ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের পেছনে দেয়াল ঘেঁষে একটু খালি জায়গা। ৬ অক্টোবর, বিকেল ৫টা। আনুমানিক ৪০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি শোওয়া। নড়াচড়া তেমন নেই। ডান পায়ের গোড়ালিতে ব্যান্ডেজ করা। পাশ দিয়ে একের পর এক মানুষ যাচ্ছে, কারও সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। আশপাশের কেউও জানেন না লোকটি কোথা থেকে এসেছেন, পরিবার কোথায়। লোকটির সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেও কোনো উত্তর পাওয়া গেল না।
লোকটি যে স্থানে শুয়ে ছিলেন, ওইদিন সকালে সেখান থেকেই একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পরিচয় বের করতে পারেনি পুলিশ। একই দিন কাছাকাছি সময়ে ওই স্থান থেকে কিছুটা দূরে পাওয়া যায় আরও একজনের মরদেহ। তিনিও অজ্ঞাতপরিচয়। পুলিশ সদস্যদের ধারণা, অসুস্থতাজনিত কারণে তাদের মৃত্যু হয়েছে। শুধু এই দুজন নয়, শাহবাগ থানাধীন এলাকায় গত এক মাসে অন্তত ১৫ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের কারও পরিচয় বের করা যায়নি। বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, ঢাকা মেডিকেলের আশপাশসহ এই এলাকায় বিপুলসংখ্যক ভাসমান মানুষ থাকে। পুরো শাহবাগ এলাকায় এমন মানুষের সংখ্যা অনেক। এর মধ্যে আছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা, জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট এলাকা, চাঁনখাঁরপুল ও হাইকোর্টের মাজার, দোয়েল চত্বর ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা।
পুলিশের তথ্যমতে, ঢাকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ পাওয়া যায় শাহবাগ এলাকায়। গত ২৯ সেপ্টেম্বর এ এলাকায় এক দিনে তিনজনের মরদেহ পাওয়া যায়। আগের দিন ২৬ সেপ্টেম্বর একই এলাকা থেকে চারজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করা হয়।
রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এ এলাকায় সরকারি-বেসরকারি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান আছে। জায়গাটি একই সঙ্গে পরিচয়হীন মানুষের ঠিকানাও। মৃত্যুর পর যাদের অধিকাংশের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে না।
শাহবাগ থানা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে শাহবাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও আশপাশের এলাকা থেকে ৭৯টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৪ জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। ৬৫ জনের পরিচয় মেলেনি। এর আগে ২০২৫ সালে ৮১টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে পরিচয় শনাক্ত হয় ১৩ জনের। গত ২১ মাসে উদ্ধার হওয়া ১৬০টি মরদেহের মধ্যে পরিচয় মিলেছে ২৭টির। পরিচয়হীন থেকে গেছেন ১৩৩ জন, যা শতকরা হিসাবে অজ্ঞাতনামা ৮৩ শতাংশ।
এদিকে ডিএমপির তথ্য মতে, ২০২৫ সালে ঢাকা মহনগর পুলিশের আট বিভাগে ২১৪টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৮১টি হয়েছে রমনা বিভাগে, যার বেশির ভাগই শাহবাগ থানাধীন এলাকার। অন্য বিভাগগুলোর মধ্যে তেজগাঁওয়ে ৫১টি, ওয়ারীতে ২১, লালবাগে ১৭, মতিঝিলে ১৭, মিরপুরে ১২, উত্তরায় ৯ এবং সবচেয়ে কম গুলশানে ৬টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আর চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ঢাকা মহানগরীতে ৭৬টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৩১টি রমনার এবং অধিকাংশই শাহবাগ এলাকার। এর পরের স্থান মতিঝিলের ১৪টি। তারপর ওয়ারী ১৩টি।
