চট্টগ্রামে তালিকাভুক্ত অপরাধী ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগাকে গ্রেপ্তারে অভিযানের পরপরই খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবদুর রহিমকে প্রত্যাহার ও পরে বদলি করায় পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে এটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নিয়ে জন্ম দিয়েছে উদ্বেগ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা টাইমসকে জানান, তালিকাভুক্ত অপরাধী ও তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে তারা রাজনৈতিক চাপের সম্মুখীন হচ্ছেন। তাদের আশঙ্কা, এ ধরনের হস্তক্ষেপের ফলে প্রভাবশালী সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে পুলিশ সদস্যরা নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
তবে বদলির পেছনে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। তাদের দাবি, প্রশাসনিক প্রয়োজন এবং কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতার ভিত্তিতেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকে। ওসি রহিমের অপসারণের আদেশে ‘জনস্বার্থের’ কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের শিক্ষক আরিফ উল্লাহ সতর্ক করে দিয়ে বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বদলি পুলিশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করতে পারে। এটি অন্য কর্মকর্তাদের কাছে নেতিবাচক বার্তা পাঠাতে পারে।
তিনি টাইমসকে বলেন, ‘প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার আগে কর্মকর্তারা যদি নিজেদের চাকরির কথা চিন্তা করতে বাধ্য হন, তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিরপেক্ষতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। অভিযানকালে বাধা কিংবা হুমকির মুখে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে তা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং অপরাধ করে পার পাওয়ার সংস্কৃতিকে আরও উৎসাহিত করতে পারে।’
যা ঘটেছিল সেদিন
ঘটনার সূত্রপাত গত ৬ অক্টোবর রাতে, যখন বগাকে গ্রেপ্তারের জন্য চট্টগ্রাম নগর ভবন এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ। কিন্তু তাকে গ্রেপ্তার করতে ব্যর্থ হয়।
পরদিন সকালে এক অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন ওসি রহিমের ওপর প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি ওসি রহিমের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সাথে যোগাযোগ এবং বিএনপি নেতাকর্মীদের হয়রানির অভিযোগ তোলেন।
এ ঘটনার মাত্র দুই ঘণ্টা পর রহিমকে খুলশী থানার ওসির পদ থেকে প্রত্যাহার করে সিটি স্পেশাল ব্রাঞ্চে (সিটিএসবি) ন্যস্ত করা হয়। পরে তাকে খুলনার পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে বদলির আদেশ দেয় পুলিশ সদর দপ্তর।
ঘন ঘন ওসি বদলি
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো চট্টগ্রাম জুড়ে থানা পর্যায়ের প্রশাসনে ঘন ঘন রদবদলের বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।
গত দুই বছরে সিএমপির ১৬টি থানায় ওসি পদে অন্তত ২০ বার রদবদল হয়েছে। কেবল খুলশী থানাতেই গত ছয় মাসে পাচজন কর্মকর্তা ওসির দায়িত্ব পালন করেছেন।
বারবার এ ধরনের পরিবর্তনের ফলে অপরাধ প্রতিরোধ, তদন্তের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং প্রভাবশালী অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
শিক্ষক আরিফ উল্লাহ বলেন, ‘এটি প্রশাসনিক অস্থিরতার লক্ষণ হতে পারে। এর ফলে তদন্তের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়া, স্থানীয় অপরাধ সম্পর্কে কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা অর্জন না হওয়া এবং সাধারণ জনগণের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টির ঝুঁকি থাকে।’
কে এই বগা?
পুলিশ জানায়, শিক্ষক লাঞ্ছনা, চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে আগ্নেয়াস্ত্র ও বিস্ফোরক সংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগে বগার বিরুদ্ধে মোট ২৩টি মামলা রয়েছে।
গত ৪ সেপ্টেম্বর তাকে গ্রেপ্তার করতে গেলে তার সহযোগীদের হামলায় ছয়জন পুলিশ সদস্য আহত হন।
তবে মেয়র শাহাদাত হোসেন বগাকে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের অংশীদার এবং জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের একজন যোদ্ধা হিসেবে বর্ণনা করেন।
সিএমপির সহকারী কমিশনার (জনসংযোগ) আমিরুল ইসলাম জানান, বগাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তিনি টাইমসকে বলেন, ‘বগাকে গ্রেপ্তারে অভিযান এখনো চলছে এবং সে গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছে।’
ঘন ঘন ওসি বদলির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওসির পদ তো ফাঁকা রাখা যায় না।’
তবে সাধারণ পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি, ঘন ঘন বদলি হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়। অপরাধীদের গতিবিধি নজর রাখা এবং তদন্ত শেষ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তা ছাড়া অনেক সময় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা বা জনপ্রতিনিধিদের কথামতো কর্মকর্তা বদলি করা হয় বলেও তারা অভিযোগ তোলেন।
সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মুহাম্মদ ফয়সাল আহমেদ অবশ্য এসব রাজনৈতিক চাপের কথা মানতে নারাজ। তিনি বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী কাজের দক্ষতা, শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক প্রয়োজনেই বদলি করা হয়। এটি পুলিশের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।’
জেলা পুলিশেও একই সুর
শুধু চট্টগ্রাম মহানগরেই নয়, পুলিশ কর্মকর্তারা জেলা পুলিশেও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ করেন।
রাউজান, সীতাকুণ্ড, ফটিকছড়ি ও হাটহাজারীতে হত্যা ও গুলির মতো বড় অপরাধের পর জেলা পুলিশ কঠোর অভিযান শুরু করে। বিদেশে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘বড় সাজ্জাদ’-এর প্রধান সহযোগী ‘ডেভিড ইমন’ ধরা পড়ার পর অভিযান আরও জোরদার করা হয়।
তবে জেলা পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তার অভিযোগ, অপরাধী ও তাদের আশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিটি পদক্ষেপে প্রায়ই বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা টাইমসকে বলেন, ‘আগে আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত কিছু অপরাধী এখন সরকারি দলের কয়েকজন নেতার আশ্রয়ে অপরাধ জগতের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ায় চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলমকেও চট্টগ্রাম ছাড়তে বাধ্য করার হুমকি দেওয়া হয়েছে।’
তবে রাজনৈতিক বাধার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম। তিনি বলেন, ‘আমরা অন্যায় বা নিয়মবহির্ভূত কিছু করছি না। ভালো কাজ করার সময় আমাদের কাজে বাধা দেওয়ার সাহস কারও হবে না।’
শিক্ষক আরিফ উল্লাহ বলেন, পুলিশের পেশাগত স্বাধীনতার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। টাইমসকে তিনি বলেন, ‘পুলিশের কাজের স্বাধীনতার পাশাপাশি তাদের কার্যকর জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করতে হবে।’