সৌদি আরবের মক্কায় একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজের’ দায়ে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। কিন্তু ঠিক কী ঘটেছিল, তাদের বিরুদ্ধে কী প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছিল এবং তারা কী ধরনের আইনি সহায়তা পেয়েছিলেন—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
গত ১৪ অক্টোবর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুজন হলেন নাজেরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আক্তার। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতির বরাতে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, আদালত তাদের ‘তা’জির’ বা বিচারকের বিবেচনাধীন শাস্তির আওতায় মৃত্যুদণ্ড দেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও রাজকীয় নির্দেশের পর তা কার্যকর করা হয়।
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট জানিয়েছে, দণ্ড কার্যকরের আগে তাদের অবহিত করা হয়নি। সৌদি কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত বিবৃতিতে নির্দিষ্ট কাজটির বিবরণ, মসজিদের পরিচয় কিংবা তাঁদের গ্রেপ্তারের সময়ও উল্লেখ ছিল না।
১৮ অক্টোবর বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সৌদি রাষ্ট্রদূতের কাছে ব্যাখ্যা চায়। মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ মিশন বা মন্ত্রণালয়কে বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে আগে জানানো হয়নি; মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর ঢাকা বিষয়টি জানতে পারে।
এর আগে ২০১১ সালে ডাকাতি এবং মিসরীয় এক নিরাপত্তা প্রহরীকে হত্যার দায়ে ৮ বাংলাদেশীর প্রকাশ্য শিরশ্ছেদ করে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করেছে সৌদি আরব।
তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রেকর্ড সংখ্যক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, যার একটি বড় অংশই বিদেশি বা প্রবাসী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে।
গত ১০ বছরের সৌদিতে মৃত্যুদণ্ডের পরিসংখ্যান
২০২৫ সালের ৭ জুলাই এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের একটি রিপোর্টে সৌদি আরবের সরকারি সংবাদ সংস্থার সূত্রে বলা হয়, ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত দেশটিতে ১ হাজার ৮১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
এই সময়ে শুধু মাদকসংক্রান্ত অপরাধে ৫৯৭ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়, যা মোট সংখ্যার প্রায় ৩২.৯%। তাদের প্রায় ৭৫% ছিলেন বিদেশি নাগরিক। বাকি ১ হাজার ২১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল হত্যা, ‘সন্ত্রাসবাদসংক্রান্ত’ অপরাধ, রাষ্ট্রদ্রোহ, ধর্ষণ, অপহরণ, সশস্ত্র ডাকাতি এবং অন্যান্য একক বা সম্মিলিত অভিযোগে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ৭ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত বিবৃতি অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত সৌদি আরবে অন্তত ১৭৫ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। তাদের মধ্যে ৯৪ জন ছিলেন বিদেশি নাগরিক, যারা ২০টিরও বেশি দেশের। প্রকাশিত সংখ্যা দুটির ভিত্তিতে বিদেশিদের অনুপাত প্রায় ৫৩.৭%।