Image description

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ১১৬ নম্বর কক্ষ। সেই কক্ষে ১৩ বছরের এক কিশোরের সমস্যা দীর্ঘসময় নিয়ে শুনছেন কর্তব্যরত চিকিৎসক। কিশোরের মা পাশে বসে আছেন। মামা বাইরে অপেক্ষা করছেন। মামা বললেন, ‘এই ছেলে ঠিকমতো পড়াশোনা করে না। দিনরাত মোবাইল চালায়। এটা-সেটার জন্য জেদ করে। না পেলে রাগারাগি-ভাঙচুর করে।’

গত বৃহস্পতিবার হাসপাতালেই পরে কিশোরের মায়ের সঙ্গে কথা হয়। স্কুলের শিক্ষকের পরামর্শে ছেলেকে এখানে নিয়ে এসেছেন। গাজীপুরে থাকেন তারা। মা জানিয়েছেন, স্বামী প্রবাসী। কয়েক বছর থেকেই নানান কায়দায় ছেলে ‘ব্ল্যাকমেইল’ করে আসছে। এলাকার বখাটে ছেলেদের সঙ্গে সখ্য হয়েছে। অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে। বয়সের তুলনায় পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে। এবার প্রাথমিক পাস না করতে পারলে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষকরা।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু-কিশোরদের মধ্যে মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার বাড়ছে আগের তুলনায়। সবাই চিকিৎসার আওতায় আসতে পারছে না। তারা পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে। জড়িয়ে যাচ্ছে নানান অপরাধমূলক কাজকর্মে। এসব লক্ষণ অনেক সময় বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন বা বদমেজাজ বলে এড়িয়ে যান অভিভাবকরা। সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত বলে জানিয়েছেন তারা।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের বহির্বিভাগ এবং ভর্তি থেকে চিকিৎসা নেওয়া রোগীর তথ্যও শিশু-কিশোরদের মানসিক রোগে আক্রান্তের একই প্রবণতা প্রকাশ করে। ২০২০ সালে মানসিক সমস্যা নিয়ে বহির্বিভাগে ৫ হাজার ৮৫১ শিশু চিকিৎসা নিয়েছে। ২০২৫ সালে সে সংখ্যা দাঁড়ায় ৭ হাজার ৭৭২-এ। 

আবার একই হাসপাতালে ২০২০ সালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা করানো হয়েছিল ৭১ শিশুকে। ২০২৫ সালে সে সংখ্যা বেড়ে হয় ৩৭৬। জরুরি বিভাগেও দেখা গেছে একই ধরনের প্রবণতা। এই হাসপাতালে শিশু হিসেবে ধরা হয় শূন্য থেকে ১৪ বছর বয়সীদের।

মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ১১৬ নম্বর কক্ষের কর্তব্যরত চিকিৎসক জানিয়েছেন, শিশু-কিশোররা নানান মানসিক সমস্যা নিয়ে প্রতিদিনই আসছে হাসপাতালে। এসব রোগীর বেশিরভাগের বয়স ১০ এর বেশি। বেশিরভাগের অভিযোগ থাকে, পড়াশোনায় মনোযোগ কম। অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার। খারাপের সঙ্গে মেশা। দামি জিনিসের বায়না। আর একটা কমন অভিযোগ— অবাধ্যতা। আগের তুলনায় শিশু রোগী বেশি পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন এই চিকিৎসক।

বাংলাদেশে শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের উদ্বেগজনক পরিস্থিতি উঠে এসেছে সর্বশেষ জরিপেও। ২০১৮-১৯ সালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপের তথ্য বলছে, ৭ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ১২ দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যে কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে। এসব শিশুর ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ কোনো চিকিৎসা বা মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পায়নি।

এ বিষয়ে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মোহিত কামাল বলছেন, দীর্ঘদিনের রোগী দেখার অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, শিশু-কিশোরদের মধ্যে মানসিক রোগের সমস্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। রোজই নানান নতুন ধরনের সমস্যা নিয়ে তারা আসছে। তাদের সামলাতে গিয়ে অভিভাবকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। বেশিরভাগ সমস্যার শুরু মোবাইল থেকে।

রাজধানীর একটি নামকরা স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রের কাউন্সেলিং চলছে। মা বাইরে অপেক্ষা করছেন। এই মা জানিয়েছেন, ছেলে অল্পতেই রেগে যায়। তাদের কথা শোনে না। পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হচ্ছে। সন্ধ্যার পর বাইরে থাকছে। এমনকি মাকে মারধরও করছে।

সাম্প্রতিক গবেষণায়ও উঠে এসেছে কিশোরদের মধ্যে বিষণ্নতা ও উদ্বেগের উপসর্গের উপস্থিতি। ২০২৫ সালে ময়মনসিংহ বিভাগের ‘কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে বিষণ্নতা ও উদ্বেগের ব্যাপকতা এবং এর সঙ্গে আর্থ-সামাজিক ও জনমিতিক বৈশিষ্ট্যের সম্পর্ক’ শীর্ষক গবেষণায় ৪৭ দশমিক ৮ শতাংশের মধ্যে বিষণ্নতার উপসর্গ এবং ৩২ দশমিক ৮ শতাংশের মধ্যে উদ্বেগের উপসর্গ পাওয়া যায়। গবেষকরা নির্দিষ্ট স্ক্রিনিং পদ্ধতি ব্যবহার করে এসব তথ্য পেয়েছেন। ৪০০ কিশোর-কিশোরীর ওপর এই গবেষণা করা হয়।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরীক্ষা, ভালো ফলের জন্য পারিবারিক প্রত্যাশা, প্রতিযোগিতা ও ব্যর্থতার ভয় কিশোরদের মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। এর সঙ্গে পারিবারিক অশান্তি, বুলিং, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও সহিংসতাও যুক্ত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও নতুন চাপ তৈরি করছে।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মেখলা সরকার বলছেন, জিনগত, পারিবারিক এবং সামাজিক পরিবেশ— এই তিন কারণে শিশু-কিশোররা মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। জিনগত ফ্যাক্টর এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। তবে সহায়ক পারিবারিক পরিবেশের অভাব এবং সমাজ থেকে দেওয়া সুরক্ষা হারিয়ে যাওয়ায় শিশু-কিশোরদের মধ্যে মানসিক সমস্যা বাড়ছে।

মেখলা সরকার আরও বলছেন, খেলার মাঠ নেই। নিরাপত্তার কারণে শিশু-কিশোরদের বাসার বাইরে যেতে দেওয়া হয় না। অভিভাবকরা চাকরি সামলে সন্তানদের সময় দিতে পারেন না। ফলে শিশু-কিশোররা সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। একা হয়ে পড়ছে। সঠিকভাবে মানসিক বিকাশ হচ্ছে না, আবেগের নিয়ন্ত্রণ শিখছে না, নানান সমস্যায় জড়িয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি প্রযুক্তির কারণেও সমস্যার বলয় বড় হচ্ছে।

সন্তান খেলাধুলা বা বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা কমিয়ে দিয়েছে, পড়াশোনায় মনোযোগ হারিয়েছে, অল্পতেই রেগে যাচ্ছে বা কান্না করছে, ঘুম বা খাওয়ার অভ্যাস বদলে যাওয়া, কিংবা চুপচাপ থাকছে— দীর্ঘদিন এমন আচরণ থাকলে তা মানসিক সমস্যার সংকেত হতে পারে বলে জানিয়েছেন মনোরোগ চিকিৎসকরা।

অধ্যাপক মোহিত কামাল বলছেন, বাবা-মাকে শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে সবসময় সচেতন থাকতে হবে। কোনো সমস্যা মনে হলে না লুকিয়ে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে আসতে হবে। আর মোবাইলের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ নয়, শিশু-কিশোরদের জন্য নিষিদ্ধ করতে হবে।