এক মাস আগেও যে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার মিলেছে ১ হাজার ৭৫০ টাকায়, এখন সেটির জন্য গুনতে হচ্ছে ২ হাজার ১০০ টাকা। কোথাও দাম উঠছে ২ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ব্র্যান্ড সংকট। পছন্দের কোম্পানির গ্যাস না পেয়ে কেউ বাড়তি টাকা দিয়ে অন্য সিলিন্ডার কিনছেন, কেউ আবার নতুন সিলিন্ডারসহ গ্যাস নিতে গিয়ে ৩ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত খরচের মুখে পড়ছেন। বাড়তি এই ব্যয় সামলাতে না পেরে অনেকেই এখন ইলেকট্রিক চুলার দিকে ঝুঁকছেন। ফলে রাজশাহীতে সিলিন্ডার গ্যাসের ক্রেতা কমছে, আর বাড়ছে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভরতা।
সরকার ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে। তবে ভোক্তাদের অভিযোগ, বাজারে এই দামে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। বিক্রেতারা ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত নিচ্ছেন। এতে রান্নার মাসিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার নতুন করে হিসাব কষছে।
নগরের টিকাপাড়া এলাকার বাসিন্দা রায়হান ইসলাম বলেছেন 'মাস খানেক আগেও ১ হাজার ৭৫০ টাকায় গ্যাস কিনেছি। কিন্তু এখন গ্যাস কিনতে হচ্ছে ২ হাজার ১০০ টাকায়।'
দামের পাশাপাশি সরবরাহ সংকটও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, ১৬ থেকে ১৮টি এলপিজি কোম্পানি বাজারে থাকলেও রাজশাহীতে নিয়মিত গ্যাস দিচ্ছে যমুনা, যমুনা সান, ওমেরা, বিএম এবং আই- এই পাঁচটি কোম্পানি। ফলে চাহিদা অনুযায়ী সব ব্র্যান্ডের গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে বসুন্ধরাসহ কয়েকটি ব্র্যান্ডের সিলিন্ডার নিয়ে সংকট বেশি।
নগরের তেরখাদিয়া ডাবতলা এলাকার বাসিন্দা মো. মিরাজুল ইসলামের অভিজ্ঞতা তারই উদাহরণ। বুধবার (৭ অক্টোবর) তার বাসার গ্যাস শেষ হয়ে যায়। খালি সিলিন্ডারটি ছিল বসুন্ধরা ব্র্যান্ডের। সেটি নিয়ে তিনি গ্যাসের দোকানে যান। কিন্তু সেখানে বসুন্ধরার গ্যাস পাওয়া যায়নি।
দোকানি তাকে গ্যাসসহ নতুন একটি সিলিন্ডার কিনতে বলেন। দাম পড়ে প্রায় ৩ হাজার ২০০ টাকা। বাড়তি এই টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত গ্যাস না কিনেই ফিরে যান মিরাজুল। এখন ইলেকট্রিক চুলায় রান্না করছেন তিনি।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, মিরাজুলের মতো আরও অনেক ক্রেতা গ্যাসের বাড়তি দাম ও সরবরাহ সংকটে বিকল্প খুঁজছেন। কেউ অন্য ব্র্যান্ডের সিলিন্ডার কিনছেন। কেউ নতুন সিলিন্ডার কিনতে না পেরে ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করছেন। এর প্রভাব পড়েছে গ্যাসের বিক্রিতেও।
রাজশাহীর সাগরপাড়া বটতলা এলাকার মোজাহার এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী বৃষ্টি খাতুন বললেন, 'ব্র্যান্ডভেদে গ্যাস ১ হাজার ৭৯০ থেকে ১ হাজার ৮৩০ টাকায় কিনছি- যমুনা ১ হাজার ৮২০-১ হাজার ৮৩০, ‘আই’ ১ হাজার ৭৯০ এবং বিএম ও ওমেরা প্রায় ১ হাজার ৮৩০ টাকা। ৫০ টাকা লাভ রেখে যমুনা ১ হাজার ৮৭০-১ হাজার ৮৮০ এবং ‘আই’ ১ হাজার ৮৪০ টাকায় বিক্রি করছি; বাসায় পৌঁছে দেওয়ার খরচ আলাদা।'
