[এই শিরোনামে ইতিহাসের ছিন্নপত্রের তৃতীয় খন্ডে একটা পূর্ণাঙ্গ পর্ব আছে। সম্প্রতি মতিঝিলের উর্দু পাসবান পত্রিকার পরিত্যক্ত সম্পত্তি কিভাবে শেখ মনি দখল করেছিলেন আর তার পলাতক উত্তরাধিকারীদের হাত থেকে আবারও সেই ভবন কথিত বিকাশ নুরু পুনর্দখল কিংবা জবরদখল করেছে সেই কাহিনী চলছে। তো এসব তো আর নতুন কোনো কাহিনী না। দখল আর লুটপাটের এই ইতিহাস একাত্তরের ইতিহাসেরই অংশ। যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে বিহারীদের সহায় সম্পদ নারী এ সবকিছুই তো আওয়ামী গুন্ডারা গণিমতের মাল হিসেবে ভোগ দখল করেছে। কিন্তু জানার বিষয় হচ্ছে এই লুটপাটের জন্মও একাত্তরেরই গর্ভে। আওয়ামী সন্ত্রাসী গুন্ডা পান্ডাদের হাতে তো বটেই এমনকি তথাকথিত শিক্ষিত ভদ্রনোকেরাও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। তার অনেক নজীরই পাবেন ছিন্নপত্রে। আপাতত প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় দুটি নতুন সংযোজন। জানা না থাকলে জেনে নিতে পারেন।]
-----------------------------------
০১.
"... কিছু কিছু মানুষ ছিলেন ভীষণ স্বার্থপর। আবার কেউ কেউ বাংলাদেশ থেকে লুট করে আনা টাকা দিয়ে কলকাতায় ফূর্তি করছিলেন। আর ওই ভয়াবহ এক সময়ে দেশ ছেড়ে আসা উদ্বাস্তুরা রিফিউজি ক্যাম্পে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। সীমান্ত এবং বাংলাদেশের গভীর অভ্যন্তরে শত্রুর সঙ্গে প্রতিদিন সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে শত শত তরুণ মুক্তিযোদ্ধার জীবন প্রদীপ নিভে যাচ্ছে।
কিছু মানুষ এসব বিষয়ে ছিলেন অগ্রগামী। তথাকথিত ভাষাসৈনিক গাজিউল হক এবং তার বগুড়া মাফিয়ারা স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের বগুড়া অফিস থেকে বত্রিশ কোটি টাকা লুট করেছে বলে জানা যায়। এই টাকা এরা কলকাতায় যত্রতত্র খরচ করছিল। একজন প্রত্যক্ষদর্শী আমাকে বলেছেন, এদের মধ্যে মিঠু নামের এক ব্যক্তি পার্ক স্ট্রীট হোটেল ও রেস্তোঁরায় ওয়েটারদেরই বখশিশ হিসেবে শত শত টাকা দিতো। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোন কিছু করার উপায় ছিল না। তারা আমাদের জনপ্রতিনিধি এবং পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনের হোমড়া চোমড়া সবাইকে ঘুষ দিয়ে নিজেদের পক্ষে টেনে নিয়েছিল। বাংলাদেশের কতিপয় আমলা (এর মধ্যে এইচ টি ইমাম এবং নূরুল কাদের খান উল্লেখ্য) তাদের নিজ নিজ জেলার ট্রেজারি থেকে উত্তোলন করে নিয়ে আসা বিপুল পরিমাণ টাকা সরকারের কাছে জমা দেননি।
অন্যদিকে, ওয়ালিউল ইসলাম (ওয়ালি ভাই) মাগুরা ট্রেজারির পুরো টাকা উত্তোলন করে নিয়ে এসে ভারতের বনগাঁওয়ের এসডিওর কাছে জমা দিয়ে প্রায় কপর্দকহীন অবস্থায় কলকাতা শহরে পা রাখেন। মুজিবনগর সরাকারের অর্থ সচিব খন্দকার আসাদুজ্জামানের পক্ষে সেপ্টেম্বর মাসে নকশাল আক্রমণের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও সেই টাকা আমি বনগাঁও থেকে কলকাতা নিয়ে এসে অস্থায়ী সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা করি। এই টাকা আমাদের সরকারকে ভারতের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীলতা থেকে কিছুটা হলেও তখন রক্ষা করে॥"
"
— কামাল সিদ্দিকী / এক জীবনে : তৃতীয় বিশ্বের এক অমলার স্মৃতিকথা (২য় খন্ড) / মূল : In One Life : The Memoirs of a Third World Civil Servant (অনু: ইলাহী দাদ খান) ॥ [একাডেমিক প্রেস এন্ড পাবলিশার্স - জুলাই, ২০২৫ । পৃ: ৮০]
০২.
