Image description

দেশে কন্যাশিশুদের শৈশব দিন দিন চরম নিরাপত্তাহীন ও আশঙ্কাজনক হয়ে উঠছে। ঘরে-বাইরে কোথাও যেন তাদের সুরক্ষা নেই। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মাত্র আট মাসে দেশে অন্তত ৮৮৪ জন কন্যাশিশু নির্মম নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হয়েছে। একই সময়ে প্রাপ্তবয়স্ক নারীসহ মোট সহিংসতার শিকার হয়েছেন ১ হাজার ৯১৯ জন। অর্থাৎ, মোট নির্যাতনের প্রায় অর্ধেক ঘটনাই ঘটেছে ১৮ বছরের কম বয়সী অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যাশিশুদের ওপর।

জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে তৈরি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইড উপ-পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির আট মাসের মাসিক তথ্য প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এই উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, এই আট মাসে ৮৮৪ জন কন্যাশিশু ছাড়াও ১ হাজার ৩৫ জন প্রাপ্তবয়স্ক নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

 

ধর্ষণ, হত্যা ও যৌন সহিংসতা

মহিলা পরিষদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সহিংসতার বড় একটি অংশের সরাসরি লক্ষ্যবস্তু হয়েছে কন্যাশিশুরা। আট মাসে যৌন সহিংসতার চিত্র ছিল সবচেয়ে লোমহর্ষক। এই সময়ে ২৪০ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৫৫ জন। ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে ২২ জন শিশুকে এবং এই পাশবিকতার মানসিক ক্ষত সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে ২ জন। এছাড়া ১১২ জন কন্যাশিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। এর বাইরে ৬০ জন যৌন নিপীড়ন, ৩৬ জন ইভটিজিং এবং ১৪ জন সাইবার সহিংসতার শিকার হয়েছে। ইভটিজিংয়ের অপমান সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে ৩ জন শিশু।

যৌন সহিংসতার পাশাপাশি সরাসরি হত্যা ও রহস্যজনক মৃত্যুর শিকারও হয়েছে বহু কন্যাশিশু। আট মাসে ৯৩ জন শিশুকে হত্যা করা হয়েছে এবং ২ জনকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়া ৪৪ জন কন্যাশিশুর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। নির্মম নির্যাতনের মানসিক আঘাত সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে ২৮ জন, আত্মহত্যায় প্ররোচনার শিকার হয়েছে ৫ জন এবং আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছে ২ জন শিশু।

অন্যান্য অপরাধের মধ্যে আট মাসে ৪০ জন কন্যাশিশুকে অপহরণ এবং ১৬ জনকে অপহরণের চেষ্টা করা হয়েছে। পাচারের শিকার হয়েছে ৩২ জন শিশু। গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুদের অবস্থাও ছিল করুণ; বাসাবাড়িতে কাজ করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৬ জন শিশু গৃহকর্মী এবং পিটিয়ে বা নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে ৭ জনকে। এছাড়া পারিবারিকভাবে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১ জন। বাল্যবিয়ে রোধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ১৭ জনের বিয়ে ঠেকানো সম্ভব হলেও শেষ পর্যন্ত ২ জনের বাল্যবিয়ে সম্পন্ন হয়ে যায়। অন্যদিকে এসিড সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে ২ জন কন্যাশিশু, আগুনে পুড়ে মৃত্যু হয়েছে ১ জনের এবং অন্যান্য শারীরিক ও সামাজিক সহিংসতার শিকার হয়েছে আরও ৪২ জন শিশু।

জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে তৈরি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইড উপ-পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির আট মাসের মাসিক তথ্য প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এই উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, এই আট মাসে ৮৮৪ জন কন্যাশিশু ছাড়াও ১ হাজার ৩৫ জন প্রাপ্তবয়স্ক নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

মাসভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, বছরের মাঝামাঝি সময়ে কন্যাশিশু নির্যাতনের ঘটনা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। জানুয়ারিতে ৭৫ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৭৩ জন, মার্চে ৭১ জন এবং এপ্রিলে ৮৭ জন কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়। তবে মে মাস থেকে এ সংখ্যা লাফিয়ে বাড়ে—মে মাসে ১৪৫ জন, জুনে সর্বোচ্চ ১৭৭ জন, জুলাইয়ে ১৩৮ জন এবং আগস্টে ১১৮ জন কন্যাশিশু সহিংসতার শিকার হয়। একই সময়ে প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের ক্ষেত্রেও এই প্রবণতা দেখা গেছে। নারীদের ওপর নির্যাতনের ক্ষেত্রেও যৌতুক, পারিবারিক নির্যাতন, হত্যা ও ধর্ষণের মতো অপরাধ ছিল শীর্ষে।

 

সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির সংকট ও দায়বদ্ধতার প্রশ্ন

কন্যাশিশুর ওপর এই ক্রমাগত নির্যাতন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সমাজের গভীরে প্রোথিত দৃষ্টিভঙ্গির সংকট বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এ বিষয়ে লেখক, গবেষক ও সাবেক উপদেষ্টা ফরিদা আখতার স্ট্রিমকে বলেন, ‘কন্যাশিশু নির্যাতন সব সময়ই হয়ে আসছে। কোনো নির্দিষ্ট সরকারের দোষ না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও হয়েছে, তার আগেও হয়েছে, এখনও হচ্ছে। শুধু আট মাসের হিসাবে কিছু বলা যায় না।’

সমাজে কন্যাশিশুর প্রতি আজন্ম বৈষম্যমূলক মানসিকতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘কন্যাশিশু সব সময়ই বৈষম্যের শিকার। ছেলেশিশু জন্ম নিলে পরিবার যতটা খুশি হয়, মেয়েশিশুর ক্ষেত্রে এখনও ততটা খুশি হতে পারেন না এদেশের মানুষেরা। এখনও পনেরো বছরের নিচের শিশুদের বিয়ে হচ্ছে। তাহলে আমরা আর আধুনিক হলাম কীভাবে?’

নারীদের প্রতি সামগ্রিক অবক্ষয়ের দিকে ইঙ্গিত করে ফরিদা আখতার আরও বলেন, ‘নারীদের পণ্য হিসেবে মনে করা এখন একটা ট্রেন্ড হয়েছে। নারীদের যদি পণ্য হিসেবেই ব্যবহার করার মনোভাব বাড়তে থাকে, তাহলে কন্যাশিশু হোক আর পূর্ণবয়স্ক নারী হোক—কেউ এসব অত্যাচার থেকে রেহাই পাবে না। এসব বিষয় মনে আসলে খুবই কষ্ট লাগে।’

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কন্যাশিশুদের ওপর নিষ্ঠুরতার মাত্রা যেভাবে বাড়ছে, তাতে কেবল আইনের কঠোর প্রয়োগই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গি বদল, সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং কন্যাশিশুকে পণ্যের বদলে একজন মানুষ হিসেবে দেখার মানসিকতা গড়ে তোলা। অন্যথায় আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও মানবিক সমাজ নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

আবার কন্যাশিশুর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ও পারিবারিক মানসিকতা নিয়ে নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন -এর অন্যতম মুখপাত্র ফেরদৌস আরা রুমী স্ট্রিমকে বলেন, ‘কন্যাশিশুর ওপর সহিংসতা ও বৈষম্য কোনো নতুন ঘটনা নয়; এটি সমাজে বহু বছর ধরে চলে আসা একটি গভীর সংকট। কমার বদলে এই সহিংসতা দিন দিন আরও বাড়ছে। সমাজে কন্যাশিশুর আগমন আজও সানন্দে গ্রহণ করা হয় না। গর্ভে আসার খবর কিংবা জন্মের মুহূর্ত থেকেই বহু পরিবারে হতাশার ছায়া নেমে আসে। আমার বয়স এখন প্রায় ৫০ বছর। পাঁচ দশক আগেও কন্যাশিশু মানেই ছিল পরিবারের ওপর বাড়তি ‘‘বোঝা’’। অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, এত বছর পরও সমাজের তথাকথিত শিক্ষিত, বিত্তবান কিংবা প্রগতিশীল পরিবারগুলোতেও এই চিন্তার মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয়নি। খুব অল্প কিছু পরিবার ছাড়া বেশিরভাগ পরিবারেই মেয়েদের বড়জোর লেখাপড়া শিখিয়ে ভালো পাত্র দেখে বিয়ে দেওয়ার চিন্তাই থাকে; তাদের একজন স্বাবলম্বী ও পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার মানসিকতা এখনো গড়ে ওঠেনি।’