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ১৩ জানুয়ারি ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সৌদি আরবে অন্তত ৩৫৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ শুরুর পর এক বছরে এটিই সর্বোচ্চ সংখ্যা। রিপ্রিভ ও ইউরোপিয়ান সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটসের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, তাঁদের মধ্যে ২৪০ জনকে প্রাণহানি ঘটেনি এমন মাদকসংক্রান্ত অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এই ২৪০ জনের মধ্যে ১৮৮ জন, অর্থাৎ প্রায় ৭৮ শতাংশ ছিলেন বিদেশি নাগরিক। শুধু গাঁজাসংক্রান্ত অভিযোগে ৯৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।
২০২৪ সালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় ৩৪৫ জনের। ইউরোপিয়ান সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটসের হিসাবে, তাঁদের মধ্যে সৌদি নাগরিক ছিলেন ২০৭ জন বা ৬০.০% এবং বিদেশি ১৩৮ জন বা ৪০.০%। অ্যামনেস্টির বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাদকসংক্রান্ত অপরাধে ১২২ জন, হত্যার দায়ে ১৩৯ জন, ‘সন্ত্রাসবাদসংক্রান্ত’ অপরাধে ৫০ জন এবং হত্যার সঙ্গে অন্য অপরাধের দায়ে ২৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।
২০২৩ সালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ১৭২ জনের মধ্যে সৌদি নাগরিক ছিলেন ১৩৪ জন বা ৭৭.৯% এবং পরিচিত জাতীয়তার বিদেশি নাগরিক ৩৭ জন বা ২১.৫%; একজনের জাতীয়তা অজ্ঞাত ছিল। শুধু হত্যার দায়ে ১০৫ জন, ‘সন্ত্রাসবাদসংক্রান্ত’ অপরাধে ২৫ জন, হত্যা ও মাদকের দায়ে ১০ জন, হত্যা ও ডাকাতির দায়ে ছয়জন, অপহরণ ও ধর্ষণের দায়ে চারজন এবং শুধু মাদকসংক্রান্ত অপরাধে দুজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। অন্যদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, রাষ্ট্রদ্রোহসহ বিভিন্ন সম্মিলিত অভিযোগ ছিল।
২০২২ সালে সৌদি মানবাধিকার কমিশনের হিসাবে ১৯৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। তাঁদের মধ্যে ‘সন্ত্রাসবাদসংক্রান্ত’ অপরাধে ৮৫ জন এবং মাদকসংক্রান্ত অপরাধে ৫৭ জন দণ্ডিত হন। তবে সৌদি প্রেস এজেন্সির প্রকাশিত বিস্তারিত তালিকায় ছিল ১৪৮ জনের তথ্য। ওই তালিকায় সৌদি নাগরিক ছিলেন ১১২ জন বা ৭৫.৭% এবং বিদেশি ৩৬ জন বা ২৪.৩%। বাকি ৪৮ জনের জাতীয়তার তথ্য পাওয়া যায়নি।
২০২১ সালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় ৬৫ জনের। তাঁদের মধ্যে বিদেশি ছিলেন ১৮ জন বা ২৭.৭%; অবশিষ্ট ৪৭ জন বা ৭২.৩% সৌদি নাগরিক। হত্যা কিংবা হত্যার সঙ্গে অন্য অপরাধের দায়ে ৫২ জন এবং ‘সন্ত্রাসবাদসংক্রান্ত’ অপরাধে নয়জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। অন্য ঘটনায় রাষ্ট্রদ্রোহসহ অভিযোগ ছিল। ওই বছর মাদকসংক্রান্ত অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য পাওয়া যায়নি।
২০২০ সালে সৌদি মানবাধিকার কমিশন ২৭ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য জানায়। তবে অ্যামনেস্টি ২৫ জনের বিস্তারিত তথ্য যাচাই করতে পেরেছিল। এই ২৫ জনের মধ্যে ১৬ জন বা ৬৪.০% সৌদি এবং নয়জন বা ৩৬.০% বিদেশি নাগরিক ছিলেন। হত্যার দায়ে ১৯ জন, মাদকসংক্রান্ত অপরাধে পাঁচজন এবং ‘সন্ত্রাসবাদসংক্রান্ত’ অপরাধে একজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।
