Image description

সোমবার সকাল থেকে দেখা গেল এক অদ্ভুত দৃশ্য। রাস্তায় কোনো ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চোখে পড়ল না। রাস্তা বেশ খালি খালি। হাঁটছে সাধারণ যাত্রীরা। ওদিকে মোবাইল অ্যাপসে হুট করে বেড়ে গেল ভাড়া। পথচলতি সিএনজি অটোরিকশার চালকদের হাবেভাবেও বোঝা গেল যে, তারা অনেকটা ‘একদর’ মনোভাবে আছেন। ফলে দরকষাকষির সুযোগ খুব একটা মিলল না।

 

এসবই এক ধরনের সংকেত বটে। এই দেশে থাকা ‘ম্যাংগো পিপল’ হিসেবে এমন সংকেতের মাজেজা আন্দাজ করাও কঠিন কোনো বিষয় নয়। বোঝা গেল, কিছু একটা ঘটেছে অবশ্যই! এদিক-সেদিক শুধিয়ে জানা গেল, ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকেরা নাকি একধরনের কর্মবিরতি, বা এ দেশে প্রচলিত ‘হরতাল’ শব্দটির বাস্তবায়ন করছেন। কোনোভাবে অফিসে আসতে আসতেই জানা হয়ে গেল বাকি খবর।

 

‘রাস্তা আছে যেখানে, অটো চলবে সেখানে’–এমন ধরনের নানা স্লোগান দিয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকেরা সোমবার বিক্ষোভ, প্রতিবাদ করেছেন ঢাকায়। সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সোমবার রাজধানীর মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডিসহ আশপাশের এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা অন্যদিনের চেয়ে কম দেখা গেছে। বাড্ডা, মালিবাগ, মৌচাক, শান্তিনগর, মতিঝিল এবং পল্টনে অটোরিকশা চলছে না। রাস্তার পাশে অনেকে দাঁড়িয়ে আছেন গাড়ির আশায়। তবে কয়েকটি এলাকায় অটোরিকশার দেখা মিলেছে আগের মতোই। ঢাকার সায়েন্সল্যাব, এলিফ্যান্ট রোড থেকে শাহবাগ পর্যন্ত অটোরিকশার চলাচল আগের মতোই স্বাভাবিক দেখা গিয়েছে।

 

গ্যারেজ থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার প্রতিবাদসহ কয়েকটি দাবিতে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনের রাস্তা অবরোধ করেছেন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকরা। কর্মসূচির অংশ হিসেবে সোমবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ২ ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে অটোরিকশার মালিক ও চালকরা। অটোরিকশার মালিক, চালকদের দাবি, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার গ্যারেজ থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এতে তাদের অটোরিকশা চার্জ দেওয়া যাচ্ছে না এবং রিকশা চালাতে না পারায় তাদের রোজগার নেই। তাদের দাবি, অটোরিকশার গ্যারেজে বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরায় সংযুক্ত করতে দিতে হবে, সব রাস্তা তাদের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। এ ছাড়া পুলিশের হয়রানি ও তাদের জরিমানা বন্ধ করারও দাবি জানানো হয়।

তো, এত কিছুর মধ্যে এ দেশে যেটা সব ক্ষেত্রেই ঘটে চিরায়ত সত্যের মতো করে, সেটি হলো–সাধারণ মানুষের ভোগান্তি। এই ঘটনাতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তাই ঢাকাবাসীদের অনেকেই গতকাল সোমবার বাড়তি ভোগান্তি ভোগ করেছে। ভোগান্তির মধ্যে যেমন ঠিকঠাক পরিবহন না পাওয়ার বিষয়টি আছে, তেমনি আছে সেই ফাঁকে প্যাডল টানা রিকশা বা সিএনজিচালিত অটোরিকশার বাড়তি ভাড়া ‘ছিনিয়ে’ নেওয়ার বিষয়টিও। হ্যাঁ, প্রশ্ন করাই যায় যে, গলায় ছুরি কি ধরেছে? না, তা ধরা হয়নি। তবে বাড়তি ভাড়া নিতে এটি বাদে বাকি যা করা হয়, সাধারণ যাত্রীদের সাথে, সেটি এক ধরনের রাহাজানিরই শামিল।

 

