Image description

ঠাকুরগাঁও-১ আসনে উপনির্বাচন কি বিএনপি ও সরকারের জন্য কোনও চ্যালেঞ্জ? তিন দশক আগে ১৯৯৪ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন মাগুরা-২ উপনির্বাচনের তিক্ত অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে হতে যাওয়া প্রথম নির্বাচন এই সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতায় কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং বিএনপির জন্য কতটা প্রেস্টিজ ইস্যু—বিশেষ করে আসনটি যখন দলের সাবেক মহাসচিব এবং রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের—এই প্রশ্ন সচেতন মহলে আছে। সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে একটু ভূমিকা দেওয়া প্রয়োজন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হওয়ার কারণে শূন্য হওয়া ঠাকুরগাঁও-১ আসনে উপনির্বাচন হবে আগামী ২৯ অক্টোবর। এখানে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী তার ছোট ভাই মির্জা ফয়সল আমিন। তিনিসহ পাঁচ প্রার্থীর মধ্যে প্রতীক বরাদ্দের পর শুরু হয়েছে প্রচার-প্রচারণা। অন্য প্রার্থীরা হলেন জামায়াতে ইসলামীর মো. দেলাওয়ার হোসেন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মো. আবদুল আলীম নিজামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাফেজ ডা. মো. খাদেমুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক।

১৯৮৬ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত তৃতীয় থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত এই আসনে আওয়ামী লীগ ছয়বার, বিএনপি তিনবার এবং জাতীয় পার্টি দুবার জয়ী হয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা রমেশ চন্দ্র সেন ২০০৮ থেকে ২০২৪ সালের নির্বাচন পর্যন্ত টানা চারবার জয়ী হন। আর সবশেষ গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন পর্যন্ত বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই আসন থেকে নির্বাচিত হন তিনবার। রমেশচন্দ্র সেন এবং মির্জা ফখরুল দুজনই দুটি বড় দলের সিনিয়র নেতা হওয়ায় এই আসনকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়। ঠাকুরগাঁও সদর, রুহিয়া ও ভূল্লী উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে ভোটার সংখ্যা পাঁচ লাখের বেশি।

টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পরে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর এবং এরপর গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের মধ্য দিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। ১৯৯৪ সালে যখন মাগুরা-২ আসনে উপনির্বাচন হয়, তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া, যিনি একানব্বইয়ের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার মধ্য দিয়ে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। খালেদা জিয়া প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েই যেমন প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, এবারও একইভাবে তার ছেলে তারেক রহমান প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েই প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। মা-ছেলের এ এক অদ্ভুত মিল।

১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাগুরা-২ আসনে জয়ী হন আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা আসাদুজ্জামান। তার মৃত্যুতে আসনটি শূন্য হলে এখানে উপনির্বাচন হয় ১৯৯৪ সালের ২০ মার্চ। ওই নির্বাচনে আসাদুজ্জামানের ছেলে শফিকুজ্জামান বাচ্চুর বিপক্ষে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন কাজী সলিমুল হক কামাল। যিনি একসময়ের নামকরা ‘ইকোনো’ বল পেন কোম্পানির মালিক। ওই নির্বাচনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থীর কাছে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হেরে যান। কিন্তু এই নির্বাচনটি ব্যাপকভাবে সমালোচিত ও বিতর্কিত হয়। নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ তোলে বিরোধীরা। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতিও বদলে দেয় এই নির্বাচন। এই নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ নিয়ে বিরোধীদের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় শেষ পর্যন্ত নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত করতে বাধ্য হয় বিএনপি।

