Image description

ধরুন, আপনি রাস্তায় হাঁটছেন। এ সময় পুলিশ বা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কর্মকর্তাদের সন্দেহ হলো, মাদকের সঙ্গে আপনার কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা রয়েছে।

নতুন আইনে আদালতের আগাম অনুমোদন ছাড়াই সেই সন্দেহের ভিত্তিতে জব্দ করা হতে পারে আপনার মোবাইল ফোন। এরপর ফোনটি পাঠানো হতে পারে ডিএনসির ডেটা ফরেনসিক সেন্টারে।

সেখানে ক্লোন করা হবে ফোনের সবকিছু—মেসেজ, ছবি, কল রেকর্ড, সব। আর যদি স্ক্রল করতে করতে বেরিয়ে আসে বন্ধুর পাঠানো একটা পুরোনো এসএমএস— ‘মামা, মাল আছে?’—তাহলে পড়তে হবে এমন এক আইনের আওতায়, যেখানে সাজা হিসেবে আছে ন্যূনতম পাঁচ বছরের কারাদণ্ড থেকে শুরু করে যাবজ্জীবন, এমনকি মৃত্যুদণ্ড।

গত ১৬ জুলাই গেজেট আকারে প্রকাশিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর কয়েকটি বিধান নিয়ে এমন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে। সরকারি কর্মীদের এভাবে ঢালাও আইনি ক্ষমতা দেওয়ার অতীত অভিজ্ঞতা সুখকর হয়নি বলছেন তারা।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এভাবে অস্পষ্ট সংজ্ঞায়ন এবং অতিরিক্ত সাজার বিধানের কারণে এর ব্যাপক অপপ্রয়োগের অভিযোগ আছে। এই আইনটিও আরেকটি ‘কালো আইন’ হতে পারে বলছেন তারা।

আইনজীবী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘কারও ফোনে যদি নিছক একটা কথাবার্তার সূত্র পাওয়া যায়, পুলিশ চাইলেই তাকে এই ধারায় ফাঁসিয়ে দিতে পারে।’

মাদক হাতেনাতে না পেয়েও শুধু বার্তার ভিত্তিতে মামলা করার সুযোগ থাকাটাকে তিনি ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন। তার প্রশ্ন—আলামত ছাড়া শুধু সন্দেহের ওপর ভর করে একটা পুরো আইন দাঁড় করানো কতটা যুক্তিসঙ্গত।

মানবাধিকার সংস্থা অধিকার পরিচালক এ এস এম নাসির উদ্দিন এলানও টাইমসকে বলেন, ‘আলামত ছাড়াই গ্রেপ্তারের সুযোগ তৈরি করা হলে আইনটির অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়বে।’

পুলিশের বিরুদ্ধে অনেক সময় কারও কাছে মাদক না থাকলেও হাতে দুই পোটলা গাঁজা দিয়ে চালান করে দেওয়ার অভিযোগের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আইনের ফাঁকফোকর রেখে নতুন কোনো ক্ষমতা দেওয়া হলে সেটির অপব্যবহার ঠেকানো কঠিন হবে।’

আইনের ৩৬ক ধারায় সাইবার স্পেস বা ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে মাদকদ্রব্য বা সাইকোঅ্যাকটিভ সাবস্টেন্স এর অবৈধ ক্রয়, বিক্রয়, সরবরাহ, প্রস্তাব, প্রচার বা লেনদেন, ইত্যাদির দণ্ডের কথা বলা আছে।

এতে বলা হয়, (১) যদি কোনো ব্যক্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে—(ক) কোনো সাইবার স্পেস, ডিজিটাল ডিভাইস, ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ইলেকট্রনিক যোগাযোগব্যবস্থা বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে মাদকদ্রব্য কেনা, বেচা, সরবরাহ, প্রস্তাব, বিজ্ঞাপন, মধ্যস্থতা, যোগাযোগ অথবা এমন কোনো অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করেন বা করার চেষ্টা করেন;

অথবা (খ) দফা (ক) এ বর্ণিত উদ্দেশ্যে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা, ই-ওয়ালেট, ভার্চুয়াল সম্পদ বা ক্রিপ্টোকারেন্সি, ইত্যাদি ব্যবহার করেন বা করিবার চেষ্টা করেন, তাহলে সেটি হবে অপরাধ। এতে এও লেখা আছে, এই উপ-ধারার অধীন অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধীর কাছ থেকে মাদকদ্রব্য উদ্ধার হওয়া বাধ্যতামূলক হবে না।