এই প্রসঙ্গে চলুন ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে আরও কিছু বিষয় বুঝে নেওয়া যাক। সাধারণত রিকশা বললেই পায়ে টানা তিন চাকার একটি অতি পরিচিত যানের ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তবে প্রযুক্তির কল্যাণে নানা বিকল্প তো বের হয়ই। তেমনি পায়ে টানার বদলে আদরণীয় হয় ব্যাটারি থেকে পাওয়া শক্তিতে চাকা ঘোরানোর উপায়। শারীরিক শ্রম কম হওয়া অবশ্যই একটি প্রধান কার্যকারণ। ব্যাটারির শক্তিতে চলা সেইসব চাকা স্বাভাবিকভাবেই দ্রুত ঘোরে। কতটা দ্রুত, তা এ শহরের মায় এ দেশের বেশির ভাগ মানুষই জানেন ও বোঝেন। এ নিয়ে রাস্তায় নানা হুজ্জতও হয়। তার চেয়েও বড় কথা, এটিকে রাস্তায় চলার লাইসেন্স সরকার দেয় না। ফলে এটি অবৈধ এবং এ নিয়ে আইন-আদালতও এ যাবৎকালে কম হয়নি। ২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় তিন দিনের মধ্যে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধের নির্দেশও দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। সেই সাথে রুল জারি হয়েছিল, ওই বিষয়ে ব্যবস্থা না নেওয়া কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানানোর জন্য।

 

আদালতের এমন নির্দেশনা অবশ্য নতুন নয়। এর আগে, ২০১৪ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিন দফায় অটোরিকশা বন্ধে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। এ ছাড়া অটোরিকশার আমদানি বন্ধেরও নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। ওই আদেশ বহাল রেখে আপিল বিভাগও পরে দেশের সর্বত্র ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধের নির্দেশ দেন। কিন্তু তার আর বাস্তবায়ন দেখা যায়নি।

 

উল্টো পুরো সমস্যাটিকে জিইয়ে রাখা হয়েছে সরকারিভাবেই। গত ৪/৫ বছরে এই দেশের মানুষ মোট তিনটি সরকার দেখেছে। কোনো সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী বা আইনপ্রণেতারাই সংসদে ‘বাংলার টেসলা’ খ্যাত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। কোনো সরকার হ্যাঁ-না কিছুই না বলে এই বিষয়ে এমন এক নিষ্ক্রিয় ও অভাবনীয় ‘উদাসী’ মনোভাব দেখিয়ে গেল, যা আধুনিক এই যুগে বিরল। আবার এখনকার সরকার যদিও ব্যাটারিচালিত রিকশার ‘সমস্যা’কে চিহ্নিত করতে পারছে, কিন্তু এর নিখুঁত সমাধান করতে গিয়ে খাবি খাচ্ছে। ফলে সমস্যার সমাধান হচ্ছে না কোনোভাবেই। বরং এটি এমন এক ত্রিশঙ্কু পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে, যাকে এই বঙ্গের ভাষায় একমাত্র ‘ফাটা বাঁশের চিপা’ দিয়েই সঠিকভাবে অভিহিত করা সম্ভব।

 

ব্যাটারিচালিত রিকশা-সংশ্লিষ্ট সমস্যা একদিনের নয়। সমস্যাটিকে জিইয়ে রাখাও হয়েছে বহুদিন ধরে। কেমন করে? অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও ব্যাটারিচালিত রিকশা রাজধানী ঢাকায় নেমেছে ব্যাপকহারে, অলিগলিতে চলেছে অনেক। কিন্তু উচ্চ আদালতের নির্দেশনা সত্ত্বেও সরকার তাতে সঠিকভাবে নজরদারি না করায় এবং উপযুক্ত ব্যবস্থা না নেওয়ায়, এর চলাচল বেড়েছেই। কখনও পায়ে চালানো রিকশায় অবৈজ্ঞানিক উপায়ে ব্যাটারি লাগিয়ে ফেলা হয়েছে, আবার কখনও চীনদেশ থেকে ইচ্ছামাফিক মডেল আমদানি করে তা রাস্তায় চলতে দেওয়া হয়েছে। কোনোটার চাকা প্রচলিত রিকশার মতোই, আবার কোনোটার সিএনজিচালিত অটোরিকশার মতো। অর্থাৎ, একেকটার গতি ও চলার ধরনও একেকরকম। কোনোটা পায়ে টানা রিকশার তুলনায় একটু দ্রুত চলে, তো কোনোটা পেট্রোল‑ডিজেলে চলা গাড়ির গতির সঙ্গে রেসে নামে। আর এভাবেই নানামাত্রিক দুর্ঘটনায় জড়িয়ে যায় ব্যাটারিচালিত রিকশার নাম।