মূলত ১৯৯১ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় এলেও ১৯৯৪ সালের শুরুতে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংবিধানে যুক্ত করার দাবিতে বিরোধীদের আন্দোলন তীব্র হতে থাকে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত মাগুরা-২ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হেরে যাওয়ায় বিরোধীরা এই কথা বলার আরও সুযোগ পায় যে রাজনৈতিক সরকারের অধীনে কোনও নির্বাচন অবাধ-সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হয় না। অর্থাৎ এই ঘটনার মধ্য দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আরও জোরালো হয়। বলা হয়, মাগুরা-২ আসনে উপনির্বাচনে বিএনপির জয়কে শুধু একটি সংসদীয় আসন জয় হিসেবে দেখা হয়নি, বরং এটি হয়ে ওঠে সরকারের জনপ্রিয়তা ও নির্বাচনি সক্ষমতার একটি রাজনৈতিক পরীক্ষা।

এই উপনির্বাচনের আগে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ভালো ফল করেছিল। ফলে বিএনপির জন্য মাগুরা-২ আসনে জয় পাওয়া রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণায় জাতীয় পর্যায়ের নেতাদের নজিরবিহীন উপস্থিতি দেখা যায়। প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতাসহ দেশের প্রায় সব বড় রাজনৈতিক দলের নেতারা সেখানে প্রচারণায় যান। ফলে উপনির্বাচন হলেও এটি জাতীয় রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রতীকে পরিণত হয়। প্রশ্ন হলো, এবার ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনও জাতীয় রাজনৈতিক লড়াইয়ের উপলক্ষ হবে?

কয়েকটি কারণে এই উপনির্বাচনটি গুরুত্বপূর্ণ

১. আসনটি শূন্য হয় বিএনপির সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হওয়ার কারণে। উপনির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন তারই ছোট ভাই, যিনি ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপিরও সভাপতি। শুরুতে এখানে মির্জা ফখরুলের অস্ট্রেলিয়া-প্রবাসী মেয়েকে প্রার্থী করা হতে পারে বলে শোনা গেলেও তিনি ব্যক্তিগত কারণে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সম্মত হননি বলে শোনা যায়। কিন্তু মেয়ে রাজি না হলেও মির্জা ফখরুলের পরিবার থেকেই প্রার্থী হয়েছেন। ফলে এই নির্বাচনে তার জয় পাওয়াটা রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল এবং তার পরিবারের জন্য প্রেস্টিজ ইস্যু হয়ে উঠতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।

২. এটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত তারেক রহমান সরকারের আমলে প্রথম নির্বাচন। ফলে এই নির্বাচনে সরকার ও সরকারি দলের আচরণের ওপর সারা দেশ, এমনকি বহির্বিশ্বেরও নজর থাকবে।

৩. জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতায় মির্জা ফয়সল আমিন তার বড় ভাই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সমকক্ষ নন। বরং তাকে নিয়ে স্থানীয় রাজনীতিতে কিছু বিতর্কও হয়েছে। বিশেষ করে গত বছরের জুলাই মাসে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা বিএনপির সম্মেলনে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচনের ফল ঘোষণা নিয়ে উত্তেজনা এবং একপর্যায়ে ফয়সল আমিনের গাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। তাছাড়া পারিবারিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বনাম স্থানীয় রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার মধ্যেও কিছু সংঘাত আছে।

৩. এই আসনে বিরোধী দল জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা দেলাওয়ার হোসেন ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের একজন প্রভাবশালী নেতা, যিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মির্জা ফখরুলের কাছে বড় ব্যবধানে হেরেছিলেন। অতীতে কখনও এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী জয়ী না হলেও এখানে তাদের ‘নীরব ভোটব্যাংক’ আছে বলে অনেকে মনে করেন। সেইসঙ্গে জুলাই অভ্যুত্থানের পরে দেশে ডানপন্থার উত্থান ও বিকাশের সুযোগ নিয়ে দেলাওয়ার হোসেনও ধর্মীয় মূল্যবোধ ও স্থানীয় তৃণমূল যোগাযোগকে নিজের শক্তি বলে মনে করেন। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) নির্বাচনি প্রচারে স্থানীয় প্রশাসনকে উদ্দেশ করে তিনি বলেছেন, ‘‘এই উপনির্বাচনের ওপর নির্ভর করবে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে, নাকি দুর্নীতিগ্রস্ত হবে।’’

