Image description

নদীর ওপর সেতু আছে, কিন্তু দুই পাশে নেই সংযোগ সড়ক। তাই সেতু পেরিয়ে স্কুলে যাওয়ার পথ বন্ধ শিশুদের, কৃষকের পণ্য নিতে হচ্ছে ঘুরপথে, আর সাধারণ মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছাতে পাড়ি দিতে হচ্ছে বাড়তি তিন কিলোমিটার। ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া ও মুক্তাগাছা উপজেলার সীমান্তে আয়মন নদীর ওপর সেতুটির সংযোগ সড়ক ভেঙে যাওয়ার পর দুই বছর ধরে এমন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন অন্তত ৯ গ্রামের মানুষ। সেতুটি পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ না থাকায় তাদের ভোগান্তি দীর্ঘ হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, সেতুটি মুক্তাগাছা উপজেলার খেরুয়াজানী ইউনিয়নের মানিকপুর গ্রামের সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ২০১০-১১ অর্থবছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রায় ২৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ১২ মিটার দীর্ঘ সেতুটি নির্মাণ করা হয়। এতে দুই উপজেলার গ্রামগুলোর মানুষের যাতায়াত সহজ হয়েছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পানি উন্নয়ন বোর্ড আয়মন নদীর প্রায় ৪২ কিলোমিটার অংশ পুনর্খনন করে। এরপর বর্ষায় পানির তীব্র স্রোতে সেতুর দুই পাশের সংযোগ সড়ক ভেঙে যায়। সেতুর পশ্চিম পাশে ১২ থেকে ১৫ ফুট এবং পূর্ব পাশে অন্তত ৫ ফুট সড়ক নদীতে বিলীন হয়েছে। সেতুর পিলারের নিচ থেকে মাটি সরে যাওয়ায় এতে ফাটলও দেখা দিয়েছে। সেতুটি ব্যবহার করে ফুলবাড়িয়ার মণ্ডলবাড়ি, উজলহাটি, চক গড়বাজাইল, চামারবাজাইল ও দেওলি এবং মুক্তাগাছার মানিকপুর, রমেশবাড়ি, মহেরবাড়ি ও বাইন্নাবাড়ি গ্রামের মানুষ যাতায়াত করতেন। এখন তাদের বিকল্প পথে প্রায় তিন কিলোমিটার ঘুরে গন্তব্যে যেতে হচ্ছে।

মুক্তাগাছা উপজেলা সদর, কালীবাড়ি, বাংলাবাজারসহ বিভিন্ন বাজারে যাতায়াত করতে বাড়তি সময় ও পরিবহন ভাড়া লাগছে। কৃষিপণ্য, মাছ, মুরগি ও ডিম বাজারে নিতে গিয়ে কৃষক এবং খামারিদের পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা হিলিম উদ্দিন ও আব্দুল খালেকের ভাষায়, সেতুটি দিয়ে আগে ছোট-বড় অনেক যানবাহন চলাচল করত। ভাঙনের পর কয়েক মাস বাঁশের সাঁকো তৈরি করে মানুষ চলাচল করেছে। পরে ভাঙন আরও বাড়ায় সেই ব্যবস্থাও বন্ধ হয়ে যায়।

সেতুটির পাশে রয়েছে মণ্ডলবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টিতে প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ১১২ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। এর মধ্যে মুক্তাগাছার মানিকপুর ও আশপাশের গ্রামের শিক্ষার্থী ৫৯ জন। সেতু দিয়ে চলাচল বন্ধ হওয়ায় এসব শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়ে যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়েছে। কেউ কেউ দীর্ঘ পথ ঘুরে বিদ্যালয়ে আসে, আবার ঝুঁকির কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোছাম্মৎ সুরাইয়া মকসুদা স্থানীয়দের সহযোগিতায় নদীর ওপর সুপারিগাছ দিয়ে একটি সরু সাঁকো তৈরি করে দিয়েছেন। সেই সাঁকো পার হয়েই শিশুরা বিদ্যালয়ে যাতায়াত করছে। তবে বৃষ্টিতে নদীর পানি বাড়লে সাঁকো পার হওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

 

প্রধান শিক্ষক সুরাইয়া মকসুদার ভাষ্য, সেতু ভেঙে যাওয়ার পর অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে আসতে পারছিল না। শিশুদের পড়াশোনার কথা বিবেচনা করে নিজের টাকায় সাধ্য অনুযায়ী সাঁকোটি তৈরি করে দিয়েছেন তিনি। তবে ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর ওপর শিশুদের চলাচল এবং সেখানে তাদের খেলাধুলা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন।

সেতুর দুই পাশের মাটি ভেঙে নদীতে চলে গেছে। কোথাও কোথাও নদীর পাড়ের মাটিও কাটা। সেতুর এক পাশ দেবে গেছে এবং বিভিন্ন স্থানে ফাটল রয়েছে। সেতুর পাশেই বিদ্যালয় হওয়ায় শিশুদের অনিরাপদ স্থানে যাতায়াত নিয়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. সাইদুল হকের মতে, আয়মন নদী পুনর্খননের পর পানির স্রোতে সেতুর দুই পাশে ভাঙন দেখা দেয়। বর্তমান অবস্থায় সেতুটি মেরামত করলেও নিরাপদে চলাচল নিশ্চিত করা কঠিন হবে। তাই নতুন সেতু নির্মাণ প্রয়োজন। নদী পুনর্খননের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিবেচনায় সেতুটি আগের চেয়ে বড় করে নির্মাণ করতে হবে। এজন্য স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ জোবায়ের হোসেনের দাবি, সেতুটির বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তবে সেতুটি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয়ের মাধ্যমে নির্মিত হয়েছিল। এ কারণে বিষয়টি তাদের দপ্তরের সরাসরি দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। তারপরও তিনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন।