Image description

বাবার উত্তরাধিকার হয়ে ইশরাক হোসেনের রাজনীতিতে আসা হুট করেই; বিএনপির রাজনীতিতে সম্ভাবনাময় তরুণ মুখ হিসেবে দেখা হয় তাকে। সেই পথ ধরে তরতরিয়ে চলতে থাকে ইশরাকের রাজনীতির গতিপথ। প্রথমে মেয়র প্রার্থী হন, তারপর প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়েই পান প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব। কিন্তু এর মধ্যে নানা ঘটনায় বিতর্ককেও সঙ্গী করে নেন তিনি। এমনই এক বিতর্কে মন্ত্রিসভা ছাড়তে হলো তাকে।

অবিভক্ত ঢাকার সর্বশেষ মেয়র, বিএনপির প্রভাবশালী নেতা সাদেক হোসেন খোকার মৃত্যুর পর সক্রিয় রাজনীতিতে নামেন ইশরাক। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৮ সালে সক্রিয় হওয়ার পর অল্প সময়েই বিএনপির সর্বোচ্চ পর্যায়ের আস্থা পেয়ে যান তিনি। ফলও পেয়েছিলেন নগদে। ২০২০ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তাকে মেয়র প্রার্থী করে দল।

এরপর দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটিতেও পেয়েছিলেন পদ। সবশেষ গত ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসন থেকে নির্বাচন করে জয়ী হন। এরপর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে।

গত শনিবার নিজের নির্বাচনী এলাকা পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ায় অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে নেমে বিতর্কে পড়েন ইশরাক। ব্যাপক সমালোচনা ওঠায় অস্বস্তি ও অসন্তোষ দেখা দেয় তার দল ও সরকারে। এরপর গতকাল রবিবার ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নানা নাটকীয়তার পর সেই সিদ্ধান্ত মেনে আজ সোমবার সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিমন্ত্রিত্ব ছাড়ার ঘোষণা দেন তিনি।

এমন বিতর্ক ইশরাকের জন্য নতুন নয়। দলের দুঃসময়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে জনপ্রিয়তা পেলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে তিনি একের পর এক কাজে বিতর্ক তৈরি করছিলেন।

ডিএসসিসি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা

২০২০ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ছিলেন ইশরাক। বিতর্কিত ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপসকে জয়ী ঘোষণা করা হয়। তখন ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে আইনি লড়াই শুরু করেন ইশরাক।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ তাকে ডিএসসিসির মেয়র ঘোষণা করেন নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল। পরে এ বিষয়ে গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু শপথ পড়ানো নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয় তার।

 

২০২৫ সালের ১৫ মে ডিএসসিসি কার্যালয় অবরুদ্ধ করে বিক্ষোভ করেন ইশরাক সমর্থকরা

পরে বিষয়টি গড়ায় উচ্চ আদালতে। শপথগ্রহণে ব্যবস্থা করার দাবিতে ২০২৫ সালের মে মাসে নগর ভবন ঘেরাও করেন ইশরাকের সমর্থকরা। একপর্যায়ে নগর ভবনের ফটকে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে নাগরিক সেবা বন্ধ করে দেন তারা।

ওই সময় সরকার শপথের ব্যবস্থা না করলে নিজেই শপথ নিয়ে মেয়রের চেয়ারে বসবেন বলে ঘোষণা দেন। এই ঘোষণার পর তাকে নিয়ে অনেককেই হাস্যরস করতে দেখা যায়। শেষ পর্যন্ত বিএনপির উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে আন্দোলন প্রত্যাহার করেন।

রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে হট্টগোল

গত ৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

অনুষ্ঠানে প্রচারিত একটি ডকুমেন্টারিতে জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতা সঠিকভাবে তুলে না ধরার অভিযোগ তোলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা। তা নিয়ে বাগ্‌বিতণ্ডা হয় এবং এনসিপি নেতারা অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন।

গত ৫ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অনুষ্ঠানে ইশরাকের বক্তব্যে বেড়ে যায় হট্টগোল

এমন পরিস্থিতিতে ইশরাক মেজাজ হারিয়ে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তোলেন। সেখানে তিনি বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বললেন, ‘আপনারা কি নিজেদের জাহির করার জন্য এসেছেন? ডকুমেন্টারি দেখানোর জন্য এসেছেন? কী করছেন আপনারা? শহীদদের জন্য কী করেছেন? শহীদদের জন্য আপনারা কিছুই করেননি।’ তার এ বক্তব্যের পর উত্তেজনা আরও বাড়ে।

‘চতুর্থ বাহিনী’র প্রধান

গত ২৭ জুলাই সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাকও।

সেখানে প্রটোকল ভেঙে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনীর নবনিযুক্ত প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম এবং বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খানের সঙ্গে একই সারিতে দাঁড়িয়ে স্যালুট দেন তিনি।

গত ২৭ জুলাই স্মৃতিসৌধে তিন বাহিনী প্রধানের সঙ্গে দাঁড়িয়ে স্যালুট দেন ইশরাক হোসেন

