রংপুর, রাজশাহী, গাইবান্ধা, নীলফামারী, মেহেরপুর, নাটোর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন জেলায় ডিলার নিয়োগ নিয়ে বিতর্কের তথ্য পাওয়া গেছে। নাটোরের লালপুর উপজেলার কদিমচিলান ইউনিয়নে নিয়োগবঞ্চিত আবেদনকারী আব্দুল হান্নান সংবাদ সম্মেলন করে নিয়োগ বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।
সারের নতুন ডিলার নিয়োগ ঘিরে অনিয়ম, দলীয় প্রভাব ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নিয়োগ পাওয়া ডিলারদের কারো কারো সার বিক্রির দোকান বা গুদামও নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে নিয়োগ পাওয়া ও বাদ পড়া প্রার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সংসদ সদস্য ও সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের কেউ কেউ প্রকাশ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়ার অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি নিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছেন। কোনো কোনো জেলায় নতুন ডিলারের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগও দেয়া হয়েছে। এর মধ্যেই কয়েকটি জেলায় কৃষক পর্যায়ে সার সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। রাজবাড়ী, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটসহ কিছু এলাকায় সরবরাহ সংকটের কথা বলে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির তথ্যও মিলেছে।
কৃষি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামনে শীতকালীন ও বোরো মৌসুম—দেশের কৃষির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোর একটি। এর আগে সার ও ডিলার নিয়োগ ঘিরে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত সমাধান করা জরুরি। এ পরিস্থিতিতে কৃষক পর্যায়ে সার সরবরাহ ব্যাহত হলে উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সারা দেশে প্রায় পাঁচ হাজার সার ডিলার নিয়োগের বিপরীতে ৪৭ হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়ে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত ৫৫ জেলার ডিলার নিয়োগের আংশিক তালিকায় স্থান পাওয়া ব্যক্তিদের যোগ্যতা, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালীদের আত্মীয়-স্বজনকে ডিলারশিপ দেয়া হয়েছে।
রংপুর, রাজশাহী, গাইবান্ধা, নীলফামারী, মেহেরপুর, নাটোর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন জেলায় ডিলার নিয়োগ নিয়ে বিতর্কের তথ্য পাওয়া গেছে। নাটোরের লালপুর উপজেলার কদিমচিলান ইউনিয়নে নিয়োগবঞ্চিত আবেদনকারী আব্দুল হান্নান সংবাদ সম্মেলন করে নিয়োগ বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। রাজশাহীর বাগমারায়ও ডিলার নিয়োগ নিয়ে আপত্তি উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় ব্যবসায়ী নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও করেছেন।
ডিলার নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে সম্প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ময়মনসিংহ-৮ আসনের বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু। নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি অভিযোগ করেন, সারের ডিলারশিপ দেয়ার নামে অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের চেষ্টা চলছে। ঈশ্বরগঞ্জের সরিষা ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি লেখেন, ‘কে কোথা থেকে কত পার্সেন্ট টাকা নেয়, তা আমি জানি।’
ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতির এমন অভিযোগ উঠেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়ও। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনের বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য এমএ হান্নানের ছেলে, ভগ্নিপতি ও ভাগনের স্ত্রী ডিলারশিপ পেয়েছেন। নাসিরনগর উপজেলার গোকর্ণ ইউনিয়নে সংসদ সদস্যের ছেলে আদনান সাদী ‘মেসার্স আলীয়াহ ট্রেডার্স’ নামে, নাসিরনগর সদর ইউনিয়নে তার ভগ্নিপতি আরক মিয়া ‘মেসার্স আয়ান ট্রেডার্স’ নামে এবং গোয়ালনগর ইউনিয়নে ভাগনের স্ত্রী নুরুন্নাহার আক্তার স্বর্ণা ‘এস এস ট্রেডার্স’ নামে সারের ডিলারশিপ পেয়েছেন। বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসন স্বীকার করলেও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, জেলায় ১০৬টি সারের ডিলারশিপের বিপরীতে ৮২৫টি আবেদন জমা পড়ে। স্থানীয়ভাবে যাচাই-বাছাই শেষে সার ডিলারসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে ২৯২ জনের নাম সুপারিশ করে পাঠানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি প্রতিটি ডিলারশিপের জন্য তিনজনের নাম সুপারিশ করেছিল। ওই তালিকায় ‘এক নম্বরে’ নাম রাখাকে কেন্দ্র করে মোটা অংকের অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে।
নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মোস্তফা এমরান বলেন, ‘উপজেলা থেকে প্রত্যেক ইউনিয়নের জন্য যে নাম এসেছে, সেগুলোই সুপারিশ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। এর মধ্যে দুই-একটি এদিক-সেদিক হয়েছে।’ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটি আমি করিনি। অন্য কেউ করেছে—এমন অভিযোগও আমার জানা নেই। তবে তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে উপজেলা পর্যায়ে হস্তক্ষেপ থাকতে পারে। জেলা প্রশাসকের কাছে কিছু অভিযোগ জমা পড়েছে বলেও শুনেছি।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবুসাঈদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ডিলারশিপ নিয়োগে অনিয়মের বিষয়ে এখন পর্যন্ত চারটি অভিযোগ পেয়েছি।’ সংসদ সদস্যের স্বজনদের ডিলারশিপ পাওয়ার বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘এটা আমাদের বিষয় না। উপজেলা কমিটি যাদের যোগ্য মনে করছে তাদের মনোনীত করেছে। কমিটি যদি যোগ্য মনে করে তাহলে তো আমাদের কিছু বলার নেই।’
ফরিদপুরের নগরকান্দায় সারের ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। নগরকান্দার বিভিন্ন ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে রোববার সংবাদ সম্মেলন করেন আবেদন করেও ডিলারশিপ না পাওয়া ব্যক্তিরা। তারা অভিযোগ করেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেজাউল করিম এবং উপজেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও লস্করদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান বাবুল তালুকদার ডিলারশিপ নিয়োগের অনিয়মে যুক্ত। উপজেলার কাইচাইল, ডাঙ্গী, লস্করদিয়া, রামনগর ও ফুলসুতি ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা মূল্যায়ন হয়নি বলে দাবি করেন তারা।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে নগরকান্দার ইউএনও রেজওয়ানা আফরিন বলেছেন, তারা প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে তিনজন করে যোগ্য প্রার্থীর নাম সুপারিশ করেছেন। মন্ত্রণালয় যাদের যোগ্য মনে করেছে, তারাই ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, ‘কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তির পর চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির সভাপতি ছিলেন ইউএনও এবং আমি ছিলাম সদস্য সচিব। যাচাই-বাছাই শেষে যোগ্য প্রার্থীদেরই তালিকা পাঠানো হয়েছে।’
অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাবিবুর রহমান বাবুল তালুকদার বলেন, ‘এ নিয়োগ কমিটি বা নিয়োগপ্রক্রিয়ার সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। যারা অভিযোগ করছেন, তারা হয়তো না বুঝে করছেন, অথবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার সম্মান ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছেন। যতটুকু শুনেছি, যারা নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের ৯৯ শতাংশ বিএনপির লোক।’
এছাড়া ফরিদপুর জেলায় কৃষকরা চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। কৃষকদের দাবি, ডিলাররা সার নেই বললেও অতিরিক্ত মূল্য দিলে পাওয়া যায়। এসব বিষয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগও দায়ের করা হয়েছে।
ফরিদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শাহাদুজ্জামান জানান, জেলায় কিছু এলাকায় অগ্রিম মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদ শুরু হয়েছে। তবে সেসব এলাকায় যেন সার সংকট দেখা না দেয়, সেজন্য বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে।
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে নিয়োগ বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীরা। গতকাল বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা অভিযোগ করেন, অর্থের বিনিময়ে ডিলারশিপ বিক্রি করা হয়েছে। উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য এবং উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব মোখলেছুর রহমান ও উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম রসুল রাজার বিরুদ্ধে তারা এসব অভিযোগ আনেন। অভিযোগকারীদের মধ্যে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা রয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম রসুল রাজা বলেন, ‘যারা তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন, তারা না বুঝে করেছেন। যারা যোগ্য, তারাই ডিলারশিপ পেয়েছেন।’
একই অভিযোগ গাইবান্ধা সদর উপজেলায়ও। সেখানকার কামারজানি ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগ পেয়েছেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সোলায়মান ইসলামের স্ত্রী জুঁই আক্তার। আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তিনি ডিলার হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে সোলায়মান ও তার স্ত্রীর দাবি, নিয়ম মেনেই ডিলারশিপ পেয়েছেন। গাইবান্ধা সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোশাররফ হোসেন বাবু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ওই ইউনিয়ন থেকে অন্য কেউ আবেদন না করায় নিয়ম অনুযায়ী ডিলার নিয়োগ হয়েছে।’
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক সরকার তার দলীয় লোককে নিয়োগ দিতেই পারে। তবে অবশ্যই যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে হবে। কিন্তু শুনছি স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন কিংবা অনভিজ্ঞরাও নিয়োগ পেয়েছে। যে ব্যক্তি ঘুস দিয়ে ডিলারশিপ নিয়েছে সে ওই টাকাটা সার বিক্রি করেই ওঠাবে। এতে করে গ্রামাঞ্চলে কৃষকের কাছে ডিলাররা বাড়তি দামে সার বিক্রি করবে। ভুক্তভোগী হবেন কৃষকরা। গোটা সার ব্যবস্থাপনায় সংকট দেখা দিয়েছে। এটি দ্রুত সমাধান না করলে কৃষির ওপর এর প্রভাব ফেলবে।’
খোঁজ নিয়ে দেশের কয়েকটি জেলায় সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কৃষকদের অতিরিক্ত দামে সার কেনার তথ্য মিলেছে। কৃষকরা বলছেন, ডিলার পয়েন্টে গেলে সার নেই জানানো হচ্ছে। তবে বাড়তি দাম দিলে ঠিকই পাওয়া যাচ্ছে। রাজবাড়ী সদরের কৃষক আলাউদ্দিন মণ্ডল বলেন, ‘এক বস্তা টিএসপি নগদ ১ হাজার ৮০০ টাকা দিয়ে কিনেছি। ইউরিয়া সারও কিনেছি ১ হাজার ৮০০ টাকায়। দোকানেও সার পাওয়া যাচ্ছে না।’
কালুখালীর কৃষক অনিল কুমার বলেন, ‘রাজবাড়ী জেলায় এখন গুঁটি পেঁয়াজ (মুড়ি কাটা) চাষের মৌসুম। এ সময় টিএসপি ও ডিএপি সার ব্যবহার বেশি হয়। এর আগে ধান রোপণের পর থেকে ইউরিয়া সারের প্রয়োজন হয়েছিল বেশি। দোকানে গিয়ে এখন টিএসপি ও ডিএপি চাইলে ব্যবসায়ীরা বলছেন এসব সার নেই।’
পাংশার কৃষক অমল মণ্ডল অভিযোগ করে বলেন, ‘সরকার নির্ধারিত দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না। নগদ টাকায় ৫০ কেজির এক বস্তা টিএসপি ও ইউরিয়া কিনতে গেলে ১ হাজার ৮০০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না। সরকার নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৩৫০ টাকা হলেও তা মিলছে না। আর পরিচিত দোকান ছাড়া টিএসপি পাওয়া যায় না।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজবাড়ী সদরের আলীপুর ইউনিয়নের এক সাব-ডিলার বলেন, ‘অক্টোবর মাসে মূল ডিলারের কাছ থেকে যে পরিমাণ সার পেয়েছেন, তা মাসের প্রথম ১০ দিনেই শেষ হয়ে গেছে। তাহলে বাকি মাস কীভাবে সার বিক্রি করব?’