পুলিশের তথ্য ও মরদেহের নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, মারা যাওয়া ব্যক্তিদের অধিকাংশের বয়স ৪০ বছরের বেশি। তাদের বড় একটি অংশ মাদকাসক্ত। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়া, দীর্ঘদিন চিকিৎসার বাইরে থাকা এবং শরীরে পচন ধরার মতো জটিলতায়ও অনেকের মৃত্যু হয়েছে।
পুলিশ ও চিকিৎসকরা জানান, অজ্ঞাতপরিচয় মানুষগুলো মূলত ভাসমান। তাদের নিয়মিত চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য নেই, পুষ্টিকর খাবারও খেতে পারে না। দেখা যায়, ঠান্ডাজনিত রোগ, বার্ধক্যজনিত জটিলতা বা অন্যান্য অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়ে তুলনামূলক কম বয়সে তারা মারা যান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক সমকালকে বলেন, গৃহহীন, পারিবারিকভাবে বিচ্ছিন্ন, মানসিকভাবে অসুস্থসহ মানুষ নানা কারণে ভবঘুরে হয়, সড়কে আশ্রয় নেয়। রাজধানীতে এসব মানুষের পরিচয় বা তালিকা সরকারের পক্ষ থেকে করা প্রয়োজন। এতে একদিকে তারা কোনো অপরাধে জড়িয়ে গেলে তা যেমন চিহ্নিত করা সম্ভব, অন্যদিকে মৃত্যুর পরও তাদের পরিচয় জানা ও স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সহজ হবে। এটি সরকারের অন্যতম জনকল্যাণমূলক দায়িত্ব।
শাহবাগ এলাকায় কেন এত ভাসমান মানুষ
গত দুই মাসে শাহবাগ এলাকার ভাসমান লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও শাহবাগ এলাকায় পুলিশের তৎপরতা কম থাকায় জায়গাগুলোকে নিরাপদ মনে করেন তারা। এ ছাড়া হাইকোর্ট ও দোয়েল চত্বরের পাশের মাজারে দিনে দুবেলা বিনামূল্যে খাবার পাওয়ায় এসব এলাকায় থাকেন অনেকে। খাবারের জন্য জাতীয় স্টেডিয়াম, পুরান ঢাকা ও কমলাপুর থেকেও অনেকে আসেন।
জাতীয় ঈদগাহের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে শাহ খাজা শরফুদ্দীন চিশতির (রহ.) মাজারের (হাইকোর্ট মাজার) পক্ষ থেকে প্রতিদিন রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়। সেখানে আগে থেকেই ভিড় করে ভবঘুরে ও ভাসমান মানুষ।
মাজারের বাবুর্চি মো. নাজমুল হোসেন সমকালকে জানান, প্রতিদিন দুপুরে ও সন্ধ্যায় প্রায় ৫০০ জনের খাবার রান্না করে দেওয়া হয়। এর মধ্যে অর্ধেকই থাকে ভবঘুরে প্রকৃতির মানুষ। তারা আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে জড়ো হন।
এ ছাড়া ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আশপাশে অস্থায়ী খাবারের দোকান, অমর একুশে হল ও আবাসিক এলাকার সামনে আনন্দ বাজার থেকে ভবঘুরে লোকজন খাবার সংগ্রহ করেন। তাই এসব এলাকায় অনেকে থাকেন।
দোয়েল চত্বরের পাশে ঢাকা গেটে সাগর নামে মধ্যবয়সী এক ভবঘুরে জানান, পরিবার ছেড়ে পাঁচ-ছয় বছর ধরে দোয়েল চত্বরের আশপাশে থাকেন। এ সময়ে তাঁর আশপাশে থাকা সাত-আটজন মারা গেছেন। সারাদিন ওই এলাকাতেই থাকেন। তিনিসহ তাঁর মতো সবাই পাশের মাজার থেকে খাবার খান। হাইকোর্টের মাজার গেটে নূর আলম নামের এক ভবঘুরে বলেন, ‘কোনো কাজ করি না। মাজার থেকে খাবার খাই।’
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের পাশে জাহাঙ্গীর আলম জানান, তিনি অনেক দিন ধরে অসুস্থ। বেশি নড়াচড়া করতে পারেন না। খাবার দেন আশপাশের দোকানিরা।
বছরে গড়ে ২৯২ অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের ময়নাতদন্ত
ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন অ্যান্ড টক্সিকোলজি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত বিভাগটিতে এক হাজার ৬৯০টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২১ সালে ২৪৮টি, ২০২২ সালে ২৩০টি, ২০২৩ সালে ২৫০টি, ২০২৪ সালে ৩২৪টি, ২০২৫ সালে ৩৮৪টি এবং চলতি বছর আগস্ট পর্যন্ত ২৫৪টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়। এভাবে প্রায় পৌনে ছয় বছরে গড়ে ২৯২টি মরদেহের ময়নাতদন্ত হয়েছে। শীতকালে অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি থাকে।