"... একদিন সন্ধ্যায় জুন মাসের ১৮ কি ১৯ তারিখে দুটো হেলিকপ্টার এসে নামলো । ঠিক নামা নয়, নামার ভান করে মাঠের কাছাকাছি এ গ্রাম সে গ্রামের পাশ দিয়ে আবার কিছুক্ষণ পরে আকাশে উড়ে উত্তর পশ্চিম মুখে চলে গেল। এদিকে প্রচার হলো পাক ছত্ৰী-বাহিনী নেমেছে। মুক্তি বাহিনীর কাঁচা জোয়ানরা পাঞ্জাবিদের এই প্রতারণায় ভুল বুঝলো। ছত্রী-বাহিনী নেমেছে শুনে এরা সব ব্যুহ ছেড়ে একেবারে বিলনিয়া অফিসে এলো। মেজর জাফর ইমামও এলেন। আমাদের মুন্সিরহাটের পতন দেখে বাড়ি ছুটলাম। পরিবার পরিজন নিয়ে ত্রিপুরা রাজ্যের রাজনগর চলে গেলাম। সেখানে ভালো কোনো প্রস্তুতি ছিল না। নতুন শরণার্থী ক্যাম্পে মাত্র ৬ষ্ঠ দিনে আমার স্ত্রী (২৪ জুন) এবং ৭ম দিনে মেয়ের শাশুড়ি (আমার বেহাইন) কলেরায় মারা গেল। মুক্ত এলাকার রাজমনিপুরে দাফন করলাম। কয়েক দিনের মধ্যেই এমপি সফদার মারা গেলেন। তার হৃদরোগ হওয়ার পিছনেও একটা রহস্য রয়েছে। পারিবারিক গোরস্থানে তাকেও দাফন করলাম। মুহুরী নদীর উত্তর দিক মুক্ত ছিল।
জাফর ইমাম পাক বাহিনীর কিছু বাঙালি জোয়ানসহ খাজা সাহেবের (খাজা আহমদ এমপিএ) সাথে চোত্তাখোলায় যোগ দিয়ে সেখানে ক্যাম্প করেন। পরবর্তী সময়ে মেজর জিয়া রাজনগর ক্যাম্প করেন। এখানে একটা কথা উল্লেখ না করে উপায় নেই যে, সামরিক ব্যক্তিরা মনে করেছে টাকা পয়সা ধান চাউল এনে আওয়ামী লীগের লোকেরা আরামসে খাচ্ছে। আর মুক্তিযোদ্ধা জোয়ানরা প্রাণের বিনিময়ে যুদ্ধ করছে। কাজেই এদের হাত থেকে টাকাকড়ি ও খাদ্য কেড়ে নিতে হবে। আরো বুদ্ধি আঁটা হলো যে, মুক্ত এলাকার অধিবাসীদের নিংড়িয়ে কিছু চাঁদা নিতে হবে। এদিকে ভারতীয় কমিউনিস্টদের সংগে বোঝাপড়া করার পর ছাত্রলীগের প্রগতিশীল শাখার কিছু যুবক ছাত্রকে গেরিলা পদ্ধতির যুদ্ধে ট্রেনিং এ পাঠালো এবং অপর অংশ সাধারণ সৈনিকবৃত্তির ট্রেনিং নিলো। অন্তর্দ্বন্দ্ব দেখা না গেলেও ভিতরে ভিতরে আঘোষিত যুদ্ধ আরম্ভ হয়ে গেল। লিডারদের পরিচালনা অনেকটা আত্মঘাতি হয়ে উঠলো। যা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পূর্ণাংগ ভাবে প্রকাশ পেয়েছিল। আওয়ামী লীগের পক্ষে বিপক্ষে সেনাবাহিনী ও ছাত্রবাহিনী দুভাগ হয়ে যাওয়ার বীজ ইন্ডিয়ায় বসেই হয়েছিল। মুজিববাদী আর মুজিব বিরোধী, যার অস্তিত্ব আজো বাংলাদেশের সর্বনাশের হেতু হয়ে বিরাজ করছে।
... সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে কমান্ডারদের অর্থ লোলুপতা বৃদ্ধি হলো। এলাকায় জিজিয়া করের ন্যায় চাপ বৃদ্ধি হলো। আমি রাজনগর অফিসে পোস্টার লিখে দিলাম চরিত্রহীনরা মুক্তিযোদ্ধা নয়। আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হলো। কমিটির ২/৪ জন ছাড়া ছোকরা যুবকরা উঠেপড়ে আমাকে কমিটি থেকে সরাতে চাইলো। মিটিং ডাকা হলো। পরশুরাম থানা আওয়ামী লীগ সম্পাদক খোকাভাই আর সফদার সাহেব উপস্থিত থেকেই সভা করলেন। আমি বিলনিয়ায় থাকলাম। আমার অনুপস্থিতিতেই সভা হলো। অবশেষে খবর পেলাম সভায় আমাকে পুনরায় সভাপতি ঘোষণা করে প্রস্তাব পাশ করেছে। আমার বিরুদ্ধে ব্যর্থ হয়ে তারা সফদারের বিরুদ্ধে লাগলো। সফদার সাহেব শুধু এমপি নন। তিনি ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যানও। তার আমলে অফিস, দাতব্য চিকিৎসালয়, সেতু ও স্কুল তৈরি করেছিল। সাময়িক কারণে সামরিক কর্মকর্তারা ওগুলো ভেংগে টিন বিক্রি করে দিয়েছিল। সফদার তাতে প্রথম বাধা দিয়েছিলেন। কিন্তু সামরিক ব্যক্তিরা তা মানেনি। এতে সফদার ভাই বিরাট আঘাত পেলেন এবং মারা গেলেন ডাক্তার আসার আগেই।
এই সামরিক ব্যক্তিদের জিঘাংসা নিবৃত্ত না হওয়ায় মুক্তিযুদ্ধের ভিতরেই ভারতভূমে এবার গিয়ে পড়লো খাজাভায়ের ওপর। তার হুকুম ছাড়াই চোত্তাখোলার চাউল সৈনিকজনেরা নিয়ে গেল। শুনেছি সে চাউল বিক্রি করে দেয়া হয়েছিল। মুক্ত এলাকায় চাঁদার পিড়াপিড়ি করে ফল হলো না। আমাদের কাছে লোকেরা জিজ্ঞেস করলো। আমরা বললাম রসিদ দিলে চাঁদা দিবে আমরা দরকার মনে করলে বাজারে ঢোল বাজিয়ে বলে দিব চাঁদা দাও। রসিদ দেব। প্রাইভেট চাঁদা কাউকে দেবে না। এটা শুনে ওরা ক্ষেপে গেল। খাজাভাইকে মারার জন্য চোত্তাখোলার রাস্তায় মাইন পুঁতে রাখা হলো। সে মাইন ফুটে অন্য একটা গাড়ি ও কিছু লোক আহত হলো। ভারতীয় পাহারা জোরদার হলো।
... এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে উর্দ্ধতন মহলে লেখালেখি হলো। অপর পক্ষও ছাড়লো না। খাজাভাইকে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার করার চেষ্টা চলেছে। হিসাব নিকাশ না থাকার একটা অভিযোগ থেকে আত্মরক্ষার জন্যে খাজাভাই আওয়ামী লীগের সভা ডাকলেন বিলনিয়া কলেজ টিলার অফিসে। একটা সাধারণ হিসাব নিকাশ খাড়া করা হলো। এতদসংগে পরশুরাম থানা আওয়ামী লীগ সেক্রেটারি খোকা মিয়ার (আমিনুল করিম) হিসাবটাও জুড়ে দেয়া হলো। একটা পাশ করলে অপরটাও পাশ হয়ে যায়। নাকচ করলে দু'টোই নাকচ হয়ে যায়। বিদেশের বাড়িতে মুক্তি সংগ্রামের নেতাদের দুর্নাম গোটা বাঙালি জাতির বদনাম বহন করবে। এখানে আমাকে চরম ভূমিকা নিতে হলো। কারো