পরে বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় সমালোচনা। ওই সময় তার স্যালুট দেওয়ার ভঙ্গি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন কেউ কেউ। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই তাকে ‘চতুর্থ বাহিনীর প্রধান’ বলে ট্রল করেন।

পরে এই বিষয়ে এক ফেসবুক পোস্টে ইশরাক লেখেন, ‘বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কথা উঠলে শ্রদ্ধায় আমার হাত স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্যালুটে উঠে যায়। আমার হাত দিয়ে আমি বীর শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্যালুট দিয়েছি। হাত আমার, সম্মান জানিয়েছি সর্বজনশ্রদ্ধেয় বীরদের। দেশ আমার গণতান্ত্রিক; আমার ইচ্ছায় আমি স্যালুট দিয়েছি। যতবার ইচ্ছা হবে, যখন ইচ্ছা হবে, আমি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্যালুট জানাব।’

দলীয় কর্মসূচিতে হট্টগোল ও ঠেলাঠেলি

গত বছরের ২১ ডিসেম্বরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মের নবগঠিত কমিটির নেতারা গিয়েছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সমাধিতে ফুল দিতে। সেদিন সেখানে ধাক্কাধাক্কিতে জড়ান ইশরাক। ধাক্কাধাক্কির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে নেটিজেনদের সমালোচনার মুখে পড়েন ঢাকা-৬ আসনের এ সংসদ সদস্য।

পরদিন ২২ ডিসেম্বর নিজের ফেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে ধাক্কাধাক্কির বিষয়ে নেতাকর্মীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে ঘটনার ব্যাখ্যা দেন। তিনি লেখেন, ‘পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হয়েছিল, প্রোটোকল অনুসারে শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথির দুই পাশে নবগঠিত প্রজন্ম কমিটির আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব অবস্থান করবেন, যা পরবর্তীতে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হবে। পুরো কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের ব্যাপক আগ্রহ ও জনসমাগম থাকায়, সিরিয়াল ঠিক করার সময় আমাকে কিছুটা কঠোর অবস্থান নিতে হয়।’

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সমাধিতে ফুল দিতে গিয়ে ধাক্কাধাক্কিতে জড়ান ইশরাকতিনি আরও লেখেন, ‘আহ্বায়ক হিসেবে কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা এবং তাদের স্বস্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমার দায়িত্ব। তাই ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও দেখে কেউ মনোকষ্ট পেয়ে থাকলে, আমি আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।’

এরপর গত ২৬ জুলাই জিয়ার মাজারে ফুল দেওয়ার সময় ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন ইশরাক। পরে বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়, মাজারে শ্রদ্ধা জানাতে যাওয়া নেতাকর্মীদের ভিড় এবং বিশৃঙ্খলার কারণে সেখানে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি ও ধাক্কাধাক্কির সৃষ্টি হয়, যেখানে প্রতিমন্ত্রী ইশরাকও ধাক্কা খান।

বিরোধী দলের ‘পতন’ ঘটানোর হুমকি

গত ২৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে বক্তৃতায় বিরোধী দলের পতন ঘটানোর হুমকি দেন। ইশরাক বলেন, ‘বিরোধী দল যদি সরকার পতন করার হুমকি দেয়, তাহলে বিরোধী দলের পতন ঘটানো হবে।’ তার এই বক্তব্য হাস্যরসের জন্ম দেয় সংসদে ও সংসদের বাইরে।

২৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে বক্তৃতাকালে বিরোধী দলকে পতনের হুমকি দেন ইশরাক

আজ সোমবার ইশরাকের পদত্যাগের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই লিখেছেন, বিরোধী দলের পতনের ডাক দিয়ে নিজের পতন নিশ্চিত করলেন ইশরাক।

পদত্যাগের নির্দেশ ‘গুজব’ বলে দাবি

গতকাল রবিবার ইশরাককে মন্ত্রিপরিষদ থেকে পদত্যাগ করার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংবাদমাধ্যমে এ তথ্য প্রকাশ হওয়ার পর বিষয়টি অস্বীকার করেন ৩৯ বছর বয়সী এই বিএনপি নেতা। তিনি দাবি করেন, মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার খবরটি ‘অসত্য ও বিভ্রান্তিকর’।

রবিবার রাতে ইশরাকের পক্ষে তার প্রেস কর্মকর্তা মাহফুজ কবির মুক্তা স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়, ইশরাক হোসেন তার সরকারি ও রাজনৈতিক দায়িত্ব নিষ্ঠা ও সুনামের সঙ্গে পালন করে যাচ্ছেন। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে তাকে পদত্যাগের কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি। তার পদত্যাগেরও কোনো প্রশ্ন নেই। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল ও জনসাধারণের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াতে একটি মহল এ ধরনের মিথ্যা তথ্য প্রচার করছে।

রাতভর নাটকীয়তার পর আজ সোমবার সকালে পদত্যাগ করবেন বলে জানান ইশরাক। সকালে ফেসবুক পোস্টে তিনি বলেন, ‘আজ দুপুর ২টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগের চূড়ান্ত ঘোষণা দেব।’ কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তার পরস্পরবিরোধী বক্তব্য নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা হয় সোশ্যাল মিডিয়ায়।