(২) কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর অধীন কোনো অপরাধ করলে তিনি যে কোনো মেয়াদের কারাদণ্ডে অথবা সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ডে এবং অনূর্ধ্ব ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

(৩) উপ-ধারা (১) এর অধীন কোনো অপরাধ আন্তর্জাতিকভাবে বা কোনো সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের মাধ্যমে সংগঠিত অথবা পুনঃসংগঠিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যে কোনো মেয়াদের কারাদণ্ডে অথবা অনূর্ধ্ব ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

(৪) উপ-ধারা (১) এর অধীন কোনো অপরাধে ব্যবহৃত সাইবার স্পেস, ডিজিটাল ডিভাইস, ইত্যাদি বা ডিজিটাল অ্যাকাউন্ট, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা, ই-ওয়ালেট, ভার্চ্যুয়াল সম্পদ বা ক্রিপ্টোকারেন্সি, ইত্যাদি এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতের বা, ক্ষেত্রমত, মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের আদেশক্রমে ব্লক, অপসারণ, জব্দ, বাজেয়াপ্ত বা, ক্ষেত্রমত, রাষ্ট্রের অনুকূলে ন্যাস্ত করা যাবে বলেও লেখা আছে।

৩৫ক (৩) থরায় বলা হয়, কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠান তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, ইন্টারনেট, ডার্ক ওয়েব, সামাজিক মাধ্যম, ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন, ই-মেইল, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে মাদকদ্রব্যের ক্রয়-বিক্রয়, সরবরাহ, পরিবহন বা বিতরণের উদ্দেশ্যে যোগাযোগ করলে, অথবা মাদকদ্রব্য সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা, ই-ওয়ালেট, ভার্চ্যুয়াল সম্পদ বা ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করলে, তা এই আইনের অধীন অপরাধ বলে গণ্য হবে।

(৪) ডিজিটাল তথ্য সংরক্ষণ ও জব্দর ক্ষেত্রে বলা আছে: (ক) অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কম্পিউটার, মোবাইল ডিভাইস, সার্ভার, ক্লাউড স্টোরেজ, ডিজিটাল ওয়ালেট এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ইলেকট্রনিক তথ্য জব্দ, সংরক্ষণ এবং ফরেনসিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করবেন।

এমন ধারার কারণে যে কোনো মানুষকে সহজেই ফাঁসানোর সুযোগ তৈরির আশঙ্কার কথাও বলা হচ্ছে। কারণ, মেসেঞ্জারে বা হোয়াটস অ্যাপে এমন একটি বার্তা পাঠিয়ে দিয়ে তার ফোন তল্লাশি করানো সম্ভব।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (অপারেশনস) ফয়সাল মাহমুদ টাইমসকে বলেন, ‘আইন করলে তা সবার জন্যই প্রযোজ্য। যেহেতু এটি সবার জন্য প্রযোজ্য, তাই পুলিশ চাইলে এই আইনে মামলা করতে পারবে।’

অতীতেও নাগরিকদের ফোন বিনা ওয়ারেন্টে ফোন তল্লাশি করার নজির আছে দেশে। ফলে নতুন আইনে যখন সেই ক্ষমতাকেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হচ্ছে, তখন প্রশ্ন উঠছে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিকতা নিয়েও।

সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে আইনানুযায়ী ছাড়া কাউকে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যায় না। আর ৪৩ অনুচ্ছেদ প্রতিটি নাগরিকের গৃহ ও যোগাযোগের গোপনীয়তা রক্ষার অধিকার দিয়েছে। মোবাইল ফোনের ব্যক্তিগত বার্তা, ছবি বা কল রেকর্ডের ক্ষেত্রে এই অধিকার আদৌ কতটা কার্যকর থাকছে, সেই প্রশ্নই এখন সামনে চলে এসেছে।

মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে স্বীকৃত জীবন, স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অধিকারের সঙ্গেও এই ক্ষমতার সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন আইনজীবীরা।

মানবাধিকার কর্মী এলানও সাইবার স্পেসে ব্যক্তিগত মেসেজ যাচাইয়ের ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন। তার মতে, এতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।

এমন বিধানকে ‘কালো আইন’ বলা যেতে পারে বলেও মন্তব্য করেন অধিকার পরিচালক।

সংশোধিত আইনের মূল পরিবর্তনটি এসেছে সাইবার জগতে মাদক-সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডকে নতুন অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার মধ্য দিয়ে। এত দিন মাদক মামলা মানেই ছিল হাতেনাতে মাদক উদ্ধার—কারও কাছে ইয়াবা, গাঁজা বা হেরোইন পাওয়া গেলে তবেই মামলা। কিন্তু নতুন আইনের ৩৫ক ও ৩৬ক ধারা সেই চিত্র পাল্টে দিয়েছে।