২০১৯ সালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় ১৮৪ জনের। তাঁদের মধ্যে ৮৮ জন বা ৪৭.৮% সৌদি এবং পরিচিত জাতীয়তার বিদেশি ছিলেন ৯৩ জন বা ৫০.৫%; তিনজনের জাতীয়তা জানা যায়নি। মাদকসংক্রান্ত অপরাধে ৮৪ জন, হত্যার দায়ে ৫৫ জন, ‘সন্ত্রাসবাদসংক্রান্ত’ অপরাধে ৩৭ জন, ধর্ষণের দায়ে পাঁচজন, মারধর ও ধর্ষণের দায়ে দুজন এবং সশস্ত্র ডাকাতি ও ধর্ষণের দায়ে একজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।
২০১৮ সালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ১৪৯ জনের মধ্যে সৌদি নাগরিক ছিলেন ৭১ জন বা ৪৭.৭% এবং পরিচিত জাতীয়তার বিদেশি নাগরিক ৭৫ জন বা ৫০.৩%। তিনজনের জাতীয়তা অজ্ঞাত ছিল। হত্যার দায়ে ৮৫ জন এবং মাদকসংক্রান্ত অপরাধে ৬০ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। সশস্ত্র ডাকাতি, অপহরণ ও নির্যাতন, ‘সন্ত্রাসবাদ’ এবং ধর্ষণের দায়ে একজন করে দণ্ডিত হন।
২০১৭ সালে ১৪৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। সৌদি নাগরিক ছিলেন ৮৯ জন বা ৬১.০%, বিদেশি নাগরিক ৫৬ জন বা ৩৮.৪%; একজনের জাতীয়তা জানা যায়নি। হত্যার দায়ে ৭৮ জন, মাদকসংক্রান্ত অপরাধে ৫৯ জন, ‘সন্ত্রাসবাদসংক্রান্ত’ অপরাধে চারজন, অপহরণ ও নির্যাতনের দায়ে দুজন, ধর্ষণের দায়ে দুজন এবং ‘জাদুবিদ্যা ও ব্যভিচার’সংক্রান্ত সম্মিলিত অভিযোগে একজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।
২০১৬ সালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ১৫৪ জনের মধ্যে ১১৮ জন বা ৭৬.৬% সৌদি এবং ৩৬ জন বা ২৩.৪% বিদেশি নাগরিক ছিলেন। তাঁদের মধ্যে হত্যার দায়ে ৮১ জন, ‘সন্ত্রাসবাদসংক্রান্ত’ অপরাধে ৪৭ জন, মাদকসংক্রান্ত অপরাধে ২৪ জন এবং অপহরণ ও নির্যাতন এবং ধর্ষণের দায়ে একজন করে দণ্ডিত হন।
২০১৫ সালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় ১৫৮ জনের। তাঁদের মধ্যে সৌদি নাগরিক ছিলেন ৮৫ জন বা ৫৩.৮% এবং বিদেশি ছিলেন ৭৩ জন বা ৪৬.২%। হত্যার দায়ে ৮৪ জন, মাদকসংক্রান্ত অপরাধে ৬৪ জন, অপহরণ, নির্যাতন এবং/অথবা ধর্ষণের অভিযোগে ছয়জন এবং সশস্ত্র ডাকাতির দায়ে চারজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ২০১৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বছর সৌদি আরবে অন্তত ৯০ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। তাঁদের মধ্যে ৫৩ জন বা ৫৮.৯% সৌদি এবং ৩৭ জন বা ৪১.১% বিদেশি নাগরিক ছিলেন। মাদকসংক্রান্ত অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় ৪২ জনের। অন্যদের অভিযোগের মধ্যে হত্যা, অপহরণ, নির্যাতন, ধর্ষণ ও ‘জাদুবিদ্যা’ ছিল।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর অধিকাংশই এশিয়া ও আফ্রিকার নাগরিক
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে এশিয়া ও আফ্রিকার নাগরিকদের প্রাধান্য দেখা যায় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রকাশিত তথ্যে।
সংস্থাটির ২০২৩ সালের মৃত্যুদণ্ডবিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বছর দেশটিতে ১৭২ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। জাতীয়তার তালিকা থেকে হিসাব করলে, তাদের মধ্যে সৌদি নাগরিকসহ ১৬৪ জন এশিয়ার এবং ছয়জন আফ্রিকার নাগরিক ছিলেন। অর্থাৎ এই দুই অঞ্চলের নাগরিক ছিলেন প্রায় ৯৯ শতাংশ।
