চকলেটের প্রলোভন দেখিয়ে পাঁচ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে ৫০ বছরোর্ধ্ব এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। শিশুটির ডাক-চিৎকার শুনে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে পরিবার। একপর্যায়ে গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করেন অভিযুক্ত ব্যক্তি। তবে ভুক্তভোগী পরিবার থানার দ্বারস্থ হয়। থানায় মামলা নিতে বিলম্ব হওয়ায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী অভিযুক্তের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভুক্তভোগী শিশুটির পরিবারসহ এলাকার অন্তত অর্ধশত মানুষের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে হয়রানির শিকার হয়ে ঘরছাড়া হয়েছে অসহায় পরিবারটি। ঘটনার এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও কোনও পক্ষের মামলায় কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এমন পরিস্থিতিতে আইনি সহায়তা চেয়েছে ভুক্তভোগী পরিবার।
থানায় দায়ের করা মামলা, এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগী পরিবারের সূত্রে জানা যায়, গত ২ অক্টোবর সকাল ১১টার দিকে মাদারীপুরের কালকিনিতে পাঁচ বছরের এক শিশুকে চকলেটের প্রলোভন দেখিয়ে বাড়িতে নিয়ে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ ওঠে সাহেবরামপুর ইউনিয়নের মধ্যেরচর গ্রামের হাবুল শিকদারের বিরুদ্ধে। শিশুটির ডাক-চিৎকার শুনে তার মা তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করেন এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। পরে বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হলে হাবুল শিকদার আত্মগোপনে চলে যান।
এ দিকে বিষয়টি আপস-মীমাংসার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে এবং থানায় মামলা না করতে বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে ভুক্তভোগী পরিবারকে চাপ প্রয়োগ করা হতে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এতে ক্ষুব্ধ হয়ে গত ৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় ওই গ্রামের শতাধিক মানুষ হাবুল শিকদারের বিচারের দাবিতে ঝাড়ু মিছিল করেন। একপর্যায়ে মিছিল শেষে বিক্ষুব্ধ জনতা অভিযুক্তের বসতবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন। খবর পেয়ে কালকিনি থানা-পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।
এ ঘটনার পরদিন সকালে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য ও এলাকাবাসীর বিরুদ্ধে জায়গাজমি নিয়ে বিরোধ, অগ্নিসংযোগ ও মারধরসহ একাধিক অভিযোগে মামলা করেন হাবুল শিকদারের স্ত্রী দেলোয়ারা বেগম। মামলায় অর্ধশতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এর পর থেকে ভুক্তভোগী পরিবারসহ এলাকার অনেকেই বাড়িঘর ছেড়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় হতবাক এলাকাবাসী ও স্বজনেরা অভিযুক্তের বিচার দাবি করেছেন।
এলাকার এক ব্যক্তি বলেন, ‘আগেও হাবুল শিকদারের বিরুদ্ধে এলাকার মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার অভিযোগ রয়েছে। তিনি প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ তার বিচার করাতে পারেননি। বারবার আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বের হয়ে গেছেন। এবার মাত্র পাঁচ বছরের শিশুটিকে এভাবে রক্তাক্ত করার ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি এলাকাবাসী। পরে এলাকার ছোট ছোট ছেলেরা তার ঘরে আগুন দেয়। এখন সেই ঘটনার জেরে এলাকার অর্ধশত মানুষের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে সবাইকে বাড়িছাড়া করা হচ্ছে। এবারও হয়তো তিনি পার পেয়ে যাবেন। আমরা তার কঠোর শাস্তি চাই।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক নারী বলেন, ‘পুলিশ প্রশাসন তার কেনা—এমনটাই মনে হয়। তা না হলে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় পুলিশ মামলা নিতে চায় না কেন? অথচ হাবুল শিকদারের দায়ের করা মামলা ঠিকই নেওয়া হয়েছে, যার ফলে অসহায় পরিবারটি বাড়িছাড়া হয়েছে। এখন প্রশাসন ও রাষ্ট্রের কাছে দাবি জানাই, এবার যেন কোনোভাবেই তিনি পার না পান।’
অন্যদিকে, অসহায় হওয়ায় ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কিত ভুক্তভোগী শিশুটির পরিবার। দ্রুত অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে শিশুটির মা বলেন, ‘আমার অবুঝ শিশুটিকে যেভাবে রক্তাক্ত করা হয়েছে, তার বিচার আমি পৃথিবীতে দেখে যেতে চাই। ২ অক্টোবর থানায় মামলার আবেদন করেছিলাম, কিন্তু পুলিশ মামলা নেয়নি। উল্টো অভিযুক্তের পক্ষে আমাদের ওপর নানা চাপ দেওয়া হয়েছে। পরে এলাকাবাসী হাবুল শিকদারের বাড়িতে ভাঙচুর করেছে, সেটা এলাকাবাসীর বিষয়। কিন্তু আমার মেয়ের নির্যাতনের বিচার কি আমি পাব না? পরে ৬ অক্টোবর হাবুলের দায়ের করা মামলা নেওয়ার পর আমাদের মামলাও নেওয়া হয়েছে। এ দেশে কি আইনের শাসন নেই? আমার মেয়ের ওপর যে নির্যাতন হয়েছে, তার সঠিক বিচার চাই।’

অন্যদিকে, অভিযুক্ত হাবুল শিকদার আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে। তার পক্ষে মামলা করেছেন স্ত্রী দেলোয়ারা বেগম। তিনি বলেন, ‘আমাদের জায়গাজমি নিয়ে বিরোধ আছে। আর ওই মেয়ের সঙ্গে কিছু করলে তাকে আইনের হাতে তুলে দেয়া হতো। কিন্তু আমার বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হলো কেন? এসব কারণেই আমি মামলা করেছি। এখন মামলায় যা হওয়ার, তাই হবে।’
এদিকে, চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার পর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করেছে প্রশাসন। তবে দুই পক্ষের দায়ের করা মামলায় এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানিয়েছেন কালকিনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জহিরুল আলম।
তিনি বলেন, ‘দুই পক্ষেরই মামলা হয়েছে। তদন্ত করে দেখা হচ্ছে, কে দোষী আর কে নির্দোষ। আসামিদের গ্রেপ্তারে জোর চেষ্টা চলছে। বর্তমানে ওই এলাকায় পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। দ্রুতই আসামিদের গ্রেপ্তার করা হবে।’
ঘটনার এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও কেউ গ্রেপ্তার না হওয়ায় উদ্বিগ্ন ভুক্তভোগী পরিবার। পাশাপাশি অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রভাবশালী হওয়ায় ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীকে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।