৪. আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনে বহু বছর বিএনপি ও জামায়াত একই প্ল্যাটফর্মে থাকলেও ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পরে ‘দুজনার দুটি পথ দুটি দিকে গেছে বেঁকে’। বিএনপি সরকারে। জামায়াত বিরোধী দলে। শুধু তাই নয়, সরকার গঠনের ছয় মাসের মাথায় নানা দাবিতে লংমার্চের মতো কর্মসূচি দিয়েছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধীদলীয় জোট। জোটের অনেক শীর্ষ নেতা সরকার পতনেরও হুমকি দিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, বিএনপি অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া সংস্কারের প্রত্যাশাকে পাশ কাটিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোয় দলীয়করণ করেছে। তারাও ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটছে। ফলে সরকারের জনপ্রিয়তা কমেছে বা বিরোধী দলের জনপ্রিয়তা বেড়েছে—এটি প্রমাণের জন্য এই উপনির্বাচনে নিজেদের প্রার্থীকে জিতিয়ে আনতে সর্বশক্তি নিয়োগ করবে ১১ দলীয় জোট—এমন ধারণাও অনেকে পোষণ করেন।

৫. উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হেরে গেলে বিরোধীরা এটা বলার সুযোগ পাবে যে সরকারের জনপ্রিয়তা কমেছে। সেটি সরকারের জন্য বিব্রতকর হতে পারে। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও প্রভাব ফেলতে পারে।

৬. বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধারাবাহিকতায় প্রকৃত ভোটে জামায়াত তথা ১১ দলের প্রার্থী হেরে গেলেও তারা নির্বাচনে কারচুপি ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ আনতে পারে। সেক্ষেত্রে বিএনপি তথা সরকারকে এই নির্বাচনকে শতভাগ ত্রুটিমুক্ত রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। অর্থাৎ যাতে কোনোভাবেই এখানে মাগুরা-২ আসনের উপনির্বাচনের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

তবে এটা ঠিক যে মাগুরা-২ আসনের সঙ্গে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের তুলনা করার সুযোগ কম। কেননা, ১৯৯৪ সালে মাগুরা-২ আসনে তৎকালীন দল বিরোধী আওয়ামী লীগের যে প্রভাব ছিল, ২০২৬ সালে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বর্তমান বিরোধী দল জামায়াতের সেই প্রভাব ও জনপ্রিয়তা নেই। তাছাড়া এই আসনে অতীতের নির্বাচনে ফলাফল এবং এখানকার যে রাজনৈতিক অঙ্ক, তাতে জামায়াত তথা ১১ দলের চেয়ে বিএনপির ভোট অনেক বেশি। যেহেতু নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেই, ফলে শত ভাগ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলেও বিএনপির প্রার্থীর জয়ী হওয়ার কথা। ‍সুতরাং, সরকার তথা বিএনপি এই নির্বাচনে কোনও ধরনের প্রভাব বিস্তার না করে বিরোধীদের হাতে আন্দোলনের নতুন অস্ত্র তুলে দেবে না, এটিই প্রত্যাশা।

আবার যদি সরকারের প্রথম সাত মাসের অভিজ্ঞতায় এই আসনের ভোটাররা মনে করেন যে তারা সরকারি দলের প্রার্থীকে ভোট দেবেন না, সেই অধিকারও ভোটারদের আছে এবং ভোটারদের এই অধিকারকে সম্মান করতে হবে। কিন্তু ব্যক্তি, পরিবার ও দলের প্রেস্টিজ ইস্যু যেন ভোটারদের অধিকার ক্ষুণ্ন না করে; প্রতিদ্বন্দ্বী সব প্রার্থীর জন্য যাতে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হয়—সে বিষয়ে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে। না হয় একটি উপনির্বাচনে কারচুপির পরিণতিও বৃহত্তরভাবে দলের জন্য যে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, তার উদাহরণ মাগুরা-২ উপনির্বাচন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বিএনপি শিক্ষা নেবে, এটিই প্রত্যাশা।

আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক