Image description

উন্নত জীবনের আশা দেখিয়ে দেশের সহজ-সরল মানুষকে তুলে দেওয়া হচ্ছে নির্মম কসাইখানায়। ইউরোপ কিংবা অন্যান্য দেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীদের লিবিয়ায় জিম্মি করে কোটি কোটি টাকা মুক্তিপণ আদায় করছে মানবপাচারকারী চক্র। দুই দেশে বিভক্ত হয়ে কাজ করা এই চক্রটির মূল কলকাঠি নাড়ছে বাংলাদেশি মাস্টারমাইন্ডরাই।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, চক্রটির একটি অংশ সক্রিয় রয়েছে বাংলাদেশে, আর অন্য অংশটি ঘাঁটি গেড়েছে লিবিয়ায়। বাংলাদেশে অবস্থানরত দালালরা প্রথমে বিদেশগামী নিরীহ মানুষদের খুঁজে বের করেন এবং তাদের সব ব্যক্তিগত তথ্য পাচার করে দেন লিবিয়ার চক্রটির হাতে। এরপর সুযোগ বুঝে ভুক্তভোগীদের লিবিয়ায় নিয়ে বন্দি করা হয় এবং চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। এখানেই শেষ নয়, নারীদের ওপরেও চলে পাশবিক নির্যাতন, পরবর্তীতে তাদের বাধ্য করা হচ্ছে অনৈতিক কাজে। বাংলাদেশ থেকে পাঠানো তথ্যের ওপর নির্ভর করেই লিবিয়ায় গড়ে উঠেছে জিম্মি ও মুক্তিপণ আদায়ের এই ভয়াল ফাঁদ।

জাগো নিউজের হাতে আসা বেশ কয়েকটি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, এই চক্রটির ভুক্তভোগীদের অসহনীয় নির্যাতনের চিত্র।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) বলছে, এই চক্রটির নেতৃত্বে রয়েছে মূলত বাংলাদেশিরা। যাদের একটি গ্রুপ বাংলাদেশ থেকে উন্নত বিভিন্ন রাষ্ট্রে গমনেচ্ছু মানুষদের প্রলোভন দেখিয়ে লিবিয়াতে পাঠিয়ে দেয়। আর সেখানে থাকা বাংলাদেশি আরেকটি চক্র এই ভুক্তভোগীদের জিম্মি করে নির্যাতন করে অর্থ আদায় করে। পরে সেই অর্থ হোন্ডির মাধ্যমে বিদেশে নেতৃত্বে থাকা বাংলাদেশি দল নেতার কাছে পাচার করা হয়।

পিবিআইয়ের তথ্য আরও বলছে, এই চক্রের এখন পর্যন্ত অন্তত ১৫ জন বাংলাদেশিকে হেফজতে নিয়েছে সরকারি এই সংস্থাটি।

অন্যদিকে, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বলছে, ২০২৫-২০২৬ সালে অন্তত ২২৩ জনকে গ্রেফতার করেছে বাহিনীটি। সম্প্রতি এমনই একটি চক্রের মূল হোতা মোহাম্মদ আরজু রহমানকে (৪৭) গ্রেফতার করে এসআরবি। তথ্য বলছে, শুধু এই চক্রটিই গত ১২ বছরে ২ হাজারের বেশি বাংলাদেশিকে এভাবে বিদেশে নিয়ে গেছে। সম্প্রতি এসব চক্রের বাংলাদেশি কয়েকজন সদস্যদের গ্রেফতারের তথ্যও সামনে এসেছে।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. ছুফি উল্লাহ জানান, লিবিয়ায় আটকে নির্যাতন এবং মুক্তিপণ দাবির অভিযোগে মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য মো. আবুল হোসেনকে (৬৯) গ্রেফতার করে সিআইডি। তিনি বলেন, ইতালি পাঠানোর কথা বলে আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে বিভিন্ন সময়ে মোট ২৫ লাখ ৯৫ হাজার টাকা গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ১২ জুন ভুক্তভোগী বাদিকে লিবিয়ায় পাঠানো হয়। লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর মানবপাচার চক্রের সহযোগীরা তাকে একটি স্থানে আটক রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালায় এবং ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। পরে ভুক্তভোগী সুযোগ বুঝে আটক স্থান থেকে পালিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নেন। একপর্যায়ে লিবিয়া পুলিশ তাকে আটক করে এবং ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়। এ ঘটনায় জড়িত গ্রেফতারকৃত আসামির নামে থানায় মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে আরও একটি মামলা রয়েছে বলেও জানানো হয়।

