হবিগঞ্জের চুনারুঘাট থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) অতনু বণিকের বিরুদ্ধে এক ব্যক্তিকে মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে। এ-সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
এর একদিন আগে একই থানার আরেক এএসআই মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসাইনের ঘুষসংক্রান্ত একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। এক দিনের ব্যবধানে দুই পুলিশের ঘুষ গ্রহণের ভিডিও ভাইরাল হওয়ায় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সকালে মাসুদ আলম নামে এক ব্যক্তি তার ফেসবুক পেজ ‘আইটিভি’-তে এএসআই অতনু বণিকের কথোপকথন ও অর্থ লেনদেনের দৃশ্যসংবলিত ভিডিওটি প্রকাশ করেন বলে জানা গেছে।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে এএসআই অতনু বণিকের সঙ্গে এক ব্যক্তির কথোপকথন এবং অর্থ লেনদেনের দৃশ্য দেখা যায় বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন। ভিডিওতে তাদের কথোপকথনের কিছু অংশও শোনা গেছে।
সেই ভিডিওতে শোনা গেছে, একটি পুকুরপাড়ে সিমেন্টের বেঞ্চে কয়েকজন বসে কথা বলছেন। কালচে টি-শার্ট ও জিন্স পরা এক যুবককে ৩২৪ ও ৫০৬ ধারাসহ বিভিন্ন আইনি ধারা এবং মামলা নিয়ে কথা বলতে দেখা যায়। ওই যুবক চুনারুঘাট থানার এএসআই অতনু বণিক।
মেরুন টি-শার্ট ও জিন্স পরা আরেক যুবক বেঞ্চে বসে সিগারেট টানছেন এবং মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন। তিনিও আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন। ক্যামেরার সামনে ও পেছনে আরও দু-একজনকে দেখা যায়। তাদের কয়েকজনকে টাকা লেনদেন ও কথাবার্তায় অংশ নিতে দেখা যায়।
কথোপকথনে অতনু বণিককে টাকা চাইতে এবং মামলার বিভিন্ন ধারার কথা বলে ভয় দেখাতে শোনা যায়। মামলার আপস-মীমাংসা, আসামির জামিন ও খরচ নিয়েও কথা বলতে শোনা যায়। একপর্যায়ে ১০ হাজার টাকা নিয়ে দরদামের কথা হয়।
একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘৬ হাজার আর ৪ হাজার, ১০ হাজার টাকা দিছি।’
এরপর অতনু বণিককে বলতে শোনা যায়, ‘ঠিক আছে, আর দুই হাজার টাকা বাড়িয়ে দাও আমাকে। আমি বলি, আসামি নিয়ে যাওয়ার সময় তুমি আমাকে খরচের টাকা দিবা না? আসামি গাড়িতে যাওয়ার সময় খরচের টাকা দিবা না? সিএনজি ঠিক করো আজকে। এখন ফোন দাও, এখনই ফোন দাও। তুমি আজ রাতে ১০০ শতাংশ শিওর করবা।’
ওই ব্যক্তি টাকা দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি জানালে অতনু বণিককে রাতে কখন আসবেন, তা জানতে চাইতে শোনা যায়।
কথোপকথনের একপর্যায়ে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘৩২৪ ধারায় যদি থানায় এফআইআর হয়, কালকেই জামিন পেয়ে যাবে। আর ৩২৫, ৩০৬ এ এই মামলা মিনিমাম পাঁচ-ছয় বছর ডিল করতে হবে। আমি তো এরকম অফিসার না ভাই, ভুলভাল বোঝাতে পারব না।’
ভিডিওতে এএসআইকে এক হাজার টাকার নোট হাতে নিয়ে গুনতে দেখা যায়। মেরুন টি-শার্ট পরা যুবকটিকে মোবাইল ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলতেও দেখা যায়।
ভিডিওর শেষ দিকে চুনারুঘাট থানা ভবন দেখানো হয়। এরপর থানার প্রবেশদ্বার ও পাশের বাজারের দৃশ্য দেখা যায়। সেখানে পথচারী, রিকশা ও অন্যান্য যানবাহন চলাচল করতে দেখা যায়।
এদিকে, এএসআই অতনু বণিকের বিরুদ্ধে এর আগেও একটি মামলার তদন্তে গিয়ে এক নারীকে ‘শ্লীলতাহানির চেষ্টার’ অভিযোগ ওঠেছিল। ওই ঘটনায় ওই নারীর পরিবারের পক্ষ থেকে হবিগঞ্জের পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভিডিওটি প্রায় ৬ মাস আগের এবং তৎকালীন থানার ওসি শফিকুল ইসলামের দায়িত্ব পালনকালের ঘটনা বলে দাবি করা হচ্ছে।
নতুন করে ঘুষ লেনদেনের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় চুনারুঘাটে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এএসআই অতনু বণিক সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায় করতেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি দ্রুত যাচাই করে এর সত্যতা ও ঘটনার প্রকৃত তথ্য বের করা হোক। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
এদিকে, এর মাত্র একদিন আগে চুনারুঘাট থানার আরেক এএসআই মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসাইনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভিডিওতে ঘুষ গ্রহণসংক্রান্ত কথোপকথন ও মন্তব্য নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। পরে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তাকে থানা থেকে পুলিশ লাইনে প্রত্যাহার (ক্লোজ) করা হয়েছে।
একই থানার দুই এএসআইয়ের বিরুদ্ধে একের পর এক ঘুষসংক্রান্ত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় থানার অভ্যন্তরীণ তদারকি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা জনসম্মুখে তুলে ধরা হোক।
অভিযুক্ত এএসআই অতনু বণিকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
চুনারুঘাট থানার ওসি মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, বিষয় জেনেছি। বিস্তারিত জেনে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।