বাংলাদেশের রাজনীতিতে মন্ত্রিত্ব যেমন ক্ষমতা ও দায়িত্বের প্রতীক, তেমনি কখনো কখনো সেই দায়িত্বই হয়ে ওঠে পদত্যাগের কারণ। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা কেউ প্রশাসনিক সংকটের মুখে, কেউ বিতর্কিত বক্তব্যের কারণে, কেউবা রাজনৈতিক মতবিরোধ কিংবা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে পদ ছেড়েছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পদত্যাগ এসেছে জনসমালোচনা ও অভিযোগের চাপে, আবার কোথাও পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার পরও দায়িত্ব থেকে পুরোপুরি সরে যাওয়ার প্রক্রিয়া জটিল হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের ঘোষণা সেই পুরোনো প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে এনেছে—কোন পরিস্থিতিতে একজন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর জন্য পদে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে? দেশে ১৯৯১ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত নানা কারণে পদত্যাগ করা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের বিষয়ে আগামীর সময়ের পাঠকদের জন্য সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে।
১. সারসংকট ও কৃষকের অসন্তোষের মুখে পদত্যাগের নজির
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সংকটের দায় মন্ত্রিসভার সদস্যদের ওপর বর্তানোর নজির রয়েছে। ১৯৯১–১৯৯৬ মেয়াদে বিএনপি সরকারের সময় সারসংকট নিয়ে কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। সার সরবরাহের সংকট ও এ নিয়ে আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে শিল্পমন্ত্রী জহিরউদ্দিন খানের পদত্যাগের বিষয়টি আলোচনায় আসে তখন।
২. নীতিগত মতবিরোধে পদত্যাগের ঘটনা
সরকারের সঙ্গে নীতিগত মতপার্থক্য থেকেও মন্ত্রিসভার সদস্যদের পদত্যাগের নজির রয়েছে। নব্বইয়ের দশকে বিএনপি সরকারের তথ্যমন্ত্রী নাজমুল হুদা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে নিজের অবস্থানের কারণে আলোচনায় আসেন। এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে তার মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। পরে তাকে পদত্যাগ করতে বলা হয়।
নাজমুল হুদা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে তাকে তথ্যমন্ত্রী করা হয়েছিল। পরে ২০০১ সালে বিএনপি আবার ক্ষমতায় এলে যোগাযোগমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন তিনি।
৩. বস্তি উচ্ছেদ নিয়ে বিতর্কে প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগ
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ঢাকায় বস্তি উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হয়। এ ঘটনার পর গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আফসারউদ্দিন আহমদকে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ রয়েছে। বস্তি উচ্ছেদের মতো সামাজিকভাবে সংবেদনশীল বিষয়ে সরকারি সিদ্ধান্ত কীভাবে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে, ঘটনাটি তার একটি উদাহরণ। তিনি বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ছোট ভাই।
৪. পাসপোর্ট বিতর্কে সৈয়দ আবুল হোসেনের পদত্যাগ
১৯৯০-এর দশকে প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের পাসপোর্ট ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। ১৯৯৬ সালে গঠিত আওয়ামী লীগ সরকারে তিনি প্রথমবার স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। দুটি পাসপোর্ট রাখা এবং সরকারি কাজে সবুজ পাসপোর্ট ব্যবহারের বিষয়টি আলোচনায় আসার পর ১৯৯৭ সালে তার পদত্যাগের খবর প্রকাশিত হয়।
পরবর্তী সময়ে তিনি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ পুনরায় সরকার গঠন করলে শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভায় তিনি যোগাযোগ মন্ত্রী (বর্তমান সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী) হিসেবে দায়িত্ব পান। ওই সময়ে পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের তোলা দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ২০১১ সালের শেষ দিকে তাকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তিনি যোগাযোগ মন্ত্রী হিসেবে শেষ দায়িত্ব পালন করেছেন ৫ ডিসেম্বর ২০১১ পর্যন্ত। একই দিনে তাকে নবগঠিত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। আইসিটি মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরও বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য তাকে সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে দেওয়ার শর্ত বহাল রাখে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাংকের ঋণ সচল করার প্রচেষ্টায় তিনি ২৩ জুলাই ২০১২ তারিখে মন্ত্রিসভা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র জমা দেন, যা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গ্রহণ করেন।
৫. চীনের চাপে আমীর খসরুর পদত্যাগ
২০০১–২০০৬ মেয়াদে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে ঘিরে কয়েকটি ইস্যুতে আলোচনা ছিল। মন্ত্রী থাকাকালীন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের সঙ্গে তার মতবিরোধের বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছিল। ২০০৪ সালের ২৫ মার্চ আমীর খসরু পদত্যাগপত্র জমা দেন, সেদিনই তার পদত্যাগ কার্যকর হয়। পদত্যাগের পর তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী।
৬. নাইকোর গাড়ি বিতর্কে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগ
২০০৫ সালে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী এ কে এম মোশাররফ হোসেনকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয় কানাডীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান নাইকোর কাছ থেকে দামি গাড়ি গ্রহণের বিষয়টি সামনে আসার পর। এ ঘটনায় অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিতর্কের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। নির্দেশ অনুযায়ী, ১৮ জুন তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিলে তা গৃহীত হয়। যদিও তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
৭. ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে সোহেল তাজের পদত্যাগ
২০০৯ সালে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তানজিম আহমেদ সোহেল তাজ দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় পাঁচ মাসের মধ্যে পদত্যাগপত্র জমা দেন। তিনি ব্যক্তিগত কারণ উল্লেখ করেছিলেন। তবে মন্ত্রণালয়ের কাজে হস্তক্ষেপ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে মতবিরোধের কথাও বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে আসে তখন। তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ নিয়ে দীর্ঘদিন জটিলতা ছিল। পরে ২০১২ সালে তিনি সংসদ সদস্যপদ থেকেও পদত্যাগ করেছিলেন।
৮. অর্থ উদ্ধারের ঘটনায় সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের পদত্যাগ
২০১২ সালে রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে ঘিরে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়। তার সহকারী একান্ত সচিব ও রেল কর্মকর্তাদের বহনকারী একটি গাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ উদ্ধারের খবর প্রকাশিত হলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়। এ পরিস্থিতিতে সুরঞ্জিত পদত্যাগের ঘোষণা দেন এবং নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে সরে দাঁড়ানোর কথা বলেন। তবে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দিলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রিসভায় রেখেছিলেন।
৯. বিতর্কিত বক্তব্যের পর লতিফ সিদ্দিকীর মন্ত্রিত্ব হারানো
২০১৪ সালে তৎকালীন মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী যুক্তরাষ্ট্রে এক অনুষ্ঠানে হজ ও তাবলিগ জামাত নিয়ে মন্তব্য করে বিতর্কের মুখে পড়েন। তার বক্তব্যের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অঙ্গনে সমালোচনা তৈরি হয়। পরে তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়া হয়। ২০১৫ সালে তিনি সংসদ সদস্যপদ থেকেও পদত্যাগ করেন।
১০. বক্তব্য ও আচরণ নিয়ে বিতর্কে ডা. মুরাদ হাসানের পদত্যাগ
২০২১ সালে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান বিতর্কিত বক্তব্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কথোপকথন নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েন। পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা বাড়লে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে পদত্যাগ করতে বলেন। ৭ ডিসেম্বর ২০২১ তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন।
১১. ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের ঘোষণা
সবশেষ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে ঘিরে বিতর্কের সূত্রপাত হয় ঢাকার গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানের সময় তাঁর আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের একটি ভিডিও নিয়ে। ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়। এ ঘটনায় পুলিশি তদন্তের উদ্যোগ নেওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়।
গত ১৮ অক্টোবর রাতে তাঁর পদত্যাগ নিয়ে খবর ছড়িয়ে পড়লেও তার পাঠানো বার্তায় পদত্যাগের খবর অস্বীকার করা হয়েছিল। পরদিন, ১৯ অক্টোবর জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক নিজেই প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চাওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী এতে সম্মতি দিয়েছেন।