Image description

বেশিসংখ্যক যাত্রী পরিবহনের জন্য চীন থেকে আমদানি করা হয়েছিল ২০ সেট ডেমু ট্রেন। যার প্রতিটির পরিচালনাকাল ৩০-৩৫ বছর ধরা হলেও মাত্র ৭-৮ বছরেই সবগুলোই চলাচল অনুপযোগী হয়ে পড়ে। যার পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানে রেলওয়ের বিভিন্ন শেডে অযত্ন অবহেলায় পড়ে আছে প্রায় ৬০০ কোটি টাকায় কেনা ডেমুগুলো। এর মধ্যে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন কারখানা ও লোকোশেডে রয়েছে ১০টি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত এই ট্রেনগুলোর জন্য বিশেষ সফটওয়্যার সংযোজন করে প্রস্তুতকারক চীনা প্রতিষ্ঠান। প্রযুক্তি হস্তান্তর না করায় কোনো ত্রæটি হলেই সারাতে তাদের ডাকতে হতো। যার খরচ অত্যধিক বেশি দাবি করত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। অনেকটা ট্রেনগুলোর আমদানি ব্যয়ের প্রায় সমান। এজন্য অকেজো হয়ে ঝড়ে ভিজে রোদে শুকাচ্ছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কেনা ৬০০ কোটি টাকার ট্রেনগুলো। এদিকে বিএনপি সরকার গঠনের পর এগুলো আবার সচল করার উদ্যোগ নিয়েছে। এ জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন দুই কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মামুনুল ইসলাম পিইঞ্জ বলেন, বাধ্য হয়ে খোলাস্থানে সবগুলো ট্রেন রাখতে হচ্ছে। মেরামত করার সময় তা ভিতরে রাখা হয়। ডেমু ট্রেন নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। এখনো চ‚ড়ান্ত নির্দেশনা আসেনি।

বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) ফকির মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, পাবলিক/প্রাইভেট ব্যবস্থাপনায় ডেমু ট্রেন যদি কেউ মেরামত করতে চায়, তাহলে তারা নিজস্ব অর্থায়নে করতে পারবে। গত ১ এপ্রিল এ সংক্রান্ত একটি পর্যালোচনা সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালে চীনের তানশাং ইন্টারন্যাশনাল ও ডানিয়াল টেকনিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট থেকে ২০ সেট ডেমু ট্রেন কিনেছিল তৎকালীন সরকার। প্রতিটিতে দুই দিকে দুটি ইঞ্জিন এবং মাঝখানে একটি কোচ রয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি ডেমুতে ৪০টি মডিউল রয়েছে, যার একেকটির দাম প্রায় ৭ লাখ টাকা। 

কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত ট্রেনগুলো বিশেষ সফটওয়্যার দিয়ে পরিচালিত হয়। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশকে সেই প্রযুক্তি হস্তান্তর করেনি। যার কারণে কোনো মডিউল বিকল হলে নতুনভাবে সফটওয়্যার সেটআপ দিতে হতো। এজন্য বাধ্য হয়ে চীনা প্রকৌশলীদের স্মরণাপন্ন হতে হয় । যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এদিকে, চুক্তি অনুসারে ডেমু ট্রেনের সঙ্গে ১৯ ধরনের প্রধান যন্ত্রাংশ, ৩৭ ধরনের সাধারণ যন্ত্রাংশ, ১৩৭ ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ যন্ত্রাংশ এবং ৩৭ ধরনের (সরঞ্জাম) টুলস ও মেরামত কাজে ব্যবহৃত যন্ত্র দেওয়ার কথা। কিন্তু প্রকল্প কর্মকর্তারা এগুলো সঠিকভাবে বুঝে নেয়নি। 

এ জন্য পরে ডেমু মেরামতের প্রয়োজনে যন্ত্রাংশ পাওয়া যায়নি। এ ছাড়াও বেশি সংখ্যক যাত্রী পরিবহনের উদ্দেশ্যে ডেমু ট্রেন আমদানি করা হলেও বাস্তবে ছিল অনেক সীমাবদ্ধতা। প্রতিটি কোচে ৩০০ যাত্রীর ধারণক্ষমতা থাকলেও সেই চাপ নিতে পারত না। বিকল হয়ে যাওয়ার ভয়ে ট্রেনগুলোকে মূলত ‘সুপার অফপিক আওয়ারে’ (যখন যাত্রী কম থাকে) চালানো হতো। ডেমু পরিচালনার প্রধান সমস্যার মধ্যে ছিল চাহিদার তুলনায় যাত্রী ধারণক্ষমতা কম হওয়া, পর্যাপ্ত বাতাস প্রবেশের সুযোগ না থাকা এবং যাত্রীদের আসনের নিচে ইঞ্জিন থাকায় মেঝে গরম হয়ে যাওয়া। 

পরে চীন থেকে প্রকৌশলী এনে এসির পরিবর্তে ফ্যান লাগানো এবং জানালা খোলা রাখার ব্যবস্থা করা হয়। এ ছাড়া, এর দরজার হাতলও যাত্রীবান্ধব ছিল না। সাধারণ ট্রেনের চেয়ে দরজার উচ্চতা আধা ফুট বেশি হওয়ায় নারী, শিশু ও বয়স্কদের উঠতে সমস্যা হতো। ডেমুতে ছিল না কোনো টয়লেটও। এদিকে, বিএনপি সরকার গঠনের পর অচল পড়ে থাকা এসব ডেমু ট্রেন আবার সচল করার উদ্যোগ নিয়েছে রেলওয়ে। এ জন্য রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন দুই কর্মকর্তাকেও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে। 

শুধু ডেমু সচল নয়, নতুন আন্তনগর ট্রেন চালু, রেললাইন নির্মাণ, কোচ ও ইঞ্জিনের সংস্কার, নতুন কোচ ও ইঞ্জিন কেনা, ঢাকা-কক্সবাজার রুটে বেসরকারিভাবে ট্রেন চালুসহ রেলওয়েকে ঘিরে একগুচ্ছ পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম বলেন, রেলওয়ের অকেজো ও অব্যবহৃত ডেমু ট্রেনগুলোকে ব্যবহারের উপযোগী কমিউটার ট্রেনে রূপান্তর করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য পাইলটিং প্রকল্পে আগ্রহী প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হবে। প্রতিষ্ঠান নির্বাচন শেষে পরের দুই মাসে তাদের কাছে অকেজো ডেমু ট্রেন হস্তান্তর করা হবে।