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কন্যাশিশুদের ওপর নিষ্ঠুরতার মাত্রা যেভাবে বাড়ছে, তাতে কেবল আইনের কঠোর প্রয়োগই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গি বদল, সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং কন্যাশিশুকে পণ্যের বদলে একজন মানুষ হিসেবে দেখার মানসিকতা গড়ে তোলা।

প্রান্তিক পরিবারের সংকট ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তৃণমূল বা দরিদ্র পরিবারগুলো চরম আর্থসামাজিক বাস্তবতার চাপে পড়ে কন্যাসন্তানকে অভিশাপ বা বোঝা মনে করতে বাধ্য হয়। কিন্তু এর জন্য পরিবারগুলোকে দোষারোপ করার চেয়ে রাষ্ট্রের নীতিগত ব্যর্থতাই বেশি দায়ী। কারণ রাষ্ট্র এখনও কন্যাশিশুর সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করার মতো কার্যকর কাঠামো দাঁড় করাতে পারেনি।’

রাষ্ট্রীয় নীতি ও ‘টোকেনিজম’ নিয়ে সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রের পলিসিতে কন্যাশিশুদের বিষয়টি এখনো ‘‘নামকাওয়াস্তে টোকেনিজম’’ ছাড়া কিছু নয়। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো কন্যাশিশুদের নিয়ে মুখরোচক মোড়কে নানা প্রতিশ্রুতি দেয়। কাগজে-কলমে দিস্তায় দিস্তায় ফাইল ও প্রকল্প ঠিকই পাওয়া যায়, কিন্তু কন্যাশিশুকে দেশের ‘‘সম্পদ’’ হিসেবে গড়ে তোলার কোনো প্রকৃত সদিচ্ছা আইনপ্রণেতা ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে নেই। কন্যাশিশুকে যে সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব—সেই দৃষ্টিভঙ্গিটাই এখনও তাদের মগজে ঢোকেনি।’

সহিংসতার সহজ শিকার হওয়া নিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘শিশুরা স্বভাবতই কোমল ও দুর্বল; তাদের প্রতিবাদ করার মতো সামাজিক বা শারীরিক শক্তি থাকে না। এ কারণে কন্যাশিশুরা খুব সহজেই সহিংসতার শিকার হয়। ছেলেশিশুদের ওপরও নির্যাতন হয়, কিন্তু কন্যাশিশুরা ঘরে, সমাজে এবং বাইরের পরিসরে অনেক বেশি যৌন ও শারীরিক নির্যাতনের মুখোমুখি হচ্ছে।’

উত্তরণের উপায় সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘কন্যাশিশুকে কেবল ‘‘কন্যা’’ হিসেবে নয়, বরং একজন মানুষ এবং রাষ্ট্রের অপরিহার্য ‘‘সম্পদ’’ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। আর এই চিন্তা বাস্তবায়নে সরকারকে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, বাজেটে দৃশ্যমান বরাদ্দ বাড়াতে হবে এবং কন্যাশিশুদের সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি প্রকৃত বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। যতদিন না নীতিনির্ধারকদের এই মনস্তত্ত্বের পরিবর্তন হবে, ততদিন কন্যাশিশুদের জন্য নিরাপদ ও সমমর্যাদার সমাজ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।’