কারো প্রতি বিক্ষোভ থাকলেও এই হিসাব সঠিক হিসাব বলে পাশ করার পক্ষে পরিবেশ সৃষ্টি করলাম। সভায় তা গৃহিত হলো। এবার লিখিত ভাবে প্রস্তাবাকারে আট কপি কাগজের দরকার হলো। সব সদস্যের সই নেয়া সম্ভব নয়। থানা ও মহকুমা সভাপতি এবং সম্পাদকদের সই নিতে হবে। কেউ সই দিতে চাচ্ছে না। খাজাভাই বিপদে পড়ে যাচ্ছেন। আমার সই হলে ফেনী থানার সভাপতি সালেহ আহমদ মিয়া, ছাগলনাইয়ার সভাপতি এডভোকেট কাসেম ভাই, সম্পাদক মজহারউল্লাহ পাটোয়ারি, পরশুরামের সভাপতি মৌলবী আজিজুল হক ও সোনাগাজির সম্পাদক এ.কে.এম ইসহাক সই করতে রাজী। খাজাভাই তাই আমাকে নিয়ে সবার সই নিলেন। এমনি করে হিসাবের একটা গোজামিল উর্দ্ধতন অফিসে ও ভারতীয় কর্তৃপক্ষের নিকট দেয়া হলো। পার্টির সম্মান ও বাঙালির ইজ্জত আপাতত রক্ষা হলো । ষড়যন্ত্রকারী সেনাধ্যক্ষ ট্রান্সফার হয়ে গেল। কিন্তু এর ফাঁকে মালেক মিয়া, সৈয়দ আহমদ, সুজা মিয়া, রুহুল আমিনের হিসাব বিস্মৃতির অতল তলে ডুবে রইল। পরশুরামের খোকা মিয়ার হিসাবে গোজামিল ছিল সত্যি, কিন্তু তার সে টাকাকড়ি হালিম খালুর হাতে মার খেয়েছে বলে আমার বিশ্বাস। এ ক্ষেত্রে খাজাভাই সুপ্রিম লিডার। তার কথা ভায়োলেট করা যায় না। কুরআন ছোঁয়া প্রতিজ্ঞা।
আরো কয়েক মাস আগের কথা। আমরা তালেব, মালেক, ইসহাক, ইউনুস আরো কয়েকজনসহ বিলনিয়া ট্রেজারিতে ২৮ হাজারের মতো টাকা নামে মাত্র জমা রেখেছিলাম। একাউন্ট করে নয়, আমাদের বাক্সে আমাদের কো-অপারেটিভ স্টোরে। যা মনীন্দ্র সরকার (ম্যানেজার) আর বাঘাবাবু জানতো। দেশ স্বাধীন হবার আগে বাঘাবাবু মারা গেলেন। মনীন্দ্র আর খাজাভাই ছাড়া আর কারো জানবার ক্ষমতা নেই। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এ টাকাকড়ি সবই নেতা নিয়ে এসেছেন বলে তুষারকান্তি, শ্রীদাস জানতো। এ টাকা সবই নেতা খাজাভাই তার নিজস্ব গৃহ নির্মাণ, হোটেল সংস্কার ও ব্যবসায়ে খাটিয়েছেন। যার হিসাব নিকাশ কেউ চাইতে পারেনি। এসব নিয়ে প্রশ্ন উঠলে এক কর্মি সম্মেলন ডাকা হলো ফেনী সুরত মহল সিনেমা হলে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে জনাব কোরবান আলী এলেন। সভায় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমার বক্তব্য রাখতে দু'মিনিট সময় দেয়া হলো। আমি স্বাধীনতা সংগ্রামকালে দেয়া খাজাভাই থেকে সার্বভৌম ক্ষমতা তুলে নিলাম। বন্ধুরা ভুল বুঝলো, যার পরিণতি আজো চলছে॥
— এম এস হুদা / আমার রাজনৈতিক জীবনের কথকতা ॥ [রেজিয়া হুদা ফাউন্ডেশন - জানুয়ারি, ২০০২ ।