অন্য দুজনের একজন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক; আরেকজনের জাতীয়তা জানা যায়নি। তালিকায় ইউরোপের কোনো দেশের নাগরিকের উল্লেখ নেই। তবে এশিয়ার ১৬৪ জনের মধ্যে ১৩৪ জনই সৌদি নাগরিক। অন্যদের মধ্যে বাংলাদেশ ও ইয়েমেনের আটজন করে, ভারত ও পাকিস্তানের চারজন করে এবং বাহরাইনের দুজন ছিলেন। জর্ডান, ফিলিস্তিন, ফিলিপাইন ও নেপালের ছিলেন একজন করে। আফ্রিকার নাগরিকদের মধ্যে মিসর ও সুদানের দুজন করে এবং ইথিওপিয়া ও ঘানার একজন করে ছিলেন।
দীর্ঘ সময়ের মাদকসংক্রান্ত মামলার হিসাবেও এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের উপস্থিতি রয়েছে। অ্যামনেস্টির Saudi Arabia’s Execution Crisis প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত শুধু মাদকসংক্রান্ত অপরাধে ৫৯৭ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। তাদের প্রায় ৭৫ শতাংশই ছিলেন বিদেশি নাগরিক।
এই ৫৯৭ জনের মধ্যে পাকিস্তানের ১৫৫ জন এবং সৌদি আরবের ১৫০ জন ছিলেন। এ ছাড়া সিরিয়ার ৬৬ জন, জর্ডানের ৫০ জন, ইয়েমেনের ৩৯ জন, মিসরের ৩৩ জন, নাইজেরিয়ার ৩২ জন, সোমালিয়ার ২২ জন এবং ইথিওপিয়ার ১৩ জন ছিলেন। অবশিষ্ট ৩৭ জন অন্যান্য জাতীয়তার।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১৬ আগস্ট মার্কিন নাগরিক বিশয় শরিফ নাজি নাসিফের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে সৌদি কর্তৃপক্ষ। বাবাকে হত্যার দায়ে তাঁকে দণ্ড দেওয়া হয়েছিল বলে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়।
প্রবাসীদের বিচারিক হয়রানি: না-বোঝা ভাষায় স্বীকারোক্তি, আইনজীবী ছাড়াই মৃত্যুদণ্ড
সৌদি আরবে প্রবাসীদের বিচারপ্রক্রিয়ায় ভাষাগত বাধা, আইনজীবীর অভাব এবং নির্যাতনের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অনুসন্ধানে এমন ঘটনাও পাওয়া গেছে, যেখানে অভিযুক্ত ব্যক্তির আপত্তি বা অস্বীকারের বক্তব্য ক্ষমা চাওয়ার বক্তব্য হিসেবে অনুবাদ করা হয়েছে কিংবা সাজা শেষ হওয়ার পরও তাকে মাসের পর মাস কারাগারে রাখা হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২৮ জুলাই ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাদকসংক্রান্ত অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া পাঁচ ইথিওপীয় নাগরিককে তিন বছরের বেশি আটক রাখা হয়েছিল। তারা আরবি বুঝতেন না, কিন্তু তাদের আরবি নথিতে সই করতে বাধ্য করা হয়। এমনকি তাদের কোনো আইনজীবীর সুবিধাও দেওয়া হয়নি। এমনকি আপিলের সুযোগ ও দেওয়া হয়নি।
এ ধরনের অভিযোগ নতুন নয়। সংস্থাটির ২০১৮ সালের ‘Caught in a Web’ গবেষণায় ২১ পাকিস্তানি অভিযুক্তের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করা হয়। তাদের মধ্যে একজন ছাড়া কারও আইনজীবী ছিল না। নয়জন জানান, রায়ের বিষয়বস্তু পড়া বা বোঝার সুযোগ না দিয়েই তাদের সম্মতি কিংবা আঙুলের ছাপ নেওয়া হয়েছিল। তিনজন অভিযোগ করেন, তারা অভিযোগ অস্বীকার করলেও দোভাষী বিচারককে বলেছেন, তারা ক্ষমা চাইছেন। এক সাবেক বন্দী বলেন, “আমাদের কথা না শুনেই তিনি সাজা দিয়ে দিলেন।”
নির্যাতনের অভিযোগ জানালেও প্রতিকার মেলেনি—এমন উদাহরণ জর্ডানের নাগরিক হুসেইন আবু আল-খায়ের। অ্যামনেস্টির তথ্য অনুযায়ী, তিনি আদালতে একাধিকবার বলেছিলেন, মারধরের মাধ্যমে তার স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়েছে। তার দাবি ছিল, তাকে এতটা মারধর করা হয়েছিল যে কলম ধরতেও পারছিলেন না। তারপরও সেই স্বীকারোক্তি দণ্ডের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ২০২৩ সালের মার্চে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। সংস্থাটির পর্যালোচিত বিদেশি নাগরিকদের মামলায় কার্যকর দোভাষী, আইনজীবী ও কনস্যুলার সহায়তার ঘাটতিও পাওয়া যায়।