দাম বাড়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বললেন, 'আগে সরকারি দর ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। এরপর ২০-৩০ টাকা করে বাড়তে বাড়তে চলতি মাসের শুরুতে একবারে ২৫২ টাকা বেড়েছে। ফলে আমরা আগেই বেশি দামে কেনা গ্যাসের মেমো অনুযায়ী ৫০ টাকা লাভ যোগ করে বিক্রি করছি। এখন সরকার ১ হাজার ৮৩৭ টাকা দর নির্ধারণ করায় ক্রেতাদের সঙ্গে বিক্রয়মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। কিন্তু পরিবহন, কর্মচারী ও সরবরাহের খরচ যোগ হওয়ায় ওই দামে বিক্রি সম্ভব নয়।'
সরবরাহ সংকটের কথাও জানান বৃষ্টি খাতুন। তিনি বলেলেন, '১৬-১৭টি কোম্পানির মাত্র চার-পাঁচটি নিয়মিত গ্যাস দেওয়ায় সব ব্র্যান্ড সরবরাহ করতে পারছি না। এতে বিক্রি কমার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের বাড়তি ঝামেলায় পড়তে হচ্ছে।'
তেরখাদিয়া উত্তরপাড়া ডাবতলা এলাকার গ্যাস বিক্রেতা এসগুল মণ্ডল বলেছেন, 'এখন প্রতি সিলিন্ডার গ্যাস ১ হাজার ৯০০ থেকে ১ হাজার ৯৫০ টাকায় বিক্রি করছি। কোম্পানি ও গ্যাসের ধরনভেদে কোনো কোনো সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ৫০ টাকা পর্যন্তও বিক্রি করতে হচ্ছে।'
তিনি বললেন, 'সরকার নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা হলেও সরবরাহ কম থাকায় বাজারে সেই দামে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। ১৬-১৮টি কোম্পানির মধ্যে এখন মাত্র কয়েকটি কোম্পানি গ্যাস সরবরাহ করছে। বসুন্ধরাসহ অনেক ব্র্যান্ডের গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ক্রেতাদের চাহিদামতো গ্যাস দিতে পারছি না এবং বিক্রিও আগের তুলনায় কমে গেছে।'
সিলিন্ডার সরবরাহ ও বাসায় পৌঁছে দেওয়ার অতিরিক্ত খরচের কথাও জানান এসগুল মণ্ডল। তার ভাষ্য, এসব ব্যয় যুক্ত হওয়ায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভোক্তাকে আরও বেশি দাম দিতে হচ্ছে।
দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটের প্রভাব এখন শুধু গ্যাসের দোকানে সীমাবদ্ধ নেই। রান্নার জ্বালানি হিসেবে বিকল্প ব্যবহারের প্রবণতাও বাড়ছে। বিশেষ করে যেসব পরিবার নিয়মিত এলপিজির ওপর নির্ভরশীল, তাদের অনেকেই খরচ কমাতে ইলেকট্রিক চুলার দিকে যাচ্ছেন।
রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান বললেন, 'এক লাফে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার গ্যাসের দাম ২৫২ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এই সুযোগে অসাধু ডিলার ব্যবসায়ীরা বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দেয়ায় একটা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে খুচরা বিক্রেতা ও ক্রেতাদের হয়রানি করছে। পাশাপাশি খুচরা বিক্রেতারাও এর সুযোগ নিয়ে বেশি দামে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার করছে। মাঝখান থেকে ক্রেতা বা ক্রেতারা উভয় দিক থেকে আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এই অবস্থা চলতে পারে না। সরকারকে অতিসত্বর মনিটরিং করে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারের ভোগান্তি থেকে গ্রাহকদের রেহাই দেয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি।'
রাজশাহীর এলপিজি বাজারে এখন একদিকে ক্রেতা কমছে, অন্যদিকে বদলে যাচ্ছে ভোক্তার জ্বালানি ব্যবহারের ধরন। দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে এই পরিবর্তন আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।