দেশের প্রথম বিশেষায়িত পাবনা মানসিক হাসপাতাল কার্যত নিজেই রোগী। কার্যক্রম চলছে আড়াই দশক আগের জনবলে। সামাজিক অবহেলার পাশাপাশি সরঞ্জাম সংকট প্রবল। ৫০০ শয্যার হাসপাতালটি ধুঁকলেও কর্তৃপক্ষ নির্বিকার। এমন পরিস্থিতিতে শনিবার (১০ অক্টোবর) অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে পালিত হবে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। দিবসের প্রতিপাদ্য– ‘অর্জিত অভিজ্ঞতা শোনা: প্রকৃত কণ্ঠস্বর, প্রকৃত পরিবর্তন’।
পাবনা মানসিক হাসপাতালের পরিচালক ডা. শাফকাত ওয়াহিদ বলেন, ‘মানসিক রোগ ডায়াবেটিসের মতো। সবসময় নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। তাদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক ও অমানবিক আচরণ করলে অবস্থা জটিল আকার নেয়। এজন্য আমরা সতর্ক থাকি। কিন্তু সারা দেশ থেকেই রোগী আসে। শয্যা সংকটে অনেককে ফেরত দিতে হয়।’
সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে হাসপাতালে নারীদের ৫ ও পুরুষদের ১৪টি ওয়ার্ড রয়েছে। এখানে ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। ভর্তিতে ১৫ টাকা লাগে। সঙ্গে দিতে হয় হালনাগাদ নাগরিকত্ব ও জন্মসনদ। পেয়িং শয্যার জন্য মাসে ৯ হাজার ৭৫০ টাকা দিতে হয়। শিশু-কিশোর ও আত্মহত্যাপ্রবণ রোগীদের ভর্তি নেওয়া হয় না।
১৯৫৭ সালে তৎকালীন পাবনার সিভিল সার্জন মোহাম্মদ হোসেন গাঙ্গুলীর উদ্যোগে শীতলাই জমিদার বাড়িতে ৬০ শয্যার মানসিক হাসপাতাল শুরু হয়। দুই বছর পরে পাবনা শহর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে হেমায়েতপুরে ১১১.২৫ একর জমিতে হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়। এরমধ্যে পরে ৩০ একর জমি পাবনা মেডিকেল কলেজকে দেওয়া হয়। ১৯৬৬ সালে শয্যা বাড়িয়ে ১৫০, পরে ২০০ এবং সর্বশেষ ১৯৯৬ সালে এটি ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। এর মধ্যে ৩৫০ বিনামূল্যের; পেয়িং শয্যা ১৫০টি।
কাগজেই ৫০০ শয্যা, চিকিৎসক-নার্সসহ খালি ১১৯ পদ
২৫০ থেকে কাগজে-কলমে ৫০০ শয্যা হয়েছে পাবনা মানসিক হাসপাতাল। তবে প্রশাসনিক এবং জনবল কাঠামো এখনো আড়াই দশক আগের। রাজধানীর ২০০ শয্যার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে যেখানে ৫০ চিকিৎসক, সেখানে পাবনায় ৫০০ রোগীর বিপরীতে অনুমোদিত চিকিৎসক ৩১ জন। এর মধ্যে ৯ পদ দীর্ঘদিন শূন্য। প্রথম শ্রেণির সাত পদের মধ্যে চার, নার্সসহ দ্বিতীয় শ্রেণির সাত, তৃতীয় শ্রেণির ২৩ ও চতুর্থ শ্রেণির ১৭০ পদের মধ্যে খালি ১১০টি।
মানসিক রোগীর চিকিৎসায় জরুরি তিনটি ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট পদে কেউ নেই। পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ইইজি ও ইলেকট্রোকনভালসিভ থেরাপির যন্ত্রগুলো পরিচালকের কক্ষে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। অথচ বহির্বিভাগের রোগীদের পরীক্ষা করার জন্য শহরের বেসরকারি সেন্টারে যেতে হয়।
হাসপাতালের কর্মীরা জানান, রোগীদের চার বেলা খাবারে বরাদ্দ মাত্র ১৭৫ টাকা। এর মধ্যে আবার ১৮ শতাংশ ভ্যাট-ট্যাক্স কাটে। ফলে রোগীদের ন্যূনতম পুষ্টিমানের খাবারও দেওয়া যায় না।
রোগের ধরন বদলাচ্ছে
বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা শিশু ও তরুণদের মানসিক রোগের ধরন বদলে গেছে। হাসপাতালের সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. সামিনা আক্তার ও ডা. একেএম শফিউল আযম বলছিলেন, প্রযুক্তির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার ও খেলার মাঠের অভাব তরুণ প্রজন্মকে মানসিক ঝুঁকিতে ফেলছে।
