঠন বা সংশ্লিষ্ট শ্রমিক নেতারা নিয়মিত চাঁদা তুলছেন। কোনও গাড়ি পুলিশ আটক করলে শ্রমিক নেতাদের মাধ্যমে তদবির করে ছাড়ানোর ব্যবস্থা করেন তারা। এজন্য আবার বাড়তি টাকাও দিতে হয় চালকদের।
এ অবস্থায় মহাসড়কে ছোট যানবাহন চলাচল বন্ধে প্রশাসনের অভিযান ও নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বাস্তবে তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে চলাচল করা এসব যানবাহনের অনেক চালকেরই নেই প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা। ফলে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা; প্রাণহানির পাশাপাশি আহত হয়ে হাসপাতালে যেতে হচ্ছে অনেককে। কেউ কেউ বরণ করছেন পঙ্গুত্ব।
‘বিটমানি’ দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন চালকরা
বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের উজিরপুরের শিকারপুর এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ ইউসুফ একসময় ভাসমান ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেখান থেকে উচ্ছেদ হওয়ার পর আর ব্যবসায় ফিরতে পারেননি। পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণেও দীর্ঘদিন ব্যবসার বাইরে ছিলেন। মহাসড়কের পাশে নিজের একটি দোকানঘর গড়ে তুললেও শেষ পর্যন্ত আয়-রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে যায়। পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়ে জীবিকার তাগিদে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালানো শুরু করেন।
প্রতিদিন ৩০০ টাকা ভাড়ায় রিকশা নিয়ে সড়কে নামেন ইউসুফ। তার ভাষ্য, মহাসড়কে চলাচলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা ট্রাফিক পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশ। ছোট যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ হলেও একটি শ্রমিক সংগঠনকে ‘বিটমানি’ দিয়ে অনেক চালক মহাসড়কে গাড়ি চালানোর সুযোগ পাচ্ছেন। ওই টাকা না দেওয়ায় প্রায়ই তার গাড়ি আটক করা হতো।
প্রথমে উজিরপুরের বিভিন্ন স্থানীয় সড়কে রিকশা চালানোর চেষ্টা করেন ইউসুফ। কিন্তু সেখানে যাত্রী কম থাকায় গাড়ির ভাড়া তুলতেই হিমশিম খেতে হতো। সংসারের খরচ চালানোও কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত আয় বাড়ানোর আশায় শ্রমিক সংগঠনকে বিটমানি দিয়ে মহাসড়কে গাড়ি চালানো শুরু করেন তিনি। এজন্য প্রতিদিন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে ১০ টাকা করে বিটমানি দিতে হয়। আবার নির্দিষ্ট এলাকা অতিক্রম করলে অন্য স্থানে ১০ টাকা দিতে হয়। মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে দিনভর এসব যানবাহন থেকে ওসব ব্যক্তি বিটমানি তোলেন।
ইউসুফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ছোট গাড়ি চালানো সহজ পেশা। আর এই পেশায় নগদ টাকা পাওয়ায় আয় করাও সহজ হয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ব্যাটারি চার্জ দেওয়া এবং মহাসড়কে ট্রাফিক পুলিশ ম্যানেজ করে চলাচল করা।’
তিনি বলেন, ‘সবকিছুই ম্যানেজ করে চলাচল করা যায়। তবে মাঝেমধ্যে মহাসড়কের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা বিটমানি নিলেও গাড়ি আটক করেন। গাড়ির কোনও ক্ষতি হলে তার সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করতে হয় চালকদের। মালিকের সাফ কথা, গাড়ি যেভাবে নিয়েছি, সেভাবেই ফেরত দিতে হবে। এমনকি কোনও মামলা হলে সেটিও চালককে সামলাতে হয়। আর গাড়ি বাজেয়াপ্ত হলে নতুন গাড়ির দাম দিতে হবে।’
এসব শর্ত মেনেই গাড়ি ভাড়া নিতে বাধ্য হন চালকেরা। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে কাজকর্ম কম থাকলে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও রিকশার কদর বাড়ে। তখন সহজে আয় করার আশায় অনেক শ্রমিক এসব যানবাহন নিয়ে মহাসড়কে নামেন।
দীর্ঘদিন ধরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালান আবু সাঈদ। তার ভাষ্য, মহাসড়কে বড় যানবাহনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলাচল করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তারপরও পরিবারের কথা ভেবে তারা এ পথে নামতে বাধ্য হচ্ছেন। সাঈদ জানান, তিনি যখন বাড়িতে থাকেন, তখন তার ১৪ বছর বয়সী ছেলেও অটোরিকশা চালিয়ে যাত্রী বহন করে। যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কা থাকার পরও আয়ের তাগিদে তাঁরা ঝুঁকি নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
বরিশাল নগরীর মধ্য দিয়ে প্রায় ১১ কিলোমিটার অংশে বিস্তৃত বরিশাল-ঢাকা মহাসড়ক। এ ছাড়া বাবুগঞ্জ, উজিরপুর, বানারীপাড়া ও গৌরনদী উপজেলার ওপর দিয়ে সড়কটি ভাঙ্গা হয়ে পদ্মা সেতুর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ফলে বরিশাল নগরী থেকে শুরু করে এসব উপজেলার নিম্নআয়ের অনেক মানুষ ছোট যানবাহন নিয়ে মহাসড়কে চলাচল করছেন। যাত্রীবাহী বাস ও বড় ট্রাকের সঙ্গে ছোট যানবাহনের সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। এ ধরনের দুর্ঘটনার খবরও নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে গণমাধ্যমে।
কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না প্রশাসন
বরিশাল বাস মালিক গ্রুপের সভাপতি মোশারফ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মহাসড়কে ছোট যানবাহন চলাচলে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা আছে। এরপরও বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কে হাজার হাজার ছোট যানবাহন চলাচল করায় যাত্রীবাহী বাসসহ বড় যানবাহনের চালকদের মারাত্মক সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন-সংগ্রাম করা হলেও সরকার ও প্রশাসন কার্যকর কোনও উদ্যোগ নেয়নি। ছোট যানবাহনের চলাচল বন্ধ না হওয়ায় দুর্ঘটনাও বাড়ছে। কিন্তু দেখে কেউ কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছে না।’
মোশারফ হোসেন বলেন, ‘মহাসড়কে ছোট যানবাহন চলাচলের সুযোগ দিতে হলে তাদের জন্য পৃথক লেন তৈরি করতে হবে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো সম্ভব। তা ছাড়া ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত সড়ক সরু হওয়ায় দুর্ঘটনা বাড়ছে। প্রতিনিয়ত ছোট যানবাহনের সংখ্যা বাড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। এ কারণে দ্রুত ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত মহাসড়ক প্রশস্ত করার দাবি জানাচ্ছি আমরা।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকার এখনই ছোট যানবাহন তৈরির কারখানাগুলো বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এগুলো দেশের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনবে। নগরী থেকে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে কারখানা গড়ে তুলে ছোট যানবাহন তৈরি করা হচ্ছে। এসব কারখানার অনেকগুলোর বৈধতা নেই। প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ছাড়াই চালকেরা এসব যানবাহন নিয়ে মহাসড়কে চলাচল করায় দুর্ঘটনা বাড়ছে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাঠপর্যায়ে কর্মরত ট্রাফিক পুলিশের দুজন সদস্য বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মদতে এসব যানবাহন চলাচল করে। মহাসড়কে গাড়ি আটক করা হলে সংশ্লিষ্ট নেতারা তদবির শুরু করেন। মাঝেমধ্যে তাদের দুর্ব্যবহারেরও শিকার হতে হয় আমাদের। এমনকি ট্রাফিক পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়। এজন্য বন্ধ করা যাচ্ছে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একই কথা বলেছেন হাইওয়ে পুলিশের এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘আগে আওয়ামী লীগের নেতারা এসব গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতো, চাঁদা নিয়ে মহাসড়কে চলাচলের সুযোগ করে দিতো। আটক করলে তদবির করে ছাড়িয়ে নিতেন। এখন বর্তমান সরকারের লোকজন ওই তদবির করছেন। তবে সরকার কঠোর অবস্থান নিলে এবং এসব যানবাহনের মদতদাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই মহাসড়ক থেকে অবৈধ ছোট যানবাহন সরানো সম্ভব। আবার যানবাহন আটক না করলে আমরা দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করছি বলে অভিযোগ তোলা হয়; আর আটক করলেই ঘুষ গ্রহণ ও বিটমানি সংক্রান্ত নানা অভিযোগ আনা হয়। আসলে বিটমানি কিংবা চাঁদা—এসবের সঙ্গে আমাদের কোনও সংশ্লিষ্টতা নেই। সরকারদলীয় নেতারা অনুরোধ করলে ছেড়ে দিতে হয় গাড়ি, তখন অভিযোগ তোলা হয় আমরা টাকা নিয়ে গাড়ি ছেড়ে দিয়েছি।’
যা বলছে বিআরটিএ
বরিশাল বিআরটিএর বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আতিকুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তিন চাকার যানবাহন তৈরির কারখানাগুলোতে একাধিকবার অভিযান চালানো হয়েছে। এতে অনেক কারখানা বন্ধ হয়েছে। মহাসড়কে এ ধরনের যানবাহন চলাচল ঠেকাতেও বিআরটিএ অভিযান পরিচালনা করে। এসব যানের কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে। এ কারণে ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে কঠোর অবস্থানে রয়েছি আমরা।’
৪০ হাজারের বেশি অবৈধ যান
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার আনিসুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বরিশাল নগরীর মধ্য দিয়ে ১১ কিলোমিটার মহাসড়ক গেছে। সেখানে বড় যানবাহনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অবৈধ ছোট যানবাহন চলাচল করে। এগুলোর চলাচল বন্ধে প্রায়ই অভিযান চালানো হচ্ছে। অবৈধ যানবাহন তৈরির কারখানায় অভিযান চালিয়েও সেগুলো বন্ধ করা হচ্ছে। তবু থামানো যায় না।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বরিশাল নগরীতে ৪০ হাজারের বেশি অবৈধ যানবাহন রয়েছে। এই থেকে ধারণা করা যায়, যেসব উপজেলার ওপর দিয়ে মহাসড়ক গেছে, সেখানেও অবৈধ ছোট যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে। এসব যানবাহনের কারণে মহাসড়কে দুর্ঘটনাও বাড়ছে। আমরা চেষ্টা করছি এগুলো যাতে মহাসড়কে উঠতে না পারে। তবু গোপনে কিংবা আমাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সুযোগ পেলেই মহাড়কে উঠে যায় এসব যান।’

