অবিবাহিত হওয়ায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন থেকে ফিরিয়ে দেওয়া তিন তরুণীর একজন রিফা তামান্নার বাবাকে ফোন করেও অপমানজনক কথা বলেছিলেন এক পুলিশ কর্মকর্তা। পুলিশের বিশেষ শাখায় (এসবি) দেওয়া জবানবন্দিতে এমন অভিযোগ করেছেন রিফা।
তার দাবি, ফোনে তার চরিত্র নিয়ে কুরুচিপূর্ণ ইঙ্গিত করার পাশাপাশি কৃষক পরিবারের সন্তান হওয়ায় তাদের আর্থিক সামর্থ্য নিয়েও কটাক্ষ করা হয়।
রিফার অভিযোগ, পুলিশের ওই আচরণে তার বাবা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। পরে ১৭ আগস্ট সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
গত ৮ আগস্ট নেপালে বেড়াতে যাওয়ার জন্য বিমানবন্দরে যান তিন তরুণী। তবে ইমিগ্রেশনে নানা ব্যক্তিগত প্রশ্নের মুখে পড়েন তারা। একপর্যায়ে তাদের বিদেশযাত্রার অনুমতি দেওয়া হয়নি। এ ঘটনায় তারা হাইকোর্টে রিট করেন।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে আবেদনকারীদের অভিযোগ সাত দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।
আদালতের নির্দেশের পর পুলিশের বিশেষ শাখা অভিযোগ তদন্ত শুরু করে। এর অংশ হিসেবে গত বৃহস্পতিবার রাজারবাগে এসবির কার্যালয়ে গিয়ে জবানবন্দি দেন তিন তরুণী। এ সময় তাদের সঙ্গে ছিলেন দুই আইনজীবী মমতাজ মৌ ও ইফ্ফাত হাসান শাম্মী।
বাবাকে ফোন করে কটাক্ষের অভিযোগ
জবানবন্দিতে ঠাকুরগাঁও সরকারি মহিলা কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী রিফা তামান্না বলেন, বিমানবন্দরে প্রবেশের পর থেকেই ইমিগ্রেশন পুলিশের সদস্যরা তাদের সঙ্গে বৈরী ও কুরুচিপূর্ণ আচরণ করেন। তার স্টুডেন্ট আইডি কার্ডের ছবি নিয়েও কটাক্ষ করা হয়।
একপর্যায়ে এক পুলিশ সদস্য তার বাবাকে ফোন করে পরিবারের আয়ের উৎস সম্পর্কে জানতে চান।
রিফার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই কর্মকর্তা তার বাবাকে বলেন, ‘আপনার মেয়ে কী করে না করে তার খবর রাখেন? কৃষকের মেয়ে হয়ে কী করে ঘুরতে দেশের বাইরে যাচ্ছে?’