এর আগে, ২৯ সেপ্টেম্বর ইতালিতে নেওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে মিশরে নির্যাতনে একটি চক্রের মূলহোতা মোহাম্মদ আরজু রহমানকে (৪৭) গ্রেফতারের তথ্য জানায় এসআরবি। এক সংবাদ সম্মেলনে এসআরবি-৪ এর পদাতিক অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান বলেন, চলতি বছরের ১৬ জুলাই মানবপাচার চক্রের প্রতারণার শিকার কামরুন্নাহার ফাতেমা মিশর থেকে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি জানান, ইতালি নিয়ে যাওয়ার কথা বলে একটি চক্র তাকে মিশরে নিয়ে আটকে রেখেছে। এ তথ্যের ভিত্তিতে এনএসআই গোয়েন্দা কার্যক্রম শুরু করে। ওই সময় আরজু মিশরে অবস্থান করছিলেন। তাকে দীর্ঘদিন ধরে নজরদারিতে রাখা হয়। সম্প্রতি তিনি বাংলাদেশে আসার পর তাকে গ্রেফতার করা হয়। তার আবার মিশরে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল বলে জানান এসআরবি কর্মকর্তা।

তিনি জানান, কামরুন্নাহার ফাতেমা ও তার পরিবারের পাঁচ সদস্যকে ইতালি নেওয়ার কথা বলে আরজু তাদের কাছ থেকে ৮৫ লাখ টাকা নেন। পরে ‘বাংলাদেশ থেকে ভিসা হবে না’ বলে তাদের শ্রীলঙ্কায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পরিবারের সদস্যদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। একপর্যায়ে পরিবারের তিন ছেলে সদস্য পালিয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। পরিবারের দুই নারী সদস্যের মধ্যে আঞ্জুমান আরা পালিয়ে শ্রীলঙ্কার কোনো একটি এলাকায় অবস্থান করছেন।

অন্যদিকে, কামরুন্নাহার ফাতেমাকে শ্রীলঙ্কা থেকে মিশরে নিয়ে যায় চক্রটি। সেখানে তাকে আটকে রেখে নির্যাতন এবং অনৈতিক কাজে বাধ্য করা হয়। এসব কাজে অস্বীকৃতি জানালে তার ওপর বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন চালানো হয়। এমনকি শরীরের বিভিন্ন অংশে সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়া হয় বলেও জানান এসআরবি কর্মকর্তা।

জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান বলেন, আরজু প্রায় ১২ বছর ধরে মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত। এ সময়ে দুই হাজারের বেশি বাংলাদেশিকে একই ধরনের প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে পালিয়ে আসা ৩০ থেকে ৩৫ জন ভুক্তভোগী এসআরবির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। আরজুর বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় অভিযোগও রয়েছে।

এসআরবি জানায়, আরজুর নিজস্ব কোনো বৈধ লাইসেন্স নেই। ‘আরজু ইমিগ্রেশন লিমিটেড’ ও ‘নাফিস এয়ার ইমিগ্রেশন লিমিটেড’সহ বিভিন্ন ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে তিনি গ্রামের সহজ-সরল মানুষকে ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখাতেন। পরে তাদের বিভিন্ন দেশে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেওয়া ও অনৈতিক কাজে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে।

লিবিয়াতে আটকে নির্যাতনকারী বাংলাদেশি চক্রকে গ্রেফতারের তথ্য জানিয়ে পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর) অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান জাগো নিউজকে বলেন, এই দেশ থেকে নিয়ে গিয়ে লিবিয়াতে আটকে, ইমোতে ভিডিও কলে পরিবারের সদস্যের যুক্ত করে ভুক্তভোগীকে প্রচুর টর্চার করছিল। ছেলে চিৎকার করে ভিডিও কলে তার বাবাকে বলছে ‘বাবা আমাকে টাকা পাঠাও না হলে মেরে ফেলবে।’ আর তারা বলছে, ‘টাকা না দিলে মেরে বালি চাপা দিয়ে দিবো।’