পাচার বা জবরদস্তির শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষার বদলে শাস্তি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। গ্লোবাল ডিটেনশন প্রজেক্টের ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, কিছু ইথিওপীয়কে হুমকি দিয়ে বা যাত্রাপথের খাবার, আশ্রয় ও পরিবহনের ওপর নির্ভরতার সুযোগ নিয়ে মাদক বহনে বাধ্য করার তথ্য রয়েছে। কিন্তু তাদের মামলায় পাচারের লক্ষণ যথাযথভাবে যাচাই কিংবা নিয়োগকারী ও লাভবান চক্রকে শনাক্ত করার গুরুতর প্রচেষ্টার তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে ইউরোপিয়ান সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস।
একই প্রতিবেদনে অভিবাসনসংক্রান্ত প্রশাসনিক আটকের সর্বোচ্চ মেয়াদ নির্ধারিত না থাকার কথা বলা হয়েছে। ফলে মানুষকে অনির্দিষ্টকাল আটকে রাখার সুযোগ থাকে। আটককেন্দ্রে নির্যাতন, অতিরিক্ত ভিড়, পর্যাপ্ত খাবার-পানি ও চিকিৎসার অভাবের অভিযোগও রয়েছে। আল-শুমাইসি কেন্দ্রে ৬৪ জনের উপযোগী একটি কক্ষে প্রায় ৩০০ জনকে রাখার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
মত প্রকাশের মামলাতেও সাজার বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। অ্যামনেস্টির প্রতিবেদন অনুযায়ী, শ্রীলঙ্কার কর্মী আনোজান শিবরাসাকে ফেসবুকে ধর্ম অবমাননাকর বিবেচিত মন্তব্যের জন্য প্রথমে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও ৩০ লাখ রিয়াল জরিমানা করা হয়। পরে আপিলে সাজা বেড়ে মৃত্যুদণ্ড হয়। গ্রেপ্তার থেকে প্রথম রায় পর্যন্ত তিনি আইনজীবী পাননি। অ্যামনেস্টির হেবা মোরায়েফ বলেন, “শুধু মত প্রকাশের জন্য কাউকে কারাবন্দী করা উচিত নয়, মৃত্যুদণ্ড তো নয়ই।” তবে শ্রীলঙ্কা সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ১৩ অক্টোবর সৌদি সুপ্রিম কোর্ট তার মৃত্যুদণ্ড বাতিল করেন।
জাতিসংঘের বর্ণবৈষম্য বিলোপ কমিটিও ২০২৪ সালের পর্যবেক্ষণে উদ্বেগ জানায় যে অভিবাসী ও গৃহকর্মীরা নির্বিচার আটক, নির্যাতন, জোর করে স্বীকারোক্তি নেওয়া এবং ন্যায়বিচারের সুরক্ষার ঘাটতির শিকার হচ্ছেন। অন্যদিকে সৌদি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, মাদকের ক্ষতি থেকে নাগরিক ও বাসিন্দাদের রক্ষা করতে তারা আইন অনুযায়ী কঠোর শাস্তি দিচ্ছে। কিন্তু এসব অনুসন্ধানে প্রশ্নটি শুধু শাস্তির কঠোরতা নিয়ে নয়—অভিযুক্ত ব্যক্তি অভিযোগ বুঝতে, নির্যাতনের অভিযোগ জানাতে এবং নিজের পক্ষে কার্যকরভাবে লড়তে পারছেন কি না, তা নিয়েও।
সৌদি আরবে গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতন ও বিচারহীনতা
এদিকে প্রবাসী শ্রমিকরা আইনগতভাবে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হলেও নিয়োগকর্তাদের দ্বারা নির্যাতিত হলে তারা যথাযথ বিচার পান না। ২০০৮ সালের ৮ জুলাই হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক মাস থেকে শুরু করে বছরের পর বছর বেতন না দেওয়া, জোরপূর্বক আটকে রাখা এবং শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের মতো অপরাধ করেও নিয়োগকর্তারা প্রায়ই কোনো শাস্তির মুখোমুখি হন না। অন্যদিকে, চুরি, ব্যভিচার কিংবা ‘জাদুবিদ্যার’ মতো ভিত্তিহীন অভিযোগে কিছু গৃহকর্মীকে কারাদণ্ড বা বেত্রাঘাতের শাস্তি ভোগ করতে হয়।
দুর্বল তদন্ত ও দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার কারণে নির্যাতনকারী নিয়োগকর্তারা খুব কমই শাস্তি পান। এর উদাহরণ ইন্দোনেশীয় গৃহকর্মী নূর মিয়াতি, যাকে অনাহারে রাখা ও নিয়মিত মারধরের কারণে হাত ও পায়ের আঙুল কেটে ফেলতে হয়েছিল। তবু তিন বছর বিচার চলার পর তাঁর নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ খারিজ করে দেন আদালত।
ফিলিপিনো গৃহকর্মী হাইমা জি. ২০০৬ সালের ৭ ডিসেম্বর রিয়াদে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, “কিছুদিন পর নিয়োগকর্তা আমার প্রতি স্নেহ দেখাতে শুরু করেন। তিনি আমাকে তাঁর শোবার ঘরে ডেকে বলেন, ‘এজেন্সি থেকে কীভাবে তোমাকে এনেছি, তা বলতে চাই।’ এরপর বলেন, ‘আমি তোমাকে ১০ হাজার রিয়ালে কিনেছি।’ ... নিয়োগকর্তা আমাকে বহুবার ধর্ষণ করেছেন। ... আমি ম্যাডামকে সবকিছু জানিয়েছিলাম। ... পরিবারের সবাই, ম্যাডাম ও নিয়োগকর্তা—কেউই আমাকে যেতে দিতে চাননি। তাঁরা দরজা ও ফটক বন্ধ করে রেখেছিলেন। তিনি বলেন, “পালিয়ে আসার পর বিচার শেষ হওয়ার অপেক্ষায় দূতাবাসে নয় মাস কাটিয়েছি। আমি অন্যদের মতো খালি হাতে দেশে ফিরতে চাইনি। ... একদিন তারা আমাকে জানায়, মামলায় আমি হেরে গেছি এবং দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য আমাকে বহিষ্কার প্রক্রিয়ায় পাঠানো হবে।”
গত ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি আরবে ভালো চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিয়ে গিয়ে বাংলাদেশি নারী ‘রিমা’কে (ছদ্মনাম) গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে বাধ্য করা হয় এবং তাঁর ওপর শারীরিক নির্যাতন ও ধর্ষণ চালানো হয়। পরবর্তীতে নিয়োগকর্তার করা চুরির মামলায় তাঁকে পাঁচ মাস কারাগারে থাকতে হয় এবং সেখানেও নির্যাতনের শিকার হন তিনি। কারাগারে থাকাকালে তাঁর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ পায় এবং ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তিনি দেশে ফেরেন। ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব থেকে অন্তত ছয়জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় দেশে ফিরেছেন এবং গত ছয় বছরে বিদেশে যৌন ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে অন্তত ১৫৭ জন অভিবাসী নারী কর্মী দেশে ফিরেছেন।
১৭ নভেম্বর ২০১৯ সালে আনাদোলু এজেন্সিতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের বরাতে বলা হয়, গত চার বছরে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরেছেন ৯ হাজার বাংলাদেশি নারী কর্মী, যাঁদের অধিকাংশই শারীরিক নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া একই সময়ে সৌদি আরব থেকে ১৫২ জনের মরদেহ দেশে ফিরেছে, যাঁদের মধ্যে ৬৬ জন আত্মহত্যা করেছিলেন। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, সৌদি আরবে প্রবাসী শ্রমিকদের অপরাধের ক্ষেত্রে বিচারব্যবস্থা অত্যন্ত কঠোর ও তাৎক্ষণিক হলেও, শ্রমিকদের ওপর চালানো নির্যাতন ও নিপীড়নের বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে তারা চরম বৈষম্য ও ন্যায়বিচারহীনতার শিকার হন।