আবার এভাবে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালিয়ে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করা মানুষের সংখ্যাও বেড়েছে। অন্যদিকে এই ব্যাটারিচালিত রিকশার ওপর সাধারণ যাত্রীদের এক ধরনের নির্ভরতাও বেড়েছে সময়ের সাথে সাথে। সেই সঙ্গে যে নানামাত্রিক দুর্ঘটনাও বেড়েছে, তা তো আগেই বলা হলো। ফলে ঢাকাসহ পুরো দেশের সড়কে এক নিদারুণ বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। এভাবে একটি সমস্যা জিইয়ে রেখে বিশাল করে ফেলা হয়েছে।

 

এই সমস্যার যেকোনো সমাধান করতে গিয়েই তাই বিপুল প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বর্তমান সরকার এ নিয়ে একটি নীতিমালা করার কথা বলেছে। সেই নীতিমালা হওয়ার আগে ঢাকার সড়কে মাঝেমধ্যেই পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। সেই অভিযানে নিয়মিতই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে ট্রাকে তুলে নিয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কিছু অর্থ জরিমানা করে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে জব্দ করা অটোরিকশাগুলো। চালকদের অভিযোগ, পুলিশ ধরলেই টাকা দিতে হচ্ছে, তারপরই ফিরে পাওয়া যাচ্ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা।

 

কথা হলো, এমন সমাধান আসলে সমাধানের চেয়েও বেশি হাজির হয় ‘হয়রানি’ রূপে। কারণ সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চলাচল সীমিত করার বিষয়ে একটা সিদ্ধান্তে আসতে হবে। আনুষ্ঠানিকভাবে নীতিমালা হওয়ার আগেই এমন সিদ্ধান্ত সরকার নিতেই পারে। কিন্তু সরকারের তরফে এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যাচ্ছে না। সড়কে কখনো চলতে দেওয়া হচ্ছে, কখনো চলতে দেওয়া হচ্ছে না। একই রাস্তায় চললে কখনো জব্দ করা হচ্ছে না, কখনো জব্দ করা হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এই পেশায় থাকা মানুষেরা পেটের দায়েই প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চলাচল সীমিত করার যেকোনো পদক্ষেপের বিরুদ্ধে অন্তত শেষ চেষ্টাটা করবে। মনে রাখতে হবে, পেটের দায়ের চেয়ে বড় তাড়না এই পৃথিবীতে নেই। খিদে মেটাতে মানুষ অনেক কিছুই করে। আবার চালকদের পাশাপাশি এই খাতে বিনিয়োগ করা ব্যক্তিরাও আছেন। একটি সরকারি প্রশাসনযন্ত্রের পুরোপুরি অজান্তে নিশ্চয়ই এই ব্যাটারি আমদানি হয়নি, সেই ব্যাটারি স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিকশায় লেগেও যায়নি। অর্থাৎ, এক্ষেত্রে সরকারি পক্ষের (তা যে সময়েরই হোক) একটি অবহেলা ছিলই এবং এই সমস্যা তৈরির পেছনে তা বড় ভূমিকা রেখেছে।

 

সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে যে, এই ব্যাটারিচালিত যান দিয়ে পুরো দেশেই একটি বিশাল সমস্যা সৃষ্টি করে ফেলা হয়েছে। এটি যেমন আর্থ-সামাজিক, তেমনি মানবিকও। বিশেষ করে আমাদের মতো দেশে, যেখানে কর্মসংস্থানের অভাব বেশ প্রকট, সেখানে এমন সংকট নানা ধরনের অভিঘাত নিয়ে হাজির হয়। এবং হচ্ছেও। এতে করে সমস্যার সমাধান করাটা আরও জটিল হয়ে পড়ছে দিনকে দিন। এখন তাই দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। নইলে এটি আরও জটিল আকার নেবে।

 

কিন্তু স্বীকার করতেই হবে যে, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা আমাদের সবার জন্যই এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে, যেখানে শাঁখের করাতের মতো দুই দিকেই কাটছে। এই সমস্যার সমাধান তাই বর্তমান সরকারের জন্য সত্যিই চ্যালেঞ্জের। যদিও পরীক্ষার প্রশ্ন কঠিন হলেই পরীক্ষা না দেওয়াটা তো আর কাজের কথা না! এখন সেই পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়াটাই অতীব প্রয়োজন।

 

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা