জুলাই অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ট্রাকচালক মো. হোসেন হত্যা মামলায় আদালতে হাজির করার সময় সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের হুমকির জবাবে পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আনিসুর রহমান বলেন, ‘পলকের কথায় আমরা ভিতু নই। নিষিদ্ধ সংগঠন তারা, সন্ত্রাসী তারা। আমাদের ন্যায় বিচার বিঘ্নিত করার উদ্দেশ্যে এমন কথা বলেছেন তবে আমরা ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করবই এবং বাংলার মানুষ তা দেখবে।’
বৃহস্পতিবার ঢাকার চার নম্বর বিশেষ জজ আদালত-৪-এর বিচারক রবিউল আলমের আদালত ট্রাকচালক মো. হোসেন হত্যা মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩৪ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন বিষয়ে শুনানির তারিখ ফের পিছিয়ে ২৬ অক্টোবর নির্ধারণ করেছে।
সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী বেলাল হোসেন জানান, ‘এই মামলায় সাজ্জাদ হোসেন এবং নাইমুল হাসান রাসেল নামে দুই আসামির আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শুনানি থাকায় উপস্থিত করতে পারেননি কারা কর্তৃপক্ষ। এ জন্য ঢাকার চার নম্বর বিশেষ জজ আদালত-৪ এর বিচারক রবিউল আলমের আদালত নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছে।’
এদিন আদালতে হাজির করার সময় হাতকড়া পেছনে দেওয়ায় এবং লিফট চালু থাকা সত্ত্বেও সিঁড়ি দিয়ে আদালতে ওঠানোয় ক্ষোভ প্রকাশ করেন পলক। তিনি বলেন, ‘পিপি সাহেবের বোঝা উচিত, তার স্থান আর আমার স্থান বেশি দূরে নয়।’
এ কথার জবাবে পিপি বলেন, ‘তারা জুলাই আন্দোলনে চার হাজার মানুষ হত্যা করেছেন, ১০-২০ হাজার মানুষ আহত করেছেন। সেই বিচার যেন বিঘ্নিত হয়, সে জন্য রাষ্ট্রপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে আমাকে হুমকি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আমি তখনই বলেছি এখানে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা হবেই। ওয়েট অ্যান্ড সি, ন্যায় বিচার হবে সাক্ষ্য প্রমাণের মাধ্যমে আর বাংলার মানুষ তা দেখবে।’
আনিসুর রহমান আরও বলেন, ‘পলক আজকে যে আবদার করেছেন, সেটি অন্যায় আবদার। ন্যায় বিচার বিঘ্নিত করার জন্য যদি কোন আসামী কারাবিধি না মানেন বা অপচেষ্টা করেন তাহলে আইন মন্ত্রনালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।’
এর আগে বেলা ১২ টার সময় আদালতে তোলা হলে পলক বলেন, ‘হাতকড়া পেছনে দিয়ে আমাকে সিঁড়ি দিয়ে ওঠানো হয়েছে। আদালতের কাছে আমার অনুরোধ, হাতকড়া সামনে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক। যেহেতু ছয়তলা পর্যন্ত হেঁটে উঠানো হয় মানবিক দিক বিবেচনা করে আমাদের হ্যান্ডকাফ সামনে পরানো হোক।’
পরে আদালত থেকে নামার সময়ও তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘লিফট কি শুধু আমাদের জন্য বন্ধ।’
পলকের আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখি বলেন, ‘পলককে আদালতে আনার সময় লিফট চালু থাকা সত্ত্বেও তাকে সিঁড়ি দিয়ে ওঠানো হয়েছে। আমরা দেখেছি দুটি লিফটের মধ্যে একটি লিফট চালু তবুও তাদেরকে হেঁটে নামানো হয়েছে। তাদের হাতে জং ধরা হ্যান্ডকাফ এবং বুলেট প্রুফ জ্যাকেটটিও খুবই নোংরা, ফলে তারা অসুস্থ হয়ে যেতে পারেন। তাদের এই বিষয় গুলো বিবেচনা করা উচিত।’
আদালত সূত্রে জানা গেছে, এদিন কারাগারে থাকা আটজনকে আদালতে উপস্থিত করা হয়। এ মামলায় ৩৪ জন আসামির মধ্যে ১০ জন কারাগার আটক রয়েছেন। বাকি ২০ জন শুরু থেকেই পলাতক।
মামলার অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান এলাকায় গুলিতে নিহত হন মো. হোসেন। তিনি পেশায় ট্রাকচালক ছিলেন। সেদিন তিনি গাবতলীতে ট্রাক রেখে বাসায় ফিরছিলেন। এ ঘটনায় ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট নিহত ব্যক্তির মা রীনা বেগম বাদী হয়ে মোহাম্মদপুর থানায় হত্যা মামলা করেন।
২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক আকরামুজ্জামান আদালতে শেখ হাসিনাসহ ৩৪ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন— আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাসান মাহমুদ, সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, সাবেক সংসদ সদস্য সাদেক খান, নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালি আসিফ ইনান, আসিফ আহম্মেদ, তারেকুজ্জামান রাজিব, শেখ বজলুর রহমান, নুর মোহাম্মদ সেন্টু, তোফায়েল সিদ্দিক ওরফে তুহিন, রহমান মিয়া ওরফে এ কে এম অহিদুর রহমান, পলাশ, ওলিউর রহমান, খলিলুর রহমান, ইমন, এস এম রিয়াজুল হক তামিম, মাসুদুর রহমান বিপ্লব, আব্দুস সাত্তার ভূইয়া ওরফে এম এ সাত্তার, পারভেজ ওরফে গোল্ডেন পারভেজ, সুমন মিয়া ওরফে কাইল্লা সুমন, মিলন হোসেন, সোহেল ওরফে ভূইয়া সোহেল ওরফে বুনিয়া সোহেল, সলিম উল্লাহ সলু, ইরফান, মুহাম্মদ বদিউল আলম ওরফে বদিউজ্জামান, ফুরকান হোসেন, শাহজাহান খান, সাজ্জাদ হোসেন, ফারুক হোসেন অভি, নাইমুল হাসান রাসেল। আসামিদের মধ্যে পলক, সাদেক, ফুরকান ও শাহজাহান কারাগারে আটক রয়েছেন।