রিফার অভিযোগ, মেয়ের চরিত্র ও বিদেশযাত্রা নিয়ে এমন অপমানজনক কথাবার্তায় তার বাবা মানসিকভাবে মারাত্মক আঘাত পান। পরে ১৭ আগস্ট সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।
রিফা জানান, তার বাবার সঙ্গে ফোনে এমন আচরণ করা পুলিশ কর্মকর্তার গড়ন ছিল পাতলা এবং তিনি ছিলেন লম্বা।
মাইন্ডউইজের প্রধান মনোবিজ্ঞানী ফয়সাল আহমেদ রাফি টাইমসকে বলেন, পরিবারের সদস্য বা প্রিয়জনকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য কিংবা ভিত্তিহীন অভিযোগ শুনলে মানুষ তাৎক্ষণিক মানসিক ধাক্কায় পড়তে পারেন। এ ধরনের অভিজ্ঞতা মানসিক আঘাতের সৃষ্টি করতে পারে। এতে আবেগ নিয়ন্ত্রণ, পরিস্থিতি মূল্যায়ন ও স্বাভাবিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানানোর ক্ষেত্রে সাময়িক সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তিনি বলেন, এমন মানসিক আঘাতে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, দুঃস্বপ্ন ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা সাময়িকভাবে দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
রিফাসহ তিন তরুণীর লিখিত জবানবন্দি পেয়েছে টাইমস। তবে এ বিষয়ে এসবির কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন শাখার বিশেষ পুলিশ সুপার মো. মনিরুজ্জামান মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘বিচারাধীন কোনো বিষয় মন্তব্য করতে রাজি না আমি। মাফ করবেন।’
সাবেক আইজিপি বাহারুল আলম বলেন, যাত্রীদের সঙ্গে কুরুচিপূর্ণ ও অপমানজনক আচরণ ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের পেশাগত দায়িত্ব ও আচরণবিধির পরিপন্থী।
তিনি বলেন, একই ধরনের অভিযোগ একাধিকবার উঠলে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণে মানবিক মর্যাদা, যাত্রীদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ ও পেশাগত নৈতিকতা নিয়ে আলাদা মডিউল যুক্ত করা উচিত। বিশেষ করে ইমিগ্রেশন ডেস্কে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি।
‘যা ঘটেছে, তা যৌন হয়রানির চেয়ে কম নয়’
ভুক্তভোগী আরেক তরুণী নাজনীন বলেন, প্রয়োজনীয় ভ্রমণ নথি যাচাই না করেই পুলিশ তাদের বারবার অসংগতিপূর্ণ ও ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে। নেপালে তাদের সমন্বয়কের পরিচয় নিয়েও কটাক্ষ করা হয়।
নাজনীন জানান, তিনি বারবার লিখিত বা আইনগত কারণ জানতে চাইলেও কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাননি। একপর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘আপনারা অবিবাহিত, তাই আপনাদের যেতে দেওয়া হচ্ছে না।’
পরে কোনো লিখিত আদেশ বা আনুষ্ঠানিক কারণ না দেখিয়ে অ্যারাইভাল টার্মিনাল দিয়ে তাদের বিমানবন্দর থেকে বের করে দেওয়া হয়। সেখানে অবস্থান করলে আরও বড় সমস্যায় পড়তে হবে বলেও তাদের ভয় দেখানো হয়।
তৃতীয় ভুক্তভোগী ঠাকুরগাঁওয়ের শিক্ষার্থী সোহানি ইসলাম সমাপ্তি অভিযোগ করেন, তাদের সঙ্গে এমন কথাবার্তা বলা হয়েছে, যা শালীনতার সীমা ছাড়ানোর পাশাপাশি যৌন হয়রানিমূলকও ছিল।
সোহানিকে ইমিগ্রেশন কক্ষে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিনকে ফোন দিতে বলা হয়। তার কাছে ব্যাংক স্টেটমেন্টও চাওয়া হয়। নথিটি সঙ্গে না থাকায় এক পুলিশ কর্মকর্তা প্রশ্ন করেন, ‘তাহলে টাকা কি অবৈধভাবে আসে?’