রাজবাড়ী সার ডিলার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. রেজাউল হক বাদশা বলেন, ‘আমার বরাদ্দ করা সারের ৫০ ভাগ রেখে বাকি অংশ ৯ জন সাব-ডিলারের মধ্যে ভাগ করে দিতে হয়। এ মৌসুমে সারের চাহিদা বেশি থাকে। এজন্য যে পরিমাণ বরাদ্দ দেয়া হয়, তাতে সাব-ডিলারদের মাস চলে না। যে পরিমাণ সারের চাহিদা দেয়া হয়েছে, সে পরিমাণ বরাদ্দ পাইনি। এ কারণে এখান থেকেই সংকটের শুরু।’
রাজবাড়ী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা গোলাম রসুল বলেন, ‘রাজবাড়ীতে সারের সংকট নেই। জমিতে কৃষক অনেক বেশি রাসায়নিক সার ব্যবহার করেন। এ কারণে সংকট তৈরি হয়।’
উত্তরের জেলা লালমনিরহাটে সার সংকট নিয়ে বেশ কয়েক মাস ধরেই কৃষকরা অভিযোগ করছেন। আসন্ন ভুট্টা ও তামাক মৌসুমে এ নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন কৃষকরা। সংশ্লিষ্টদের দাবি, পর্যাপ্ত সার সরবরাহ না থাকা, ডিলারদের সিন্ডিকেট, তামাক চাষের জমির বিপরীতে সারের বরাদ্দ না থাকা এবং চরের জমির হিসাবে কৃষি বিভাগের তথ্যের গরমিলের কারণেই এসব সংকট বেড়েছে।
লালমনিরহাট কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, জেলায় মোট আবাদি জমির পরিমাণ ২ লাখ ৪৭ হাজার ৯৪৯ একর। মূল ভূখণ্ডের আবাদি জমির সঙ্গে ২০২৫ সালে তিস্তা ও ধরলা নদীর ছোট-বড় ৭০টি চরের ৪ হাজার ৫৭০ একর জমি হিসাব করা হয়। তবে এ বছর চরের চাষযোগ্য জমি বেড়ে ১৩ হাজার ২১৫ একর হয়েছে। এতে মোট জমির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৬১ হাজার ১৬৪ হেক্টর। অথচ কৃষি বিভাগের হিসাবে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৯৪৯ একর।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিস্তা, ধরলা, সানিয়াজান ও স্বর্ণামতি নদীতে জেগে ওঠা ছোট-বড় ৭০টি চরের প্রায় ৩৬ হাজার একর জমিতে ভুট্টা, বোরো ধান ও শীতকালীন সবজি চাষ হয়ে থাকে। এসব জমির মধ্যে প্রায় ২২ হাজার ৭৮৫ একর জমির ফসল উৎপাদনের জন্য সরকারের কাছে হিসাব রয়েছে, ১৩ হাজার ২১৫ একর হিসাবের বাদে। এসব জমির জন্য সরকার থেকে সারের বরাদ্দ পায় না ডিলাররা। ফলে সার সংকটের সুযোগ নিয়ে ডিলাররা কৃষকের কাছ থেকে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি করছে। অভিযোগ রয়েছে, জেলাটিতে প্রায় ২ হাজার ৪০০ টাকা থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা দিয়ে টিএসপি সার সংগ্রহ করে কৃষকদের আবাদ করতে হচ্ছে।
লালমনিরহাট খামারবাড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. সাইখুল আরিফিন টিএসপি সার সংকটের কথা স্বীকার করে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্থানীয় কৃষি অফিসগুলোর তথ্যমতে জেলায় ৩৮ হাজার ৪৭০ একর তামাক চাষের জমির জন্য সারের কোনো চাহিদা দেয়া হয় না। তাছাড়া চরের সব জমির সঠিক হিসাব আমাদের হাতে নেই। আমাদের প্রাথমিক তথ্যমতে চলতি বছর ১৩ হাজার ২১৫ একর চরের জমিতে ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরে সার বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।’
কৃষি অর্থনীতিদিরা বলছেন, সামনের শীতকালীন সবজি, বোরো ধান ও পেঁয়াজের মৌসুম ঘিরে সার ও ডিলার নিয়ে তৈরি হওয়া অস্থিরতা দ্রুতই নিরসনে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। ডিলার নিয়োগ ঘিরে কোনো ঘুসের ঘটনা ঘটলে কিংবা সার সরবরাহ নিয়ে সংকট তৈরি হলে এর প্রভাব কৃষকের ওপরই পড়বে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক এএইচএম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সার ডিলার নিয়োগে সরকারের উদ্দেশ্য ভালো ছিল। কিন্তু শুরুতেই নিয়োগে অস্বচ্ছতা নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। ঘুসের মাধ্যমে নিয়োগ পেলে সার নিয়ে সংকট কাটবে না। কৃষককে বাড়তি দামে কিনতে হবে। এতে তাদের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। এতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হলে জাতীয় অর্থনীতিই আক্রান্ত হবে। সারের মনিটরিংটা ঠিকমতো হচ্ছে না। এটি ঠিক করতে হবে।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে কৃষি সচিব মো. সেলিম খানকে মোবাইলে কল করা হলে তিনি সাড়া দেননি।
প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট জেলার প্রতিনিধিরা