চিকিৎসকরা জানান, অজ্ঞাত মরদেহের পরিচয় শনাক্তে ময়নাতদন্তের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা হয়। মরদেহের দাঁত ও হাড়ের নমুনা সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করা হয়। এসব নমুনা প্রয়োজন অনুযায়ী ঢামেক ও সিআইডিতে রাখা হয়, যাতে পরবর্তী সময়ে স্বজনের সন্ধান পাওয়া গেলে ডিএনএ পরীক্ষাসহ অন্যান্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করা যায়।
ঢামেকের ফরেনসিক মেডিসিন অ্যান্ড টক্সিকোলজি বিভাগের প্রধান ডা. মমতাজ আরা সমকালকে বলেন, বিভিন্ন স্থানে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় মারা যাওয়া ব্যক্তিদের অনেকেই সেপটিক শকে আক্রান্ত ছিলেন। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ একে একে অকার্যকর হয়ে গেলে এ ধরনের রোগীরা সেপটিক শকে মারা যান।
পরিচয় শনাক্তে পুলিশ যা করে
পুলিশ জানিয়েছে, প্রতিটি মরদেহের পরিচয় শনাক্তে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়। পরে সিআইডি ও পিবিআইর মাধ্যমে এসব তথ্য জাতীয় তথ্যভান্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু যাদের জাতীয় পরিচয়পত্র কখনও করা হয়নি তাদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। আবার মরদেহ পচে যাওয়ায় অনেক সময় আঙুলের ছাপ বা অন্যান্য বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না।
ফিঙ্গার প্রিন্টের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করা না গেলে সারাদেশের থানাগুলোতে বার্তা পাঠানো হয়। পাশাপাশি ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারের মাধ্যমেও পরিচয় শনাক্তের জন্য তথ্য প্রচার করা হয়। দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হলে মরদেহের ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ করা হয়।
শাহবাগ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জাহাঙ্গীর আলম সমকালকে বলেন, অজ্ঞাতপরিচয়ের যেসব মরদেহ উদ্ধার করা হয়, তাদের অধিকাংশেরই কোনো পরিচয়পত্র থাকে না। এ কারণে বেশির ভাগ মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। পরিচয় না পেলে আইনগত প্রক্রিয়া শেষে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে সেগুলো আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
বছরে ৫৭৭ বেওয়ারিশ লাশ দাফন
আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজধানীতে ৪৬০টি মরদেহ দাফন করা হয়েছে। ২০২৫ সালে ৬৪৪টি, ২০২৪ সালে ৫৭০টি এবং ২০২৩ সালে ৪৯০টি মরদেহ দাফন করা হয়। এই চার বছরে রাজধানীতে মোট দুই হাজার ১৬৪টি মরদেহ দাফন করা হয়েছে। এসব মরদেহ রাজধানীর রায়েরবাজার ও জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বছরে গড়ে প্রায় ৫৭৭টি মরদেহ দাফন করা হয়েছে। পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বেওয়ারিশ মরদেহ গ্রহণের পর প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সেগুলো রায়েরবাজার ও জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়।
আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের দাফন সেবা কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা মরদেহের তালিকা সংরক্ষণ করা হয়। মরদেহ দাফন করার পর কোনো পরিবার-স্বজনের খোঁজ পাওয়া গেলে তাদের আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই কবর চিহ্নিত করে দেওয়া হয়।