সোহানি লিখিত জবানবন্দিতে বলেন, “অফিসে চেয়ারে বসা এক কর্মকর্তা তাদের উদ্দেশ্য করে ইঙ্গিতে বলেন, ‘কী কাজ করতে যাচ্ছেন বুঝতে পারছি’।”
তিনি অভিযোগ করেন, কথা বলার সময় ওই কর্মকর্তার দৃষ্টি ছিল তাদের শরীরের দিকে।
জবানবন্দি অনুযায়ী, ওই কক্ষে তিনজন পুলিশ সদস্য ছিলেন। তাদের একজনের নাম আব্দুল্লাহ।
ভ্রমণের উদ্দেশ্য নিয়ে ব্যাখ্যা
পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে তিন তরুণী ভ্রমণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে একই ধরনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
তারা জানান, তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল পর্যটন এবং পাসপোর্টে ভ্রমণের রেকর্ড বাড়ানো। তারা বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল মেডিয়েশন সোসাইটির (বিআইএমএস) সঙ্গে যুক্ত। নেপালে সংগঠনটির একটি নিবন্ধিত শাখা রয়েছে। ভ্রমণের অংশ হিসেবে সেখানকার সমন্বয়ক সিমরান নাপিতের মাধ্যমে নেপালের প্রধান বিচারপতির সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ ও নৈশভোজের পরিকল্পনা ছিল তাদের।
সিমরান নাপিত নেপাল সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে কর্মরত।
তরুণীরা জানান, সফরটি সরকারি ছিল না। তাই তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্রও ছিল না। তাদের দাবি, এ ধরনের ব্যক্তিগত পর্যটন ভ্রমণে আমন্ত্রণপত্রের প্রয়োজন নেই। তাদের কাছে ফিরতি ফ্লাইটের টিকিট ও হোটেল বুকিংয়ের নথি ছিল। বিআইএমএসে কাজ বা ইন্টার্নশিপ করার কারণে ব্যক্তিগত ভ্রমণের জন্য তাদের নো-অবজেকশন সার্টিফিকেটের (এনওসি) বাধ্যবাধকতাও ছিল না।
অভিযোগ করেও প্রতিকার না পেয়ে হাইকোর্টে
তিন তরুণী জানান, হাইকোর্টে যাওয়ার আগে গত ৩০ আগস্ট পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন তারা। এতে বিমানবন্দরে অপমানজনক আচরণ, আর্থিক ও পেশাগত বিষয় নিয়ে কটাক্ষ এবং রিফার বাবার মৃত্যুর প্রসঙ্গ তুলে তদন্ত ও দায়ীদের শাস্তি দাবি করেন।
গত ৬ সেপ্টেম্বর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিপ্লোমেটিক অ্যান্ড প্রটোকল) শারমিন জাহান ও বিশেষ পুলিশ সুপার (ইমিগ্রেশন-প্রশাসন) এ টি এম শাহীন আহমেদের উপস্থিতিতে তাদের বিস্তারিত জবানবন্দি নেওয়া হয়।
তবে অভিযোগের বিষয়ে প্রতিকার না পেয়ে তারা হাইকোর্টে রিট করেন।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের বেঞ্চ রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে রুল জারি করেন।
রুলে জানতে চাওয়া হয়, বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও তিন তরুণীকে বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও অবৈধ ঘোষণা করা হবে না।
প্রাপ্তবয়স্ক নারী নাগরিকদের বৈধ বিদেশযাত্রায় শুধু অবিবাহিত হওয়া, অভিভাবক ছাড়া ভ্রমণ করা কিংবা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যমূলক অজুহাতে বাধা না দিতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা কেন দেওয়া হবে না, তাও জানতে চান আদালত।
একই সঙ্গে গত ৩০ আগস্ট পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপির কাছে করা অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়।
আদালতের আদেশের পর অভিযোগ তদন্ত শুরু করে এসবি। এর অংশ হিসেবে গত ৬ অক্টোবর তিন তরুণীকে চিঠি পাঠানো হয়। নির্দেশনা অনুযায়ী বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় রাজারবাগে এসবির ৪০৯ নম্বর কক্ষে উপস্থিত হয়ে তারা জবানবন্দি দেন।
আইনজীবী ইশরাত হাসান টাইমসকে বলেন, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তিন নারীর সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। এখন সিসিটিভি ফুটেজ, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করবে পুলিশ।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এতে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা যাবে বলেও মনে করেন তিনি।
ইশরাত হাসান বলেন, বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে শুধু এই তিন নারী নন, অনেক পুরুষ যাত্রীও হয়রানির শিকার হন। বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও বিদেশগামী যাত্রীদের অপ্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ ও বাধার মুখে পড়তে হয়। অনেক দেশে এমন পরিস্থিতি দেখা যায় না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিন তরুণীর অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের পর আরও অনেক ভুক্তভোগী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজেদের বিরূপ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরছেন।