Image description

‘অস্ত্র হাতে’ মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে সমালোচনার জেরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন। সোমবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে পদত্যাগের ঘোষণা দেন ইশরাক। এরপর তিনি পদত্যাগপত্র মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দেন। তার পদত্যাগপত্র পাওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্র। এর আগে শনিবার নিজ সংসদীয় আসন গেন্ডারিয়ায় মাদকের আস্তানায় অস্ত্র হাতে অভিযান চালান ইশরাক। এ খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। রোববার বিকালে মন্ত্রিপরিষদ বৈঠক শেষে প্রতিমন্ত্রী ইশরাককে ডেকে নিয়ে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরপর রাতে পদত্যাগের নির্দেশের খবরটিকে অস্বীকার করলেও সকালে অডিওবার্তা দিয়ে পদত্যাগের ঘোষণার কথা জানান ইশরাক। এদিকে বিতর্কের জেরে বিএনপি সরকারের আট মাসে দু’জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও একজন সংসদ সদস্য পদত্যাগ করলেন। এর আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসি আহমেদ মিষ্টি পদত্যাগ করেন।

সরকার যাতে বিব্রত না হয় সেজন্য পদত্যাগের সিদ্ধান্ত
এদিকে সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক হোসেন বলেন, তার কারণে বিএনপি বা সরকার যাতে বিব্রত না হয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কাজ আড়ালে পড়ে না যায়, সেজন্যই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চাওয়ার পাশাপাশি তিনি মাদক নির্মূলে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতিও চেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তাতে সম্মতি দিয়েছেন বলেও জানান ইশরাক। দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে কয়েকশ’ নেতাকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার পুত্র ইশরাক।

মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে
ইশরাক হোসেন জানান, গত ১৭ই অক্টোবর গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান সমন্বয় করতে গিয়ে তিনি নিজের নিরাপত্তার জন্য বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে অভিযানটির মূল উদ্দেশ্য আড়ালে পড়ে যায়। তিনি বলেন, গণমাধ্যমের ভূমিকায় আমি হতাশ হয়েছি, কেন আমাকে এভাবে টার্গেট করা হলো? ইশরাক বলেন, আমি মনে করছি যে আমার এই মাদকের বিরোধী অভিযান কেবলমাত্র শুরু হলো, এটি চলমান থাকবে। যতদিন চলমান থাকবে, আমার কারণে যাতে আপনার কোনো কর্মকাণ্ড ম্লান হয়ে না যায়, ঢাকা না পড়ে যায়, আমার দল যাতে কোনো কারণে বিব্রত না হয়। বিএনপি’র আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির সদস্য ইশরাক বলেন, ঢাকা-৬ আসনের গেন্ডারিয়া এলাকার ঘুণ্টিঘর ও মুন্সিরটেক এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক কেনাবেচা চলছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা বারবার তার কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ করেছেন। মাদক বিক্রির পাশাপাশি এলাকাটি বিভিন্ন ধরনের মাদক সরবরাহের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল বলে দাবি করেন তিনি। ইশরাকের ভাষ্য, দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি স্থানীয় থানা-পুলিশের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন।

তিনি বলেন, ঘুণ্টিঘর এলাকায় একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের প্রস্তাবও দেয়া হয়েছিল। এজন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আধা-সরকারি পত্র পাঠানো এবং ফাঁড়ির জন্য জায়গা নির্ধারণের উদ্যোগ নেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। ইশরাকের দাবি, গত ১৮ই সেপ্টেম্বরের একটি বৈঠকে স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে এলাকাটিতে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়। সেই সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় ১৭ই অক্টোবর অভিযান চালানো হয়। অভিযানে যাওয়ার আগে পুলিশকে জানানো হয়েছিল বলে দাবি করেন ইরশাক। তবে অভিযানের বিস্তারিত তথ্য আগেভাগে জানালে তা ফাঁস হয়ে যেতে পারে- এমন আশঙ্কায় শেষ মুহূর্তে সংশ্লিষ্টদের খবর দেয়া হতো বলে তার ভাষ্য।

অস্ত্র হাতে অভিযানের ব্যাখ্যা
অস্ত্র হাতে অভিযানের ব্যাখ্যা দিয়ে ইশরাক বলেন, ঘুণ্টিঘর এলাকায় প্রবেশের পর একদল লোককে ছোটাছুটি করতে দেখেন তারা। এ সময় নিজের নিরাপত্তার জন্য তিনি লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নেন। তার দাবি, পরে প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে এলাকায় হেঁটে বিভিন্ন স্থানে মাদক বিক্রি ও সেবনের চিত্র দেখতে পান। কয়েকটি ভবনে ঢুকে পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতিতে ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোনভর্তি একটি স্কুলব্যাগ, প্রায় ৩০০ গ্রাম হেরোইন, কয়েক বোতল মদ এবং দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এসব সামগ্রী কোথা থেকে এসেছে, তা নিয়ে সেখানে থাকা ব্যক্তিরা সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি বলে দাবি করেন ইশরাক। অভিযানের পর ৬ জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় বলেও জানান তিনি। ইশরাক হোসেন বলেন, কাউকে নিজের হাতে শাস্তি দেয়া তাদের উদ্দেশ্য ছিল না। বরং অভিযানে যাদের পাওয়া গেছে, তাদের পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে আইন অনুযায়ী বিচারের মুখোমুখি করাই ছিল লক্ষ্য। তিনি দাবি করেন, অস্ত্রটি তিনি কাউকে ভয় দেখানো বা হুমকি দেয়ার জন্য ব্যবহার করেননি। নিজের নিরাপত্তার জন্য অল্প সময়ের জন্য হাতে রেখেছিলেন। তার বক্তব্য, অস্ত্র হাতে থাকার দৃশ্যটি সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যাতে মাদকবিরোধী অভিযানের মূল উদ্দেশ্য আড়ালে চলে যায়।

এক প্রশ্নের জবাবে ইশরাক বলেন, তার নামে দু’টি আগ্নেয়াস্ত্রের বৈধ লাইসেন্স রয়েছে- একটি পিস্তল ও একটি রাইফেল। অভিযানের সময় দ্বিতীয় অস্ত্রটি লাইসেন্সধারী এক সহকর্মীর কাছে রাখা হয়েছিল।

মেয়র নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত
ঢাকার মেয়র পদে ভবিষ্যতে নির্বাচন করার সম্ভাবনা নিয়েও আরেক প্রশ্নের জবাবে ইশরাক বলেন, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার বিএনপি ও দলের প্রধান তারেক রহমানের। ২০২০ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, নগরীর বিভিন্ন সমস্যা এবং সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের ঘাটতি নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। দল চাইলে মেয়র পদে নির্বাচন করতে তিনি প্রস্তুত। আবার দল অন্য কাউকে মনোনয়ন দিলেও তার পক্ষে কাজ করবেন তিনি।

প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব ছাড়লেও মাদকবিরোধী কার্যক্রম বন্ধ করবেন না বলে ঘোষণা দেন ইশরাক। তিনি বলেন, ঢাকা-৬ আসনসহ আশপাশের এলাকায় মাদক নির্মূল এবং জনজীবনের অন্যান্য সমস্যা নিয়ে কাজ করতে চান। তার বক্তব্য, মাদকের সরবরাহব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে এর বিস্তার কমানো সম্ভব। এ জন্য মাদকের মূল সরবরাহকারীদের শনাক্ত করতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে ইশরাক বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, মাদকবিরোধী যুদ্ধ শুরু করেছ, চালিয়ে যাও।

সংবাদ সম্মেলন শেষে নিচে নেমে দলীয় নেতাকর্মীদের ভিড়ের মধ্যে গাড়িতে ওঠেন ইশরাক। পরে গাড়ি থেকে আবারো তাদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেন। এরপর ছাদখোলা গাড়িতে করে স্লোগান দিতে দিতে প্রেস ক্লাব এলাকা ছাড়েন ইশরাক।