অনলাইনে সবাই দেখছে নির্যাতনের হৃদয়বিদারক ঘটনা। পরে ভুক্তভোগীর পরিবার অল্প কিছু টাকা দিয়েছিল। কিন্তু বাইরের দেশে লিবিয়াতে বন্দি। তার পরিবার এই দেশে সহযোগিতার জন্য কার কাছে যাবে? পরে মামলায় আমরা হস্তক্ষেপ করলাম। তদন্তে জানতে পারলাম আসলে যারা টাকা চাইছে বা নিচ্ছে সেগুলো বাংলাদেশের অ্যাকাউন্ট।
এরপর আমরা ভুক্তভোগীর পরিবারকে বললাম, তাদের টাকা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন ভাবে সময়ক্ষেপণ করতে। এরপর আমরা সিদ্ধান্ত করে ভুক্তভোগীর পরিবারকে কিছু টাকা দিতে বললাম। কারণ আমরা যদি ওই জড়িত ব্যক্তি যার অ্যাকাউন্টে টাকা নিছে তাদের যাতে প্রমাণসহ ধরতে পারি। পরে আমাদের অবগত করেই ভুক্তভোগীর পরিবার তিন-চারটা বিকশের মাধ্যমে তাদেরকে দেড় লাখ টাকা পাঠালো। আর আমরা টাকা পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গে অভিযানে নামলাম। টাকাটা কোথায় যাচ্ছে সেই মানিফলোটা আমরা ফলো করি। ঢাকাসহ কিশোরগঞ্জ ও দোহার এলাকায় আমরা টানা ২৪ ঘণ্টা অভিযান চালাই। অভিযানে প্রথমে ২ জনকে আমরা গ্রেফতার করি। সে সময় আমরা তাদের কাছ থেকে বিকাশ ট্রানজেকশন করার আগেই টাকাসহ ১৪টি সিম উদ্ধার করি।

তিনি আরও বলেন, এরপর যে এই চক্রের যে হোতা সে দেশে আসছে লিবিয়া থেকে। আবার চলে যাবে। আমরা সেই তথ্য পেয়ে যাই। পরে তাকে আমরা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তখন সব পোর্টে আমরা ম্যাসেজ দিলাম। এরপর এয়াপোর্টে তাকে আটকে দেয়। পরে আমরা তাকে গ্রেফতার করলাম। এরপর তাকে জিজ্ঞাসাবাদে নিলে সে সব স্বীকার করে। পরে তাকে দিয়ে লিবিয়াতে তার চক্রকে ফোন দিলে তখন সে ভুক্তভোগীকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিলে তারা ছেড়ে দেয়। একই ভাবে একাধিক চক্রের হাত থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশি ভুক্তভোগীদের উদ্ধার ও বাংলাদেশি চক্রের সদস্যদের গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানান তিনি। সবশেষ উদ্ধার ভুক্তভোগীর কাছ থেকে ৬৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল এমনই আরেকটি চক্র।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এ ধরনের অভিযোগগুলো ব্যাপক হারে আসছে। মানুষ ব্যাপকহারে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এক প্রশ্নের জবাবে এনায়েত বলেন, লিবিয়াতে জিম্মির যে ঘটনাগুলো ঘটে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাংলাদেশিরাই বেশি জড়িত থাকছে। দুই দেশে অবস্থান করা বাংলাদেশি এই চক্রের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ থাকে। কে কখন আসছে-যাচ্ছে, কি করছে সবকিছু তারা খোঁজ রাখে।

এ চক্রের বিষয়ে জানতে চাইলে এসআরবির লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, ২০২৫-২০২৬ সালে আমরা অলরেডি ২২৩ জনকে গ্রেফতার করেছি। অনেক ভুয়া এজেন্সি রয়েছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এটা শুধু লিবিয়া না, আমাদের এই মানবপাচার চক্রের হাতে সাফারিং করছে এরকম অনেক মানুষ আছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, শুধু লিবিয়া না। বেশিরভাগ সময় দেখা যায় তাদের মূল হোতারা দেশে থাকে না। আমরা আমাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছি।

ভূয়া এজেন্সিগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার করার জন্য আইনগত কিছু প্রক্রিয়া ফলো করতে হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, মামলা কিংবা ওয়ারেন্ট থাকতে হবে। একজন ব্যক্তিকে তো এমনি এমনি গ্রেফতার করে নিয়ে আসা যায় না। যাদের কথা বলছেন, তাদের বিরুদ্ধে হয়তো কেউ এখন পর্যন্ত মামলা করেনি। আবার মামলা করলেও সেখান থেকে সে যদি জামিনে থাকে, সে ক্ষেত্রে তাকে গ্রেফতার করা যায় না।