এখন থেকে কেউ যদি ইন্টারনেট, সামাজিক মাধ্যম, ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ, ই-মেইল, এনক্রিপটেড মেসেজিং বা এমনকি ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে মাদক কেনাবেচা, সরবরাহ বা পরিবহনের বিষয়ে যোগাযোগ করেন, কিংবা মাদক-সংশ্লিষ্ট লেনদেনে ডিজিটাল পেমেন্ট, ই-ওয়ালেট বা ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করেন—তাহলেই তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এমনকি এই কাজ করার চেষ্টা করলেও ছাড় নেই।
চমকে দেওয়ার মতো বিষয় হলো, আইনের ভাষায় স্পষ্ট করেই বলা আছে—এই ধারার অধীন অপরাধ প্রমাণে অভিযুক্তের কাছ থেকে মাদকদ্রব্য আসলেই উদ্ধার হতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। অর্থাৎ, হাতে মাদক না থাকলেও শুধু একটা কথোপকথন বা লেনদেনের সূত্র ধরেই চলতে পারে মামলা, হতে পারে সাজা—যার সর্বোচ্চ পরিণতি মৃত্যুদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা জরিমানা। সংঘবদ্ধ বা আন্তর্জাতিক চক্র জড়িত থাকলে সেই জরিমানা গিয়ে ঠেকতে পারে ৫০ লাখ টাকায়।

গ্রেপ্তারের অস্পষ্টতা নিয়েও আগে উদ্বেগ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে আদালতে তোলার আগে অধিদপ্তরের নিজস্ব হাজতখানায় ‘নিরাপত্তা হেফাজতে’ রাখার বিধান রাখা হয়েছে, কিন্তু সেই হেফাজতের মেয়াদ ঠিক কতক্ষণ হতে পারে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট সীমা আইনে বলা নেই—শুধু লেখা আছে ‘আইনানুগ সময় পর্যন্ত’।

আসাদুজ্জামানের প্রশ্ন, এত সংবেদনশীল একটা ক্ষমতা দিতে গিয়ে অন্তত একটা নির্দিষ্ট সময়সীমা লিখে দিতে সমস্যা কোথায় ছিল? তার মতে, এই দুর্বলতাই আইনটিকে অসম্পূর্ণ করে রেখেছে।

আরেক আইনজীবী আব্দুস সালামের পর্যবেক্ষণও একই। তিনি বলছেন, ‘মাদকের ভয়াবহতা নিয়ে সমাজে যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, তার সুযোগ নিয়ে কঠোর আইনের প্রতি একধরনের নীরব সমর্থন গড়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। কিন্তু ঠিক সেই সমর্থনের ছায়াতেই এমন ক্ষমতা প্রয়োগ হতে পারে, যা আদতে ব্যবহার হয় নাগরিকদের ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েমের হাতিয়ার হিসেবে—আর এই দিকটিতেই সতর্ক দৃষ্টি রাখা জরুরি।’

তবে সরকারের অবস্থান একেবারে ভিন্ন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ টাইমসকে নিশ্চয়তা দিয়েছেন, এই আইনের কোনো অপব্যবহার হবে না। আইনে যা লেখা আছে, সে অনুযায়ীই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আলামত বা মাদক উদ্ধার ছাড়া গ্রেপ্তারের ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এখনকার দিনে বেশিরভাগ কার্যক্রমই অনলাইনে হয়ে থাকে, আর অনলাইনে কারও মাদকের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাকে আইনের আওতায় আনার সুযোগ থাকা উচিত।’

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক হাসান সাদিক মাহমুদও একই সুরে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন। তার ভাষ্য, ‘কাউকে কোনো মেসেজ পাঠানো মানেই সে সঙ্গে সঙ্গে অপরাধী হয়ে যাচ্ছে না; অভিযোগ যাচাই-বাছাই করার পরই কেবল প্রকৃত অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তবে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদের প্রশ্ন, আইনের লেখা যা-ই বলুক, বাস্তবে সেই ‘যাচাই-বাছাই’ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা কতটা নিশ্চিত থাকবে, আর কোনো তদারকি কাঠামো ছাড়া নিছক আশ্বাসের ওপর ভরসা করাটা কতটা নিরাপদ।