রাজধানীর সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে আঁকা সাংবাদিক ও সংগীতশিল্পী সঞ্জীব চৌধুরীর প্রতিকৃতি সরিয়ে সেখানে নতুন করে আঁকা হয়েছে নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, পল্লিকবি জসীমউদ্দীন ও কবি জীবনানন্দ দাশের প্রতিকৃতি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ফুটপাত দখলমুক্তকরণ ও সৌন্দর্যবর্ধন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এ পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে সঞ্জীব চৌধুরীর প্রতিকৃতি কেন সরানো হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার প্রতিকৃতি নিয়ে সমালোচনা এবং রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিচয়কেন্দ্রিক বিতর্কের মধ্যে এ পরিবর্তন ঘটল।
গত ৫ অক্টোবর সেগুনবাগিচার ফুটপাত দখলমুক্ত করে পথচারীদের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয় ডিএসসিসি। এরপর ফুটপাতের পাশের দেয়ালে শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদান রাখা ১০ জন গুণী ব্যক্তির প্রতিকৃতি আঁকা হয়। তালিকায় ছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের সঙ্গে স্থান পেয়েছিলেন সাংবাদিক ও সংগীতশিল্পী সঞ্জীব চৌধুরীও।
কিন্তু ১৩ অক্টোবর দেয়ালটিতে নতুন তিনটি প্রতিকৃতি আঁকার সময় সঞ্জীব চৌধুরীর ছবিটি সরিয়ে দেওয়া হয়। পরদিন ১৪ অক্টোবর বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে দেশের একাধিক গণমাধ্যম।
ডিএসসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মাহবুবুর রহমান তালুকদার সুখবর ডটকমকে বলেন, ‘এটি আমাদের পরিকল্পনার অংশ। আরও গুণী মানুষের প্রতিকৃতি যুক্ত হবে। আমরা আরও কিছু দেয়াল চূড়ান্ত করেছি, সেগুলোতে দ্রুত কাজ শুরু হবে।’
সঞ্জীব চৌধুরীর প্রতিকৃতি সরিয়ে অন্য ব্যক্তিদের ছবি আঁকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে যারা আছেন, তাদের সঙ্গে সঞ্জীব চৌধুরীর সময়ের একটা বিশাল ফারাক আছে। আমাদের অনেকে এও বলেছেন, এখানে কেন আইয়ুব বাচ্চু নেই, কেন আজম খান নেই। তরুণদের নিয়েও আমাদের ভাবনা আছে। তাদের প্রতিকৃতিগুলো আমরা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এলাকায় করার পরিকল্পনা রয়েছে।’
তবে সঞ্জীব চৌধুরীর প্রতিকৃতি প্রথমে কেন নির্বাচিত হয়েছিল এবং পরে কোন নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সেটি সরানো হলো, সে বিষয়ে কর্মকর্তার বক্তব্যে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তার প্রতিকৃতি সরানোর পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওঠা আপত্তি বা রাজনৈতিক চাপ কাজ করেছে কি না, তা-ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে নিশ্চিত হয়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সঞ্জীব চৌধুরীর প্রতিকৃতি ছড়িয়ে পড়ার পর তার ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কিছু ব্যবহারকারী। সঞ্জীব সনাতন ধর্মাবলম্বী হওয়ায় তাকে কেন ওই দেয়ালে স্থান দেওয়া হয়েছে, এমন প্রশ্নও তোলা হয় বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি তার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও সমালোচনা সামনে আসে। অভিযোগ রয়েছে, সঞ্জীব চৌধুরী বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনের সমালোচনা করে গান গেয়েছিলেন। তবে এসব সমালোচনার সঙ্গে প্রতিকৃতি সরানোর সিদ্ধান্তের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ বা কর্তৃপক্ষের নিশ্চিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সঞ্জীব চৌধুরী ছিলেন সাংবাদিক, লেখক ও সংগীতশিল্পী। সংগীতের দল ‘দলছুট’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি পরিচিতি পান। তার গাওয়া গান তরুণ শ্রোতাদের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। সাংবাদিকতা ও সংগীত—দুই ক্ষেত্রেই তার কাজের পরিচিতি রয়েছে। তার প্রতিকৃতি দেয়ালে আঁকার পর সেটি সরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় তাই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের তালিকা নির্ধারণের প্রক্রিয়া নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত বক্তব্যে সঞ্জীব চৌধুরীর সময়কাল এবং অন্য শিল্পীদের প্রতিকৃতি রাখার দাবি নিয়ে আলোচনা এসেছে। কিন্তু ধর্মীয় পরিচয় কিংবা জিয়াউর রহমানের শাসন নিয়ে তার গানের বক্তব্যের কারণে প্রতিকৃতি সরানো হয়েছে—এমন কোনো তথ্য কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেনি।
সেগুনবাগিচার দেয়ালে প্রতিকৃতি আঁকার উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছিল দখলমুক্ত ফুটপাতের সৌন্দর্যবর্ধনের অংশ হিসেবে। ফুটপাতের একাংশ আগে দখলে ছিল। সেটি দখলমুক্ত করার পর পথচারীদের চলাচলের সুবিধায় ডাস্টবিন ও বেঞ্চ বসানো হয়। সংস্কার করা হয় সীমানাপ্রাচীরও। ৫ অক্টোবর ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ উদ্বোধন করেন।
এই দেয়াল ঘিরে এর আগেও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় ১০ অক্টোবর এক নারীসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় কয়েকজনকে কারাগারে পাঠানোর খবরও প্রকাশিত হয়। ফলে একই দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি নিয়ে বিতর্কের কয়েক দিনের মধ্যে সঞ্জীব চৌধুরীর ছবি সরানোর ঘটনা সামনে এল।
ডিএসসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আরও কয়েকটি দেয়াল চূড়ান্ত করা হয়েছে। সেখানে নতুন করে গুণী ব্যক্তিদের প্রতিকৃতি আঁকা হবে। আইয়ুব বাচ্চু ও আজম খানের মতো শিল্পীদের প্রতিকৃতি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার দেয়ালে আঁকার পরিকল্পনার কথাও বলেছেন তিনি। তবে সঞ্জীব চৌধুরীর প্রতিকৃতি অন্য কোথাও আঁকা হবে কি না, সে বিষয়ে তার বক্তব্যে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি নেই।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের প্রতিকৃতি নির্বাচনের মানদণ্ড, তালিকা তৈরির দায়িত্বে কারা ছিলেন এবং প্রতিকৃতি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছে—এসব বিষয়ে ডিএসসিসির বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে সঞ্জীব চৌধুরীর প্রতিকৃতি সরানোর সিদ্ধান্তের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওঠা ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আপত্তির কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা নিশ্চিত করার জন্যও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন। আপাতত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নতুন প্রতিকৃতি আঁকার সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেওয়া হলেও সঞ্জীব চৌধুরীর ছবি বাদ দেওয়ার পূর্ণাঙ্গ কারণ স্পষ্ট নয়।