এই দুই চিকিৎসকের ভাষ্যে, শারীরিক পরিশ্রমের ঘাটতি ও পারিবারিক যোগাযোগের অভাবে তরুণেরা নানা সমস্যায় পড়ছেন। ফলে তাদের মধ্যে মাত্রাতিরিক্ত মোবাইল আসক্তি ও অনলাইন জুয়ায় জড়ানোর প্রবণতা বাড়ছে। পাশাপাশি তরুণদের মাঝে অপজিশনাল ডেফিয়েন্ট ও কন্ডাক্ট ডিজঅর্ডারের মতো জটিলতা বহুগুণ বেড়ে গেছে। এই তীব্র প্রযুক্তিনির্ভরতা মাদকাসক্তির মতোই মস্তিষ্কে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। ডিভাইস আসক্তি কাটাতে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং চালু করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে তরুণদের জন্য মাঠভিত্তিক খেলাধুলা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়ানো দরকার মনে করেন ডা. সামিনা আক্তার ও ডা. শফিউল আযম।
পুনর্বাসন কার্যক্রম বন্ধ, বাড়তি ‘উপদ্রব’ কনটেন্ট ক্রিয়েটর
একসময় চিকিৎসার অংশ হিসেবে হাসপাতালে তাঁতশিল্প, বেত ও কাঠের কাজ এবং দর্জির প্রশিক্ষণ চালু ছিল। এসব এখন বন্ধ। সংশ্লিষ্ট ভবন আনসার সদস্যদের ব্যারাক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। শুধু খাওয়া-দাওয়া আর ঘুমানোতে আটকে রোগীদের জীবন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন কনটেন্ট ক্রিয়েটররা। তাদের অনেকেই নিরাপত্তার ফাঁক গলে ভেতরে রোগীদের প্রলোভন দেখিয়ে উসকানিমূলক ভিডিও করছেন। পরে তা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এভাবে রোগী ও তার স্বজনদের সামাজিকভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঝাড়ফুঁকে জটিলতা
ডা. সামিনা আক্তার জানান, সামাজিক সচেতনতার অভাবে মানসিক রোগীরা সঠিক সময়ে চিকিৎসা পাচ্ছেন না। শুরুতেই কবিরাজের ঝাড়ফুঁক দেওয়া হয়। বিশেষ করে নারীদের ‘কনভার্সন ডিজঅর্ডার বা হিস্টিরিয়ার’ লক্ষণকে গুরুত্ব না দিয়ে কবিরাজি চিকিৎসা করানো হচ্ছে। প্রচুর টাকা-পয়সা নষ্ট করার পরও রোগীর উন্নতি না পেলে অভিভাবকেরা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন।
তিনি বলেন, অনেকেই মানসিক সমস্যার জন্য নিউরোলজিস্ট বা মেডিসিন বিশেষজ্ঞের কাছে যাচ্ছেন। মানসিক চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছেন না। এতে চিকিৎসা প্রক্রিয়া অনেক জটিল হয়ে পড়ছে।
ডা. শফিউল আযম বলেন, পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করার আগে অনেকেই ভুয়া ঠিকানা দিয়ে রোগীকে হাসপাতালে ফেলে যেতেন। ১৯৯৫ সালে ভর্তি রোগী তিন দশকেও পরিবারের দেখা পাননি, এমন আমরা পেয়েছি। অনেককেই পরে আদালতের মাধ্যমে সেফ হোমে দিয়েছি। এভাবে ফেলে যাওয়া চরম অমানবিক। আমাদের সমাজ এখনো মানসিক রোগকে স্বাভাবিক অসুস্থতা হিসেবে মানতে পারছে না।
দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি
পাবনা মানসিক হাসপাতালের পরিচালক ডা. শাফকাত ওয়াহিদ জানান, সরকার হাসপাতালটিকে এক হাজার শয্যার আন্তর্জাতিক মানের ইনস্টিটিউটে রূপান্তরে ১ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প নিয়েছে। একনেকে ইতোমধ্যে প্রকল্পটি অনুমোদন হয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক গোলাম ফারুক সরকার বলছিলেন, শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নে মানসিক রোগের লাগাম টানা সম্ভব নয়। হাজার শয্যায় উন্নীত করলে হয়তো অবকাঠামোগত রূপ বদলে যাবে। কিন্তু সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি না বদলালে রোগীদের প্রতি অবহেলা থেকেই যাবে। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সবার আগে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে হবে।